ক্ষীয়মান অংশীদারিত্ব Diminishing Musharakah

মুশারাকার আরেকটি পদ্ধতি যাকে সাম্প্রতিককালে প্রসারিত করা হয়েছে। তাহল : “ক্ষীয়মান অংশীদারিত্ব”। এই পদ্ধতি অনুযায়ী অর্থায়নকারী এবং তার গ্রাহক কোন যমীন, আসবাবপত্র কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিকানা লাভ করে, অর্থায়নকারীর অংশ বিভিন্ন ইউনিটে বিভক্ত করা হয় এবং একথা পরিজ্ঞাত থাকে যে, গ্রাহক। অর্থায়নকারীর অংশের ইউনিটসমূহ ক্রমান্বয়ে এক এক করে ক্রয় করতে থাকবে। এক একটি ইউনিট ক্রয়ের ফলে অর্থায়নকারীর অংশ কম হতে থাকবে। এক পর্যায়ে গ্রাহক অর্থায়নকারীর সমুদয় অংশ ক্রয় করে ফেলবে এবং যমীন কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের এককভাবে মালিক হয়ে যাবে।

ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বের এই পদ্ধতিকে বিভিন্ন লেনদেনে বিভিন্নভাবে অবলম্বন করা যায়। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হচ্ছে।

(১) এই পদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে হাউজ ফিন্যান্সিং (গৃহ নির্মান অর্থায়ন)-এর জন্য ব্যবহার করা যায়। গ্রাহক একটি বাড়ি ক্রয় করতে ইচ্ছুক, কিন্তু তার নিকট বাড়ি ক্রয় করার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়ােজন তা বিদ্যমান নেই। এমতাবস্থায় গ্রাহক অর্থায়নকারীর স্মরণাপন্ন হয়, ফলে অর্থায়নকারী বাড়ি ক্রয়ে গ্রাহকের সাথে অংশীদারিত্বের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে যায়। বাড়ির মুল্যের (২০%) বিশ পার্সেন্ট গ্রাহক পরিশােধ করে এবং (৮০%) আশি পার্সেন্ট পরিশােধ করে অর্থায়নকারী। সুতরাং বাড়ির আশি পার্সেন্টের মালিক অর্থায়নকারী এবং বিশ পার্সেন্টের মালিক গ্রাহক। বাড়ি যৌথভাবে ক্রয়ের পর গ্রাহক বাড়িকে তার বসবাসের প্রয়ােজনে ব্যবহার করে এবং অর্থায়নকারীকে তার অংশ ব্যবহার করার কারণে ভাড়া প্রদান করে। এর সাথে সাথে অর্থায়নকারীর অংশকে সমান আটটি ইউনিটে বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেকটি ইউনিট বাড়ির দশ পার্সেন্ট মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে। (কেননা তার পূর্ণ মালিকানা ছিল আশি পার্সেন্ট)। গ্রাহক অর্থায়নকারীর সাথে এই অঙ্গীকার করে যে, প্রত্যেক তিন মাস পর পর একটি ইউনিট ক্রয় করবে। সুতরাং তিন মাসের প্রথম মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর সে বাড়ির মূল্যের দশ পার্সেন্ট পরিশােধ করে একটি ইউনিট ক্রয় করে নেয়। এর দ্বারা অর্থায়নকারীর অংশ আশি পার্সেন্ট থেকে হ্রাস পেয়ে সত্তর পার্সেন্ট হয়ে যাবে। এই অনুপাতে অর্থায়নকারীকে পরিশােধ্য ভাড়াও কম হতে থাকবে। দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্ণ হলে গ্রাহক আরেকটি ইউনিট ক্রয় করে নিবে। যার ফলে বাড়িতে তার অংশ বৃদ্ধি পেয়ে চল্লিশ পার্সেন্ট এবং অর্থায়নকারীর অংশ হ্রাস পেয়ে ষাট পার্সেন্ট হয়ে যাবে। আর সেই অনুপাতে ভাড়াও কম হয়ে যাবে। এভাবে এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে, এমনকি দু’বছর সমাপ্তির পর গ্রাহক অর্থায়নকারীর সমুদয় অংশ ক্রয় করে নিবে, যার ফলে তার অংশ শেষ হয়ে যাবে এবং গ্রাহকের অংশ একশ’ পার্সেন্ট হয়ে যাবে।

এই পদ্ধতি অর্থায়নকারীকে এ অনুমতি প্রদান করে যে, বাড়িতে তার মালিকানা অনুপাতে ভাড়ার দাবী করতে পারবে এবং সাথে সাথে স্বীয় অংশের ইউনিটসমূহ বিক্রি করে আসল পুঁজি ক্রমান্বয়ে ফেরত নিয়ে নিতে পারবে ।

(২) “ক” যাত্রীদেরকে ভ্রমণ সেবা প্রদানের জন্য একটি গাড়ি ক্রয় করতে ইচ্ছুক, যাতে যাত্রীদের থেকে গৃহীত ভাড়া দ্বারা আয় উপার্জন করতে পারে। কিন্তু তার নিকট সেই পরিমাণ ফান্ড নেই। এমতাবস্থায় “খ” গাড়ির ক্রয়ে অংশীদারিত্বের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। ফলে তারা উভয়ে। যৌথভাবে একটি গাড়ি ক্রয় করে নেয়। ৮০% মূল্য “খ” পরিশােধ করে এবং ২০% মূল্য “ক” পরিশােধ করে। অতঃপর এই গাড়িটি যাত্রীদের ভ্রমণ সেবার কাজে নিয়ােজিত করা হয়। এর থেকে দৈনিক ১০০০/= টাকা আয় হয়। যেহেতু গাড়িতে “খ”-এর অংশ ৮০%, সেহেতু এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত করে নেয়া হয়েছে যে, ভাড়ার ৮০% “খ” পাবে এবং ২০% “ক” পাবে, গাড়িতে তার অংশও ২০%। এর অর্থ হল এই যে, দৈনিক ৮০০/= টাকা “খ” এবং ২০০/= টাকা “ক” পাবে। তিন মাস পর “ক” “খ”এর অংশ থেকে একটি ইউনিট ক্রয় করে নিয়েছে। যার ফলে “খ” এর অংশ কমে ৭০% এবং “ক” এর অংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০% হয়ে গিয়েছে। যার অর্থ এটা হল যে, ঐ তারিখ হতে “ক” দৈনিক আয় থেকে ৩০০/= টাকা এবং “খ” ৭০০/= টাকার পাওনাদার হব। এ পদ্ধতি চলতে থাকবে, এমনকি দু’বছর সমাপ্তির পর গাড়ি সম্পূর্ণভাবে “ক” এর মালিকানায় হয়ে যাবে, “খ” উল্লেখিত নিয়মানুযায়ী আয়ের স্বীয় অংশ এবং তার আসল পুঁজিও ফেরত পেয়ে যাবে।

(৩) “ক” রেডিমেট গার্মেন্টসের ব্যবসা শুরু করতে চায়, কিন্তু তার কাছে ঐ ব্যবসার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়ােজন তা বিদ্যমান নেই। এমতাবস্থায় “খ” একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ যথা- দু’বছরের জন্য তার সাথে অংশীদারিত্বের ব্যাপারে রাজী হয়ে যায়। চল্লিশ পার্সেন্ট পুঁজি বিনিয়ােগ করে “ক” এবং ষাট পার্সেন্ট বিনিয়ােগ করে “খ”। উভয়ে মুশারাকার ভিত্তিতে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে এবং মুনাফার হারও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে নিয়েছে। এর সাথে সাথে ব্যবসায় “খ” এর অংশকে সমান ছয়টি ইউনিট বানানাে হয় এবং “ক” ধীরে ধীরে তা ক্রয় করা শুরু করে দেয়। এমনকি দু’বছরান্তে “খ” ব্যবসা থেকে বের হয়ে যায় এবং “ক” ব্যবসার একক মালিক হয়ে যায়। “খ” বিভিন্ন মেয়াদে মুনাফা পাওয়া ছাড়াও স্বীয় ইউনিটসমূহের মূল্যও পেয়ে যাবে। যা মূলত তার আসল পুঁজি ফেরত পাওয়ার সদৃশ্য।

আরো পড়তে পারেন:  মুদারাবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

ঋণ

শরীয়তের দৃষ্টিতে পর্যালােচনা করলে দেখা যাবে যে, এই পদ্ধতিসমূহ বিভিন্ন লেনদেনের সমষ্টি। যা বিভিন্ন পর্যায়ে স্বীয় দায়িত্ব আদায় করে। এ জন্য ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বের উপরােল্লিখিত তিনটি উদাহরণ সম্পর্কে ইসলামী মূলনীতির ভিত্তিতে পর্যালােচনা করা হচ্ছে।

ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে হাউজ ফিন্যান্সিং

প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে নিম্নল্লোখিত বিষয়সমূহ রয়েছে।

১. বাড়িতে যৌথ মালিকানা সৃষ্টি করা। (শিরকাতুল মিলক)

২. অর্থায়নকারীর অংশ গ্রাহককে ভাড়ায় প্রদান করা।

৩. অর্থায়নকারী ক্লায়েন্ট (গ্রাহক) থেকে তার অংশ ক্রয়ের অঙ্গীকার নেয়া।।

৪. বিভিন্ন ধাপে বাস্তবে তার ইউনিটসমূহ ক্রয় করা।

৫. বাড়িতে অর্থায়নকারীর অবশিষ্টাংশ অনুপাতে ভাড়া নির্ধারণ।

এ পর্যায়ে আমরা এই পদ্ধতির বিষয়সমূহের উপর বিস্তারিত আলােচনা করব।

(১) উল্লেখিত পদ্ধতিতে প্রথম ধাপ বাড়িতে যৌথ মালিকানা সৃষ্টি করা। এ বিষয়টি এ অধ্যায়ের শুরুতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, শিরকাতুল মিলক বিভিন্ন পদ্ধতিতে অস্তিত্বে আসতে পারে। যার মধ্যে উভয়পক্ষের যৌথভাবে ক্রয় করাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ পদ্ধতিকে সকল ফিকহবিদগণ সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ বলে সাব্যস্ত করেছেন। তাই এভাবে যৌথ মালিকানা সৃষ্টি করার ব্যাপারে কোন অভিযােগ হতে পারে না।

(২) এই পদ্ধতির দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে অর্থায়নকারী তার স্বীয় অংশ গ্রাহককে ভাড়ায় (Lease) প্রদান করে এবং এর বিনিময়ে তার থেকে ভাড়া উসূল করে। এই পদ্ধতিও সম্পূর্ণ বৈধ। কেননা, কোন ব্যক্তির কোন যৌথ সম্পত্তিতে স্বীয় অবণ্টিত অংশ অপর অংশীদারকে ভাড়ায় প্রদান করার বৈধতার ব্যাপারে ফিকহবিদদের মাঝে কোন মতভেদ নেই। যদি অবণ্টিত অংশ তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে ভাড়ায় প্রদান করে, তার বৈধতার ব্যাপারে ফিক্হবিদদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এবং ইমাম যুফার (রহ.) এর মতে অবণ্টিত অংশ তৃতীয় কোন ব্যক্তির নিকট ভাড়ায় প্রদান করা যাবে না। অপরদিকে ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আবু ইউসূফ এবং মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (রহ.) বলেন যে, অবণ্টিত অংশও তৃতীয় কোন ব্যক্তির নিকট ভাড়ায় প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু এই এ পদ্ধতিটির সম্পর্ক যতটুকু যে, যৌথ সম্পত্তিকে যদি স্বীয় অপর অংশীদারের নিকট-ই ভাড়ায় প্রদান করা হয়, তাহলে এই ভাড়ার বৈধতার ব্যাপারে সকল ফিকহবিদ একমত।

(৩) উপরােল্লেখিত পদ্ধতির তৃতীয় ধাপ হল, গ্রাহক অর্থায়নকারীর অবণ্টিত অংশের বিভিন্ন ইউনিটসমূহ ক্রয় করতে থাকে। এটাও শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ। যদি অবণ্টিত অংশ যমীন এবং বিল্ডিং উভয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে উভয়টির বিক্রি সকল ফিক্হবিদের নিকট বৈধ। এমনিভাবে যদি বিল্ডিং-এর অবণ্টিত অংশ নিজের অপর অংশীদারের নিকট বিক্রি করার ইচ্ছা করে, তাহলে এটাও ফিকহবিদদের সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ। তবে তা যদি তৃতীয় কোন পার্টির নিকট বিক্রি করে, তাহলে এ ব্যাপারে ফিহবিদদের মতভেদ রয়েছে।

এইমাত্র বর্ণিত তিনটি দফা (মৌলনীতি) দ্বারা প্রতিভাত হয়েছে যে, উপরােল্লেখিত তিনটি বিষয় সত্তাগতভাবে বৈধ। কিন্তু এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, তিনটি বিষয়কে একই ব্যবস্থাপনায় একত্রীকরণ বৈধ কি না। এর উত্তর হল, যদি তিনটি বিষয়কে এই হিসেবে একত্র করা হয় যে, তাদের প্রত্যেকটি অপরটির জন্য শর্তস্বরূপ হয়ে যায়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তা বৈধ নয়। কেননা, ইসলামের আইনগত পদ্ধতিতে এই উসূল অবধারিত যে, একটি লেনদেনকে অপটির জন্য পূর্বশর্তস্বরূপ বানানাে যায় না। কিন্তু প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে এ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে যে, দুটি লেনদেনের একটিকে অপরটির জন্য শর্তস্বরূপ বনানাের পরিবর্তে শুধুমাত্র গ্রাহকের পক্ষ থেকে এক তরফা অঙ্গীকার হতে হবে। প্রথম অঙ্গীকার এ কথার যে, গ্রাহক অর্থায়নকারীর অংশকে ভাড়ায় (Lease) গ্রহণ করে এর ভাড়া পরিশােধ করবে। দ্বিতীয় অঙ্গীকার হল, সে বাড়িতে অর্থায়নকারীর অংশের বিভিন্ন ইউনিটসমূহকে ক্রমান্বয়ে ক্রয় করে নিতে থাকবে। এখন আমরা চতুর্থ বিষয়ের দিকে ফিরে যাচ্ছি, তাহল বিচারের দৃষ্টিতে এ ধরনের অঙ্গীকারের আবশ্যকতার মাসআলা।

(৪) সাধারণত এ ধারণা করা হয় যে, কোন কাজের অঙ্গীকার গ্রহণের দ্বারা অঙ্গীকারকারীর উপর শুধুমাত্র চারিত্রিক দায়িত্ব অর্পিত হয়, সেই অঙ্গীকার আদালতের মাধ্যমে কার্যত পূরণ করানাে যায় না। কিন্তু অনেক ফিহবিদ এমনও রয়েছেন যাদের দৃষ্টিভঙ্গী এই যে, অঙ্গীকার বিচারের দৃষ্টিতেও আবশ্যক হয়ে যায় এবং আদালত অঙ্গীকারকারীকে তার কৃত অঙ্গীকার পূরণের জন্য বাধ্য করতে পারে। বিশেষত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কয়েকজন মালেকী এবং হানাফী ফিকহবিদদের বরাত দেয়া যায়, যারা বলেন যে, প্রয়ােজনের সময় আদালতের মাধ্যমেও অঙ্গীকার পূরণ করানাে যেতে পারে। হানাফী ফিকহবিদগণ এই দৃষ্টিভঙ্গীকে একটি বিশেষ ধরনের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছেন, যাকে “বাইবিল ওফা” বলা হয়। “বাইবিল ওফা” কোন বাড়ির ক্রয়-বিক্রির একটি বিশেষ পদ্ধতি। যে পদ্ধতিতে ক্রেতা বিক্রেতার সাথে এ অঙ্গীকার করে যে, বিক্রেতা যখন ক্রেতাকে বাড়ির মূল্য ফেরৎ দিয়ে দিবে, ক্রেতা তখন উক্ত বাড়ি পুনরায় বিক্রি করে দিবে। এই পদ্ধতি মধ্য এশিয়ায় প্রচলিত ছিল এবং এ ব্যাপারে হানাফী ফিক্হবিদদের দৃষ্টিভঙ্গী এই ছিল যে, যদি বাড়ির দ্বিতীয় ক্রয়-বিক্রয়কে প্রথম ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য শর্ত বনানাে হয়ে থাকে তাহলে এটা বৈধ নয়। কিন্তু ক্রয়-বিক্রয় যদি বিনাশর্তে সংঘটিত হয় এবং ক্রয়-বিক্রয়ের পর ক্রেতা এ মর্মে অঙ্গীকার করে যে, বিক্রেতা যখন তাকে তার ক্রয়মূল্য সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করবে, তখন সে উক্ত বাড়ি পুনরায় তার কাছে বিক্রি করে দিবে। তাহলে এই অঙ্গীকার গ্রহণযােগ্য হবে এবং এর দ্বারা অঙ্গীকারকারীর উপর শুধুমাত্র চারিত্রিক দায়িত্বই অর্পিত হবে না বরং এর দ্বারা প্রকৃত বিক্রেতা আইনগতভাবে অঙ্গীকার পূরণ করানাের একটি অধিকার পেয়ে যাবে।

আরো পড়তে পারেন:  ইসতিসনা কি ইসতিসনা এবং সালাম ও ইজারার মধ্যে পার্থক্য

ফিকহবিদগণ এই পদ্ধতির বৈধতার ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তি এই নীতিমালার উপর রেখেছেন যে, “প্রয়ােজনের সময় অঙ্গীকারকে আদালতের মাধ্যমেও আবশ্যকীয় সাব্যস্ত করা যেতে পারে। এমনকি অঙ্গীকার যদি ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হওয়ার পূর্বে গ্রহণ করা হয়, অতঃপর ক্রয়-বিক্রয় বিনাশর্তে সংঘটিত হয়, তাহলে ঐসব ফিকহবিদদের নিকট এমনটি করাও বৈধ হবে।’

কেউ কেউ এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে যে, অঙ্গীকার যদি কার্যতভাবে ক্রয়-বিক্রয়ে অন্তর্ভুক্তির পূর্বে গ্রহণ করা হয়, তাহলে মূলত এটা স্বয়ং ক্রয়-বিক্রয়ে শর্তারােপ করার সদৃশ্য হয়ে যায়। কেননা উভয় পক্ষের ক্রয়-বিক্রয়ে অন্তর্ভুক্তির সময় এই শর্ত তাদের জানা ছিল, যার কারণে ক্রয়-বিক্রয় যদিও কোন সুস্পষ্ট শর্ত ব্যতীত সংঘটিত হয়েছে, তদুপরি তাকে শর্তযুক্ত মনে করা উচিত। যেহেতু একটি সুস্পষ্ট শর্তের অঙ্গীকার ইতিপূর্বে হয়ে গিয়েছে।

এই প্রশ্নের উত্তর এটা দেয়া যেতে পারে যে, ক্রয়-বিক্রয়কে শর্তযুক্ত করা এবং ক্রয়-বিক্রয়কে শর্তযুক্ত করা ব্যতীত অঙ্গীকার করা এই দু’য়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যদি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সুস্পষ্টভাবে শর্ত উল্লেখ করা হয়, তার অর্থ হবে ক্রয়-বিক্রয় ঐ সময়ই সংঘটিত এবং বাস্ত বায়ন হবে যখন অঙ্গীকার পূর্ণ করা হবে। যার ফলে ভবিষ্যতে যদি অঙ্গীকার পূর্ণ না করা হয়, তাহলে এই ক্রয়-বিক্রয় বাতিল বলে সাব্যস্ত হবে। এর দ্বারা ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি ভবিষ্যতের কোন ঘটনার উপর নির্ভরশীল হয়ে যায়, যা সংঘটিত হতেও পারে নাও হতে পারে। ফলে চুক্তিতে অনিশ্চয়তার (ধোঁকার) আশংকা সৃষ্টি হয়ে যায়, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ।

পক্ষান্তরে ক্রয়-বিক্রয় যদি কোন শর্ত ব্যতীত সংঘটিত হয়ে থাকে, কিন্তু কোন এক পক্ষ পৃথকভাবে কোন অঙ্গীকার করে নেয়, তাহলে এ কথা বলা যায় না যে, ক্রয়-বিক্রয় অঙ্গীকার পূরণের উপর নির্ভরশীল কিংবা তার সাথে শর্তযুক্ত ছিল। এই ক্রয়-বিক্রয় যে কোন অবস্থায় সংঘটিত হবে অঙ্গীকারকারী তার অঙ্গীকার পূরণ করুক কিংবা না করুক। এমনকি অঙ্গীকারকারী যদি তার অঙ্গীকার থেকে ফিরে যায় তাহলেও ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হবে। যার সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছে বেশির চেয়ে বেশি সে এতটুকু করতে পারে যে, অঙ্গীকারকারীকে আদালতের মাধ্যমে তার অঙ্গীকার পূরণের ব্যাপারে বাধ্য করবে। অঙ্গীকারকারী যদি তার অঙ্গীকার পূর্ণ করার ক্ষমতা না রাখে, তাহলে যার সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছিল সে ততটুকু প্রকৃত ক্ষতিপূরণের দাবী করতে পারে যতটুকু তার অঙ্গীকার পূরণ করার কারণে হয়েছে।

MUSHARAKA

এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ক্রয় করার পৃথক অঙ্গীকার আসল চুক্তিকে তার সাথে শর্তযুক্ত কিংবা তার উপর নির্ভরশীল করে না। সুতরাং এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা যেতে পারে।

এই পর্যালােচনার ভিত্তিতে “ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বকে হাউজ ফিন্যান্সিং-এর জন্যে নিম্নবর্ণিত শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করা যেতে পারে।

(ক) যৌথভাবে ক্রয়, ভাড়া এবং অর্থায়নকারীর অংশের ইউনিটসমূহের ক্রয়-বিক্রয় এসব লেনদেনকে একই চুক্তিতে পরস্পরে মিলানাে উচিত নয়। তবে যৌথ ক্রয় এবং ভাড়ার চুক্তিকে একই কাগজে লিখা যাবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থায়নকারী এ ব্যাপারে একমত পােষণ করবে যে, যৌথ ক্রয়ের পর সে তার অংশ গ্রাহককে ভাড়ার ভিত্তিতে প্রদান করবে। এরূপ করা এজন্য বৈধ (সামনে আসবে) যে, ভাড়া ভবিষ্যতের যেকোন তারিখ থেকেও সংঘটিত পারে। এর সাথে গ্রাহক একতরফা অঙ্গীকারের উপর স্বাক্ষর করতে পারে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সে অর্থায়নকারীর অংশের ইউনিটসমূহ নির্দিষ্ট বিরতির পর ক্রয় করে নিবে এবং অর্থায়নকারী একথা স্বীকার করতে পারে যে, গ্রাহক যখন তার অংশের একটি ইউনিট ক্রয় করে নিবে, তখন সে অনুপাতে ভাড়াও কমে যাবে।

আরো পড়তে পারেন:  কি কি কারণে চেক ডিজঅনার হয়

(খ) প্রত্যেক ইউনিট ক্রয় করার সময় নতুন করে ইজাব-কবুল (প্রস্তাব দান গ্রহণ)-এর মাধ্যমে সেই নির্দিষ্ট তারিখে ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হতে হবে।

(গ) এটা সর্বোত্তম যে, গ্রাহকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ইউনিটের ক্রয়মূল্য ঐ দিনের বাজারদর অনুযায়ী হওয়া যা ঐ ইউনিট ক্রয় করার দিন বাজারে প্রচলিত থাকে। তবে এটাও জায়েয আছে যে, ক্রয়ের অঙ্গীকারনামায়ও (যার উপর গ্রাহক স্বাক্ষর করেছে) একটি মূল্য ধার্য করে নিতে পারে।

সেবার (Services) ব্যবসার জন্য ক্ষীয়মান অংশীদারিত্ব

উপরােল্লেখিত ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বের দ্বিতীয় উদাহরণ একটি গাড়ি যৌথ ভাবে ক্রয় করা, যাতে গাড়িটি ভ্রমণ সেবার কাজে ভাড়ায় প্রদান করে আয় উপার্জন করা যায়। এই পদ্ধতিটি নিম্নবর্ণিত বিষয়কে শামিল করে।

(১) শিরকাতুল মিলুকের আকৃতিতে গাড়িতে একটি যৌথ মালিকানা সৃষ্টি করা, এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ, যা পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।

(2) গাড়ি দ্বারা সেবা (Service) প্রদানের মাধ্যমে উপার্জিত আয়ে। মুশারাকা, এটাও বৈধ, যা এই অধ্যায়ের শুরুতে বর্ণনা করা হয়েছে।

(৩) গ্রাহক অর্থায়নকারীর অংশের বিভিন্ন ইউনিটসমূহ ক্রয় করা। এর বৈধতা ঐসব শর্তের সাথে শর্তযুক্ত যা হাউজ ফিন্যান্সিং-এ বিস্তারিতভাবে আলােচনা করা হয়েছে। তবে হাউজ ফিন্যান্সিং এবং এই দ্বিতীয় উদাহরণের মাঝে প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তাহল এই যে, গাড়িকে যখন ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে সেবার কাজে ব্যবহার করা হয়, তখন সাধারণত সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে অবচয়ের কারনে গাড়ির মূল্যও কম (Depreciation) হতে থাকে। এজন্য অর্থায়নকারীর বিভিন্ন ইউনিটসমূহের মূল্য নির্ধারণের সময় গাড়ির যে পরিমাণ মূল্য কমে যায় তা অবশ্যই সামনে রাখা উচিত।

সাধারণ ব্যবসায় ক্ষীয়মান অংশীদারিত্ব

পূর্বোল্লেখিত উদাহরণসমূহের তৃতীয় উদাহরণ এই ছিল যে, অর্থায়নকারী ৬০% পার্সেন্ট পুঁজি রেডিমেট গার্মেন্টসের ব্যবসা পরিচালনার | জন্য বিনিয়ােগ করেছে, এই পদ্ধতি দু’টি বিষয়কে শামিল করে।

(১) প্রথম ধাপে এটি একটি সাধাসিধা, মুশারাকা, যার মাধ্যমে দু’জন অংশীদার একটি যৌথ ব্যবসায় বিভিন্ন পরিমাণে স্বীয় পুঁজি বিনিয়ােগ করে। এটা সুস্পষ্ট যে, এই বিষয় ঐসব শর্তের সাথে বৈধ যা এই অধ্যায়ের প্রারম্ভেই বর্ণনা করা হয়েছে।

(২) গ্রাহক অর্থায়নকারীর অংশের বিভিন্ন ইউনিটসমূহকে ক্রয় করা, যা গ্রাহকের পক্ষ থেকে পৃথক অঙ্গীকারের মাধ্যমে হবে। এই অঙ্গীকার সম্পর্কে শরয়ী শর্তাবলী সেগুলােই যা হাউজ ফিন্যান্সিং-এর আলােচনায় বর্ণনা করা হয়েছে। তবে উভয়ের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তা এই যে, এই উদাহরণে অর্থায়নকারীর অংশের মূল্য ক্রয়ের অঙ্গীকারনামায় নির্ধারণ করা যায় না। মূল্য যদি মুশারাকায় অন্তর্ভুক্তির সময়ই আগাম নির্ধারণ করে নেয়া হয়, তাহলে কার্যত এর অর্থ এই হবে যে, গ্রাহক অর্থায়নকারীর বিনিয়ােগকৃত আসল পুঁজিকে মুনাফাসহ কিংবা মুনাফা ব্যতীত ফেরতের নিশ্চয়তা প্রদান করে দিয়েছে, যা মুশারাকার ক্ষেত্রে শরীয়তের দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ কারণে গ্রাহক যে ইউনিটসমূহ ক্রয় করবে সেগুলাের মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে অর্থায়নকারীর নিকট দু’টি সুযােগ (Options) রয়েছে। প্রথমটি হল- সে এ মর্মে চুক্তি করে নিবে যে, প্রত্যেক ইউনিট ক্রয়ের সময় ব্যবসার মূল্য ধার্য করে তার ভিত্তিতে সেই ইউনিটসমূহ বিক্রি করা হবে। ব্যবসার মূল্য যদি বেড়ে যায়, তাহলে সেই ইউনিটের মূল্যও বেড়ে যাবে। আর ব্যবসার মূল্য কমে গেলে ইউনিটের মূল্যও কমে যাবে। এই মূল্য ধার্য করা অভিজ্ঞ লােকের মাধ্যমে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ীও হতে পারে। সেই অভিজ্ঞ লােকদের চিহ্নিত করা অঙ্গীকারে স্বাক্ষরের সময়ও করা যেতে পারে। দ্বিতীয়টি এই যে, অর্থায়নকারী গ্রাহককে সেই ইউনিটসমূহকে যে কোন মূল্যে সম্ভব অন্য কোন লােকের কাছে বিক্রি করে দেয়ার অনুমতি প্রদান করবে। এর সাথে সাথে অর্থায়নকারী স্বয়ং গ্রাহককে একটি বিশেষ মূল্যের প্রস্তাব করবে। তার অর্থ এই হবে যে, সে যদি এর থেকে অধিক মূল্যে বিক্রির কোন গ্রাহক পেয়ে যায় তাহলে সে তা বিক্রি করে দিবে।

যদিও শরীয়তের দৃষ্টিতে উভয় সুযােগ-ই গ্রহণযােগ্য, কিন্তু দ্বিতীয় সুযােগটি অর্থায়নকারীর জন্য গ্রহণযােগ্য হবে না। কেননা, এর অর্থ একজন নতুন অংশীদারের মুশারাকায় শামিল হওয়া। যার দ্বারা পূর্ণ ব্যবসা প্রভাবিত হবে এবং ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বের উদ্দেশ্যও শেষ হয়ে যাবে, যে অনুযায়ী অর্থায়নকারী তার অর্থ একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত নিতে চাচ্ছিল। এজন্য ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য শুধুমাত্র প্রথম সুযােগ-ই গ্রহণযােগ্য।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *