মুশারাকা বা অংশীদারী কারবার

মুশরাকা মূলত আরবী শব্দ। যার আভিধানিক অর্থ শরীক বা অংশীদার হওয়া। কারবার ও ব্যবসাবাণিজ্যের পরিভাষায় মুশারাকা বলতে এমন এক যৌথ কারবারকে বুঝায়, যে কারবারে সকল অংশীদার যৌথ কারবারের লাভ লােকসানে শরীক থাকে। মুশারাকা বা অংশীদারি কারবার সুদভিত্তিক অর্থায়নের একটি আদর্শিক বিকল্প ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় সম্পদ উৎপাদন ও বণ্টন উভয়ের সাথে অংশীদারগণ জড়িত থাকে। আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় সুদই একমাত্র মাধ্যম যাকে সর্বপ্রকারের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ইসলামে যেহেতু সুদ হারাম, সেহেতু একে কোন ধরনের অর্থায়ন (Financing) এর জন্য ব্যবহার করা যায় না। এজন্য ইসলামী মূলনীতিভিত্তিক অর্থ-ব্যবস্থায় মুশারাকা’ সময়ের দাবী পূরণে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

সুদি ব্যবস্থাপনায় ফাইন্যান্সার কর্তৃক প্রদেয় ঋণের উপর অতিরিক্ত পরিশােধযােগ্য টাকার পরিমাণ পূর্বেই ধার্য করা হয়। ঋণগ্রহীতার লাভ হােক বা লােকসান হােক, এর প্রতি মােটেই ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। অপরদিকে মুশারাকায় পরিশােধযােগ্য অর্থের পরিমাণ পূর্বে ধার্য করা হয় না। বরং এতে মুনাফার ভিত্তি হল অংশীদারি কারবারে অর্জিত প্রকৃত মুনাফার উপর। সুদি কারবারে বিনিয়ােগকারী (ফাইন্যান্সার) কোন অবস্থাতেই লােকসানের দায়িত্ব বহন করে না। কিন্তু মুশারাকায় ফাইন্যান্সারের লােকসানও হতে পারে, যদি এ যৌথ ব্যবসায় লাভ না হয়।

ইসলাম সুদকে একটি ইনসাফ বিবর্জিত পন্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কেননা, এর ফলাফল ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের মাঝে বৈষম্য ও বেইনসাফীর আকারে প্রকাশ পায়। যদি ঋণগ্রহীতার ব্যবসায় লােকসান হয় তাহলে ঋণদাতার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত অর্থের দাবী করা বে-ইনসাফী । অন্যদিকে যদি ঋণগ্রহীতা ব্যবসায় প্রচুর পরিমাণ লাভবান হয়, তাহলে লাভের সামান্যতম অংশ ঋণদাতাকে দিয়ে অবশিষ্ট সমুদয় লভ্যাংশ ঋণগ্রহীতার কুক্ষিগত করাও ইনসাফসম্মত নয়।

MUSHARAKA

আধুনিক অর্থব্যবস্থায় ব্যাংক ই একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান, যে তার একাউন্ট হােল্ডারদের অর্থ থেকেই শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদেরকে ঋণ প্রদান করে থাকে। যদি কোন শিল্পপতির কাছে শুধু দশ মিলিয়ন টাকা থাকে, তাহলে সে ব্যাংক থেকে আরাে নব্বই মিলিয়ন টাকা ঋণ গ্রহণ করতে পারে। এ অর্থের মাধ্যমে সে একটি বড় লাভজনক প্রজেক্ট শুরু করে। এতে বুঝা গেল যে, উক্ত প্রজেক্টের নব্বই শতাংশ ব্যাংকের সাধারণ একাউন্ট হােল্ডারদের (গ্রাহকদের) অর্থ থেকে এবং বাকী মাত্র দশ শতাংশ ঋণগ্রহীতার ব্যক্তিগত মূলধন থেকে সংস্থাপন করা হয়েছে। যদি এই প্রজেক্টে প্রচুর পরিমাণে মুনাফা অর্জিত হয়, তাহলে তার ক্ষুদ্রতম একটি অংশ (যেমন- শতকরা ১৪ বা ১৫ ভাগ) ব্যাংকের মাধ্যমে সাধারণ একাউন্ট হােল্ডারদের কাছে যায়। অবশিষ্ট সমূদয় মুনাফা ঋণগ্রহীতা শিল্পপতি পেয়ে থাকে। অথচ উক্ত প্রজেক্টে শিল্পপতির অংশ ছিল মাত্র শতকরা দশ ভাগ। অতপর যে ১৪-১৫% মুনাফা সাধারণ একাউন্ট হােল্ডারগণ পেয়ে থাকেন, তাও শিল্পপতি সুকৌশলে হস্তগত করে নেন। তা এভাবে যে, শিল্পপতি ব্যাংকের সুদকেও পণ্য উৎপাদনের ব্যয় হিসেবে গণ্য করেন। (ফলে উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়ে যায়) অবশেষে ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, এ কারবারের সমুদয় মুনাফা ঐ সকল লােকদের নিকট পুঞ্জিভূত হয়ে যায়, যাদের মূলধন সমুদয় মূলধনের শতকরা দশভাগের বেশি ছিল না। পক্ষান্তরে যে জনগণ শতকরা নব্বই ভাগ মূলধনের মালিক, তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ ছাড়া আর কিছুই পায় না। এবং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে তাও তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হয়। অপরদিকে যদি কোন অস্বাভাবিক কারণে শিল্পপতি দেউলিয়া হয়ে যায়, তাহলে তার লােকসান মাত্র শতকরা দশভাগের বেশি হয় না। আর অবশিষ্ট নব্বই শতাংশ লােকসান পুরােপুরিভাবে ব্যাংক এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সাধারণ একাউন্ট হােল্ডারদেরকেও বহন করতে হয়। এভাবে সুদি লেনদেনে সাধারণ জনগণ তিলে তিলে শােষিত হয়ে সর্বহারাদের কাতারে এসে দাঁড়ায়, আর শিল্পপতিরা জনগণের টাকা শােষণ করে পুঁজিপতি বনে যায়।

অপরদিকে, ইসলামে পুঁজি বিনিয়ােগকারীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা বিদ্যমান রয়েছে। তা হল- পুঁজি বিনিয়ােগকারীদেরকে অবশ্যই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, তিনি ঋণগ্রহীতার সহায়তার লক্ষ্যে ঋণ প্রদান করছেন নাকি ঋণগ্রহীতার মুনাফায় অংশীদার হতে চাচ্ছেন? যদি সহযােগিতা করাই তার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে প্রদত্ত ঋণের পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু দাবী করা যাবে না। কেননা, তার উদ্দেশ্যই হল, ঋণগ্রহীতার সহযােগিতা করা। আর যদি ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক মুনাফায় অংশীদারিত্ব উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তাকে ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক লােকসানেও অবশ্যই অংশীদার হতে হবে। সুতরাং মুশারাকা বা অংশীদারী কারবারে ফাইন্যান্সারের মুনাফা ব্যবসায় অর্জিত প্রকৃত লাভের সাথে সম্পৃক্ত। ব্যবসায় মুনাফা যত বেশি হবে, ফাইন্যান্সারের মুনাফার অংশও ততই বৃদ্ধি পাবে। যদি অংশীদারী কারবারে প্রচুর পরিমাণে মুনাফা অর্জিত হয়, তাহলে শিল্পোদ্যক্তাদের এককভাবে তা পুঞ্জিভূত করার সুযােগ থাকে না। বরং ব্যাংকের একাউন্ট হােল্ডার হিসেবে সাধারণ লােকজনও তাতে অংশীদার হয়। এভাবে মুশারাকা পদ্ধতিতে পুঁজিপতিদের তুলনায় সাধারণ জনগণের সহযােগিতার বিষয়ই অগ্রাধিকার পায়।

এ মৌলিক দর্শনের ভিত্তিতেই ইসলাম মুশরাকা বা অংশীদারী কারবারকে সুদি অর্থায়ন (Finance)-এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। এ কথা সত্য যে, মুশারাকা বা অংশীদারী কারবারকে ব্যাপক অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে পূর্ণাঙ্গরূপ দেয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান যুগে অনেক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। কখনাে কখনাে এ ধারণাও করা হয় যে, মুশারাকা একটি প্রাচীন অর্থায়ন পদ্ধতি। যা গতিশীল লেনদেনের নিত্য-নতুন প্রয়ােজন পূরণে সক্ষম নয়। কিন্তু এ জড়বাদী বিষাক্ত ধারণা মুশারাকার শরয়ী মূলনীতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অভাবই জন্ম দিয়েছে। মূলত ইসলাম মুশারাকা বা অংশীদারী কারবারের কোন ধরাবাঁধা রূপ বা সুনির্দিষ্ট কোন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে দেয়নি। বরং এমন কিছু মৌলিক নিয়ম-নীতি বর্ণনা করে দিয়েছে, যাতে বিভিন্ন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অবলম্বনের সুযােগ রয়েছে। মুশারাকা বা অংশীদারী কারবারের নতুন কোন পদ্ধতি বা কর্মপন্থাকে অতীতকালে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না বলেই অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। কেননা, মুশারাকা বা অংশীদারি কারবারের নিত্য-নতুন পদ্ধতি যদি কুরআন, হাদীস ও ইজমায়ে উম্মতের পরিপন্থি না হয়, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযােগ্য হবে। সুতরাং মুশারাকা বা অংশীদারি কারবার শরীয়তসম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে আদি ও প্রাকযুগের প্রক্রিয়ায় সম্পাদিত হওয়া জরুরী নয়।

এ পোস্টে মুশারাকা বা অংশীদারী কারবারের বুনিয়াদী মূলনীতি এবং এর ঐ সকল পদ্ধতি সম্পর্কে আলােচনা করা হয়েছে, যেসব পদ্ধতি আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও কায়কারবারে অবলম্বন করা যেতে পারে। এ আলােচনার উদ্দেশ্য হল উক্ত মৌলিক নীতিমালার বিরুদ্ধাচরণ না করে মুশারাকা বা অংশীদারী কারবারকে আধুনিক অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া। ইসলামী ফিকহের গ্রন্থাবলী এবং ঐসব বুনিয়াদী জটিলতাসমূহকে সামনে রেখে মুশারাকার পরিচয় উপস্থাপন করা হয়েছে, যেসব জটিলতা আধুনিক প্রেক্ষাপটে মুশারাকার বাস্তব প্রয়ােগের ক্ষেত্রে উদ্ভব হতে পারে। আশা করি এ সংক্ষিপ্ত আলােচনা মুসলিম ফকীহ এবং অর্থনীতিবিদদের চিন্তা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মােচন করবে এবং সত্যিকার ইসলামী অর্থব্যবস্থা চালু করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

মুশারাকার স্বরূপ

মুশারাকা এমন একটি পরিভাষা যা ইসলামী অর্থায়ন (Modes of Financing)-এর ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। ইসলামী ফিকহের গ্রন্থাবলীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত শিরকত পরিভাষার তুলনায় মুশারাকা পরিভাষার ব্যবহার অনেকটা সীমিত। এ উভয়টির মৌলিক ধারণা সুস্পষ্ট করার জন্য প্রথমেই মুশারাকা এবং শিরকত পরিভাষার বিশদ ব্যাখ্যা করা প্রয়ােজন মনে করি, যাতে একটির সাথে অপরটির পার্থক্য বুঝে আসে ।

ইসলামী ফিকহ শাস্ত্রে “শিরকত” অর্থ “অংশীদার হওয়া”। ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে শিরকতকে প্রথমে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:  INTEREST RATE IN BANGLADESH

(১) শিরকাতুল মিল্ক (মালিকানায় অংশীদারিত্ব) : কোন বস্তুতে দুই বা ততােধিক ব্যক্তির যৌথ মালিকানা সাব্যস্ত হওয়াকে শিরকাতুল মিল্ক বলে। এ প্রকারের শিরকত দু’ভাবে হতে পারে।

(ক) কখনাে তা অংশীদারদের স্বেচ্ছায় কার্যকর হয়। যেমন- দুই বা ততােধিক ব্যক্তি একত্রে কোন পণ্যসামগ্রী ক্রয় করল। ক্রয় সূত্রে উক্ত পণ্যে উভয়ের যৌথ মালিকানা সাব্যস্ত হয়। এই যৌথ সম্পদের সূত্রে উভয়ের মাঝে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাকে শিরকাতুল মিল্ক বলে। এখানে উভয়ের মাঝের এ সম্পর্ক তাদের সন্তুষ্টিতে অস্তিত্বে এসেছে। কেননা তারা উভয়ে উক্ত সম্পদকে যৌথভাবে ক্রয় করার পথ গ্রহণ করেছে।

(খ) কখনাে অংশীদারদের অনিচ্ছায় অংশীদারিত্ব হয়ে যায়। যেমনকোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীগণ মৃতের পরিত্যক্ত সম্পদে উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা লাভ করে। বিনা চুক্তিতে মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারীগণ মালিকানা লাভ করে বিধায় একে শিরকাতুল মিল্ক বলে।

(২) শিরকাতুল আক্বদ (চুক্তিভিত্তিক অংশীদারিত্ব): শিরকাতুল আকৃদ বলতে এমন অংশীদারিত্ব (Partnership) কে বুঝায়, যা পারস্পরিক চুক্তি ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়। সংক্ষেপে আমরা একে (Joint Commercial Enterprise) বলতে পারি ।

শিরকাতুল আক্বদ আবার তিন প্রকার । যথা-

(১) শিরকাতুল আমওয়াল (মূলধনভিত্তিক অংশীদারিত্ব): যে কারবারে অংশীদারগণ যৌথভাবে পুঁজি বিনিয়ােগ করে, তাকে শিরকাতুল আমওয়াল বলে।

(২) শিরকাতুল আ’মাল (শ্রমভিত্তিক অংশীদারিত্ব): যে কারবারে অংশীদারগণ যৌথভাবে গ্রাহকদেরকে বিভিন্ন সেবা প্রদান করার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং গ্রাহক থেকে অর্জিত পারিশ্রমিক পূর্ব নির্ধারিত হারে পরস্পরের মাঝে বণ্টিত হয়, তাকে শিরকাতুল আ’মাল বলে। যেমনদু’জন দর্জি এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হল যে, তারা উভয়ে গ্রাহকদেরকে সেলাই সংক্রান্ত সেবা প্রদান করবে এবং তারা এ শর্তেও একমত হলাে যে, এভাবে অর্জিত মজুরী এক যৌথ খাতে জমা হতে থাকবে। অতঃপর পরিশ্রম সমান বা কমবেশির প্রতি লক্ষ্য না রেখে তা উভয়ের মাঝে সমহারে বণ্টন হবে। এরূপ চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করাকে শিরকাতুল আমাল বলে। এ পদ্ধতিকে শিরকাতুত্ তাকাবুল (কাজ সগ্রহভিত্তিক অংশীদারিত্ব), শিরকাতুস্ সানাই (পেশাভিত্তিক অংশীদারিত্ব) এবং শিরকাতুল আদান (শারীরিক শ্রমভিত্তিক অংশীদারিত্ব)ও বলে।

(৩) শিরকাতুল ওজুহ (সুনামভিত্তিক অংশীদারিত্ব): যে কারবারে অংশীদারগণ পুঁজি বিনিয়ােগ করে না, বরং স্বীয় পরিচিতি ও বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে ব্যবসা পণ্য বাকিতে ক্রয় করে নগদ বিক্রি করে, এতে যে লাভ হয় তা পূর্ব নির্ধারিত হারে অংশীদারগণ বণ্টন করে নেয়। অংশীদারিত্বের এ তিনটি পদ্ধতিকে ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় “শিরকত” বলা হয় । কিন্তু “মুশারাকা” পরিভাষাটি ফিকহের গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায় না। এ পরিভাষাটি বর্তমান যুগের ইসলামী অর্থায়ন পদ্ধতির উপর গ্রন্থরচনাকারীদের মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এ পরিভাষাটি সাধারণত শিরকতের ঐ বিশেষ প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যাকে শিরকাতুল আমওয়াল বা মূলধনভিত্তিক অংশীদারিত্ব বলা হয়। যে কারবারে দুই বা ততােধিক ব্যক্তি যৌথভাবে নিজ নিজ পুঁজি সরবরাহ করে। এছাড়া কখনাে কখনাে মুশারাকা পরিভাষাটি শিরকাতুল আ’মালকেও বুঝায়, যখন অংশীদারিত্ব সেবামূলক (Services) কারবারে সংঘটিত হয়।

উল্লেখিত আলােচনা দ্বারা পরিষ্কার প্রতিভাত হয়েছে, যে অর্থে বর্তমান যুগে মুশারাকা পরিভাষাটি ব্যবহার হয়ে থাকে, শিরকত পরিভাষাটি তার চেয়ে ব্যাপক অর্থবােধক। মুশারাকা দ্বারা শুধুমাত্র শিরকাতুল আমওয়াল (মূলধনভিত্তিক অংশীদারিত্ব) কেই বুঝানাে হয়। অপরদিকে শিরকত শব্দে মালিকানায় অংশীদারিত্ব এবং অন্যান্য সকল প্রকারের অংশীদারিত্বই। অন্তর্ভুক্ত।

মুশারাকাযেহেতু “মুশারাকা” আমাদের আলােচ্য বিষয়ের সাথে বেশি সম্পৃক্ত এবং শিরকাতুল আমওয়ালের প্রায় সদৃশ্য। তাই এ পর্যায়ে আমাদের। আলােচনা সেদিকে নিবদ্ধ করব। প্রথমে শিরকাতুল আমওয়ালের ব্যাখ্যা অতঃপর আধুনিক ফিন্যান্সিং-এর ক্ষেত্রে এর প্রয়ােগের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলােচনা করব।

শিরকত

দুই প্রকার :

১। শিরকাতুল মিলক (মালিকানায় অংশীদারিত্ব) । দুই প্রকার – ১। ঐচ্ছিক ২। বাধ্যতামূলক

২। শিরকাতুল আক্বদ (চুক্তিভিত্তিক অংশিদারিত্ব)। তিন প্রকার – ১। শিরকাতুল আমওয়াল। (ব্যবসায় অংশীদারিত্ব) ২। শিরকাতুল আ’মাল (সেবায় অংশীদারিত্ব) ৩। শিরকাতুল ওজুহ (সুনাম ভিত্তিক অংশীদারিত্ব)

মুশারাকার মৌলিক বিধি-বিধান

(১) মুশারাকা’ বা ‘শিরকাতুল আমওয়াল’ এমন এক সম্পর্ক যা সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং যেকোন চুক্তি সঠিক ও শুদ্ধ হওয়ার অপরিহার্য শর্তাবলী এ ক্ষেত্রেও প্রযােজ্য, বিধায় তা এখানে বর্ণনা করার প্রয়ােজন নেই। যেমনউভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তির যােগ্যতা থাকা। (অর্থাৎ, কেউ অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও উম্মাদ ইত্যাদি না হওয়া) এ চুক্তি যেকোন ধরনের চাপ, ধোঁকা-প্রতারণা ও ভুল বর্ণনা ব্যতীত উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া, ইত্যাদি, ইত্যাদি। তবে এমন কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় রয়েছে, যা শুধুমাত্র মুশারাকা চুক্তির সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত। সে বিষয়গুলাে সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষিপ্ত আলােকপাত করা হলাে।

মুনাফা বণ্টন

(২) অংশীদারদের মাঝে লভ্যাংশ বণ্টনের হার চুক্তি বাস্তবায়নের সময়ই নির্ধারণ করে নিতে হবে। এভাবে লভ্যাংশ বণ্টনের হার নির্ধারণ করা না হলে অংশীদারী কারবারের চুক্তি শরীয়ত সম্মত হবে না।

(৩) প্রত্যেক অংশীদারের মুনাফা বণ্টনের হার প্রকৃত মুনাফার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে। তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত পুঁজির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যাবে না। কোন অংশীদারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ বা বিনিয়ােগকৃত পুঁজির বিনিময়ে নির্ধারিত কোন অংক ধার্য করা বৈধ নয়। (অর্থাৎ- কোন অংশীদারের লভ্যাংশ বণ্টনের হার প্রকৃত লাভের শতকরার ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে তার বিনিয়ােগকৃত পুঁজির এত শতাংশ লাভ পাবে এরূপ নির্ধারণ করা বৈধ নয়)।

যেমন- ‘ক’ এবং ‘খ’ তাদের একটি অংশীদারী কারবারে লভ্যাংশ বণ্টনের হার এভাবে নির্ধারণ করল যে, ‘ক’ নিজের অংশ হিসেবে প্রতিমাসে লভ্যাংশের দশ হাজার টাকা নিবে। অবশিষ্ট মুনাফা ‘খ’ গ্রহণ করবে। এ ধরনের অংশীদারিত্ব শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক হবে না । তেমনিভাবে যদি এরূপ চুক্তি করা হয় যে, ‘ক’ লাভ হিসেবে তার মূলধনের শতকরা পনের ভাগ নিবে, এ ধরণের চুক্তিও বৈধ হবে না। লভ্যাংশ বণ্টনের সঠিক বিধান হল, ব্যবসায় অর্জিত প্রকৃত মুনাফা শতকরার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা।

যদি কোন অংশীদারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ বা তার মূলধনের বিনিময়ে শতকরা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তাহলে চুক্তিনামায় এ বিষয়টিও অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে, অংশীদারকে প্রদত্ত এ টাকা চুক্তির মেয়াদান্তে সর্বশেষ যে হিসাবনিকাশ করা হবে তার অধীনে থাকবে। অর্থাৎ, যেকোন অংশীদার যত টাকা নিবে তার সাথে Payment of Account-এর হিসাব-নিকাশ করা হবে। এ টাকা চুক্তির মেয়াদান্তে উক্ত অংশীদারের প্রাপ্য লভ্যাংশের সাথে সংযুক্ত করা হবে। আর যদি ব্যবসায় আদৌ কোন লাভই না হয়ে থাকে বা আশাতীত লাভের তুলনায় কম হয়, তাহলে উক্ত অংশীদার যে পরিমাণ টাকা নিয়েছিল তা ফেরৎ দিতে হবে।

মুনাফার হার

(৪) মুনাফার হার অংশীদারদের বিনিয়ােগকৃত পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে হওয়া আবশ্যক কি না? এ প্রশ্নের ব্যাপারে মুসলিম ফিকহবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়।

ইমাম মালেক এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে প্রত্যেক অংশীদারকে তার বিনিয়ােগকৃত মূলধনের পরিমাণ অনুপাতে লাভ প্রদান করা মুশারাকা’ যথার্থ ও বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত। অতএব ‘ক’ যদি মােট মূলধনের ৪০% বিনিয়ােগ করে তাহলে সে লভ্যাংশের ৪০%ই পাবে। সুতরাং লভ্যাংশের ৪০% অপেক্ষা কম বা বেশি নির্ধারণ করে কোন চুক্তি করা হলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে না।

অপরদিকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে অংশীদারদের পারস্পরিক আলােচনা সাপেক্ষে লভ্যাংশের হার বিনিয়ােগকৃত পুঁজির অনুপাত অপেক্ষা কম বা বেশি হতে পারবে। সুতরাং ৪০% বিনিয়ােগকারীর জন্য লাভের ৬০-৭০% এবং ৬০% বিনিয়ােগকারীর জন্য শুধুমাত্র ৩০-৪০% গ্রহণ করা বৈধ হবে।

আরো পড়তে পারেন:  ঘরে বসে অনলাইনে ব্যাংক একাউন্ট খোলা

তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ইমাম আবু হানীফা (রহ.) কর্তৃক, তিনি উল্লেখিত দৃষ্টিভঙ্গিদ্বয় সমন্বয় করে বলেন, সাধারণ অবস্থায় লভ্যাংশের হার বিনিয়ােগকৃত পুঁজির অনুপাত অপেক্ষা কম বা বেশি হতে পারবে। কিন্তু কোন অংশীদার যদি চুক্তিপত্রে এ মর্মে সুস্পষ্ট শর্তারােপ করে যে, সে কখনাে সক্রিয়ভাবে ব্যবসায় অংশ গ্রহণ করবে না, বরং মুশারাকার পুরাে মেয়াদে সে নিষ্ক্রিয় অংশীদার (Sleeping partner) হিসেবে থাকবে। এমতাবস্থায় তার লভ্যাংশের হার বিনিয়ােগকৃত পুঁজির অনুপাত অপেক্ষা বেশি হতে পারবে না।

লােকসানে অংশীদারিত্ব

লভ্যাংশ বণ্টনের ক্ষেত্রে ফিকহবিদদের মাঝে মতানৈক্য থাকলেও লােকসানের ক্ষেত্রে সকল ইসলামী আইনবেত্তা এ ব্যাপারে একমত যে, প্রত্যেক অংশীদার তার বিনিয়ােগকৃত মূলধনের পরিমাণ অনুপাতে লােকসান বহন করবে। সুতরাং যে অংশীদার শতকরা ৪০ ভাগ পুঁজি বিনিয়ােগ করবে, সে লােকসানের ৪০%ই বহন করবে। কমবেশি বহন করবে না। এর পরিপন্থি যে কোন শর্ত করা হলে তা চুক্তিকে অকার্যকর করে দিবে। এ মূলনীতির ব্যাপারে (লােকসান পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে বহন করতে হবে) সকল ফকীদের ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

উল্লেখিত আলােচনার সারমর্ম হল- ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে প্রত্যেক অংশীদারের লাভ ও লােকসান উভয়টিই তার পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে হতে হবে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে অংশীদারদের মধ্যকার সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতে লভ্যাংশের হার পুঁজির অনুপাত অপেক্ষা কম বা বেশি হতে পারবে। কিন্তু লােকসানের ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদার তাদের বিনিয়ােগকৃত পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে লােকসান বহন করতে হবে।

এ নীতিমালাকে একটি প্রসিদ্ধ ফিহী সূত্রে (Maxim) এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে- “লাভ পাবে উভয়ের মাঝে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এবং লােকসান হবে বিনিয়ােগকৃত মূলধন অনুপাতে।”

মূলধন বা পুঁজির ধরন

অধিকাংশ ফিকহবিদ এ মত পােষণ করেন যে, প্রত্যেক অংশীদারের বিনিয়ােগকৃত পুঁজি-মূলধন তরল তিথা সহজে অর্থে রূপান্তরযােগ্য (Liquid)] প্রকৃতির হতে হবে। অর্থাৎ- মুশারাকা বা অংশীদারী চুক্তি কেবলমাত্র নগদ অর্থে (Money) হতে পারে; পণ্য বা দ্রব্যে নয়। এতদসত্ত্বেও এ বিষয়ে ফিকহবিদদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।

(১) ইমাম মালেক (রহ.)-এর নিকট ‘মুশারাকা’ বা অংশীদারী কারবার বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য মূলধন তরল প্রকৃতির হওয়া শর্ত নয়। সুতরাং যে কোন অংশীদার অংশীদারী কারবারে দ্রব্যগত প্রকৃতির মূলধনও বিনিয়ােগ করতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে উক্ত অংশীদারের অংশের মূল্য চুক্তি সম্পাদনের তারিখের প্রচলিত বাজারদর অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। কোন কোন হাম্বলী ফিক্হবিদও এ মত গ্রহণ করেছেন।

(২) ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মত হলাে, কোন অংশীদারের অংশ দ্রব্যগত প্রকৃতির মূলধন হতে পারবে দু’টো কারণে তারা এ দৃষ্টিভঙ্গি পােষণ করেন।

প্রথমত, তারা বলেন যে, প্রত্যেক অংশীদারের দ্রব্য অপর অংশীদারের দ্রব্য থেকে সর্বদা পৃথক ও ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। যেমন- ‘ক’ যদি একটি গাড়ি ব্যবসায় বিনিয়ােগ করে এবং ‘খ’ও আরেকটি গাড়ি ব্যবসায় বিনিয়ােগ করে, এমতাবস্থায় এ দুটো গাড়ির প্রত্যেকটি তাদের ব্যক্তি মালিকানায়। এখন যদি ‘ক’ এর গাড়ি বিক্রি করে দেয়া হয়, তাহলে এ বিক্রির সকল দায়-দায়িত্ব অবশ্যই ‘ক’-এর উপর বর্তাবে। ‘ক’-এর বিক্রিত গাড়ির মূল্যে ‘খ’ এর কোন দাবী করার অধিকার নেই।

অতএব, যেহেতু প্রত্যেক অংশীদারের সম্পদ অন্য অংশীদারের সম্পদ। থেকে স্বতন্ত্র, তাই এ কারবারে কোন অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। পক্ষান্তরে যদি প্রত্যেক অংশীদারের বিনিয়ােগকৃত পুঁজি তরল প্রকৃতির (মুদ্রায়) হয়, তাহলে কোন অংশীদারের পুঁজি অপরের পুঁজি থেকে পৃথক করা যায় না। কেননা, মুদ্রা (টাকা-পয়সা) নির্দিষ্ট করা দ্বারা নির্দিষ্ট হয় না । সুতরাং তারা একটি (Common pool) যৌথ একাউন্ট গঠন করেছেন বলে ধরে নেয়া হবে এবং এভাবে অংশীদারিত্ব অস্তিত্ব লাভ করবে। দ্বিতীয়ত, ‘মুশারাকা বা অংশীদারী চুক্তিতে কোন কোন সময় অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অংশীদারগণকে তাদের প্রত্যেকের অংশ পুনর্বণ্টন করতে হয়। সেক্ষেত্রে বিনিয়ােগকৃত পুঁজি তরল না হয়ে দ্রব্যের আকৃতিতে হলে, তা বিক্রি করা ব্যতীত অংশীদারদের মাঝে পুনর্বণ্টন করা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় যদি দ্রব্যের বিক্রিত মূল্যের ভিত্তিতে পুঁজি পুনর্বণ্টন করা হয়, তাহলে এমনও হতে পারে, কোন কোন দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, এক অংশীদার তার বিনিয়ােগকৃত দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসার সমুদয় লাভ পেয়ে যাবেন, আর অপর অংশীদারগণ বঞ্চিত হবেন; কিছুই পাবেন না। অপরদিকে যদি উক্ত দ্রব্যের মূল্য হ্রাস পায়, তাহলে এ আশংকা রয়েছে যে, এ অংশীদার তার বিনিয়ােগকৃত মূলধন ছাড়াও অন্য অংশীদারের বিনিয়ােগকৃত দ্রব্যের প্রকৃত মূল্যের কিছু অংশও হস্তগত করে নিবেন।

(৩) ইমাম শাফেয়ী (রহ.) উল্লেখিত দু’টি মতের মাঝামাঝি আরেকটি মত গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, দ্রব্য দুই প্রকার।

(১) সমতুল্য বস্তু ও অর্থাৎ- যে দ্রব্য নষ্ট হয়ে গেলে তার ক্ষতিপূরণ এমন জিনিস দ্বারা দেয়া যায়, যা গুণাগুণ এবং পরিমাণের দিক থেকে নষ্ট দ্রব্যের সমতুল্য হয়। যেমন গম, চাউল ইত্যাদি। যদি একশ কেজি গম নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে গুণগত দিক থেকে নষ্ট গমের পরিবর্তে আরেকশ’ কেজি গম অনায়াসেই দেয়া যায়।

(২) মূল্যনির্ভর বস্তু ও অর্থাৎ- যে দ্রব্য নষ্ট হয়ে গেলে ঐ জাতীয় দ্রব্য দ্বারা এর ক্ষতিপূরণ দেয়া যায় না। যেমন প্রাণী, জীব-জন্তু। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি ছাগলের নিজস্ব বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে, যা অপর ছাগলের মধ্যে পাওয়া যায়না। এ কারণে যদি কোন ব্যক্তি কারাে ছাগলকে হত্যা করে, তাহলে সমতুল্য ছাগল দিয়ে উক্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে না। বরং এস্থলে ছাগলের বাজার মূল্য দিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এখন ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, প্রথম প্রকারের দ্রব্য (অর্থাৎ সমতুল্য বস্তু)কে ‘মুশারাকা’য় পুঁজির অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে। তবে দ্বিতীয় প্রকারের দ্রব্য (অর্থাৎ মূল্যনির্ভর বস্তু)কে পুঁজির অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবেনা।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) দ্রব্যকে দু’ভাগে, তথা সমতুল্য বস্তু ও মূল্যনির্ভর বস্তুতে বিভক্ত করে ইমাম আহমাদ (রহ.) কর্তৃক দ্রব্যগত মূলধন দ্বারা অংশীদারিত্বের উপর উত্থাপিত দ্বিতীয় অভিযােগ নিরসন করে দিয়েছেন। কেননা, পুঁজি সমতুল্য বস্তুর ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদারকে তার বিনিয়ােগকৃত দ্রব্যের সমতুল্য বস্তু ফেরৎ দেয়ার মাধ্যমে পুনর্বণ্টন সম্ভব । তবে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর পক্ষ থেকে প্রথম অভিযােগের কোন জবাব দেয়া হয়নি। এই অভিযােগ নিরসনে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, সমতুল্য বস্তু পুঁজি হিসেবে ঐ ক্ষেত্রে পরিগণিত হতে পারে, যে ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদারের প্রদত্ত দ্রব্য অপরের অংশের সাথে এমনভাবে মিশ্রিত করা যাবে যে, এক অংশীদারের দ্রব্য অপর অংশীদারের দ্রব্য থেকে পৃথক করা যায় না।

মূল কথা হল, যদি কোন অংশীদার মুশারাকা কারবারে দ্রব্যগত মূলধন দিয়ে অংশীদার হতে চায়, তবে ইমাম মালেক (রহ.)-এর মত অনুযায়ী তিনি বিনা প্রতিবন্ধকতায় অংশীদার হতে পারবেন। তবে উক্ত অংশীদারের অংশের মূল্য অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদনের তারিখে দ্রব্যের বাজার মূল্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে দ্রব্যগত মূলধনের প্রথম প্রকার তথা সমতুল্য বস্তুকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু মূল্যনির্ভর বস্তুকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

আরো পড়তে পারেন:  ব্যাংক একাউন্ট খুলতে কি কি লাগে

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে দ্রব্য যদি সমতুল্য বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তা পুঁজির অংশ ঐ ক্ষেত্রে হতে পারবে, যে ক্ষেত্রে প্রত্যেক অংশীদারের দ্রব্য অপরের দ্রব্যের সাথে মিশ্রণ করা যাবে। আর যদি দ্রব্য মূল্যনির্ভর বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তা মুশারাকায় পুঁজির অংশ হতে পারবে না।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইমাম মালেক (রহ.)-এর মত অধিক সহজ এবং যুক্তিসঙ্গত মনে হয় এবং তা আধুনিক ব্যবসা বাণিজ্যের প্রয়ােজন পূরণ করে। তাই এর উপর আমল করা যেতে পারে।

উপরােক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, মুশারাকার মূলধন নগদেও হতে পারে এবং দ্রব্যের আকারেও হতে পারে। তবে দ্রব্যের ক্ষেত্রে দ্রব্যের বাজার দর অনুযায়ী মূলধনে অংশীদারের অংশ নির্ধারণ করা হবে।

মুশারাকার ব্যবস্থাপনা

মুশারাকার (অংশীদারী কারবার) সাধারণ নিয়ম-নীতি হল, প্রত্যেক অংশীদার-এর (Management) ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এবং কাজ করার অধিকার রাখে। তবে অংশীদারগণ এ শর্তেও একমত হতে পারে যে, তাদের মধ্য থেকে যে কোন একজনের উপর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে, অপর কোন অংশীদার মুশারাকার জন্য কাজ করবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় অংশীদারগণ (Sleeping partner) তাদের বিনিয়ােগকৃত পুঁজির অনুপাত অপেক্ষা অধিক লাভ পাবে না, বরং পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে পাবে যা পূর্বে আলােচনা করা হয়েছে।

যদি সকল অংশীদার যৌথ কারবার ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়ভাবে কাজ করতে একমত হয়, তবে ব্যবসার সকল বিষয়ে তাদের প্রত্যেকেই একে অপরের প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য হবে এবং ব্যবসার সাধারণ অবস্থায় অংশীদারদের যে কেউ যে কোন কাজ করবে, তার ব্যাপারে এ কথা ধরে নেওয়া হবে যে, অন্য অংশীদারগণও তাতে অনুমতি দিয়েছে।

মুশারাকা (অংশীদারী কারবার) বিলুপ্ত করা

নিম্নেল্লেখিত যে কোন অবস্থায় মুশারাকা কারবার বিলুপ্ত হয়েছে বলে গণ্য হবে।

(১) প্রত্যেক অংশীদারের যে কোন সময় অপর অংশীদারকে নােটিশ প্রদান করে মুশারাকা বিলুপ্ত করার অধিকার রয়েছে। এ ধরণের নােটিশের মাধ্যমে মুশারাকা কারবার বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

এক্ষেত্রে মুশারাকার সমুদয় সম্পদ যদি নগদ তরল আকৃতির হয়, তাহলে তা অংশীদারদের মাঝে তাদের অংশ অনুপাতে বণ্টন করা হবে। আর সম্পদ যদি তরল প্রকৃতির না হয়, তাহলে অংশীদারগণ দু’টি পদ্ধতির যে কোন একটি অবলম্বন করতে পারে। হয়ত দ্রব্যগত সম্পদকে তারল্য করে (অর্থাৎ বিক্রি করে মুদ্রায় রূপান্তরিত করে) অথবা দ্রব্যগত সম্পদকেই পরস্পরে বণ্টন করে নিবে। যদি এ ব্যাপারে অংশীদারদের মাঝে মতবিরােধ দেখা দেয়, যেমন- কোন অংশীদার সমুদয় সম্পদকে তরল আকৃতিতে (Liquidation) রূপান্তরিত করতে চায়, অপরদিকে অন্য অংশীদার হুবহু দ্রব্যগত সম্পদকেই বন্টন করতে চায়, তাহলে শেষােক্ত (দ্রব্যগত সম্পদ বন্টনের) দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রাধান্য দেয়া হবে। কেননা, মুশারাকা বিলুপ্তির পর সমুদয় সম্পদে অংশীদারদের যৌথ মালিকানা থাকে। আর যৌথ মালিকানাধীন সম্পদের ব্যাপারে প্রত্যেক অংশীদারের জন্য ঐ দ্রব্যটি হুবহু বণ্টন বা স্বীয় অংশ পৃথকের দাবী করার অধিকার রয়েছে। কেউ তাকে তারল্য (Liquidation) করার প্রতি চাপ প্রয়ােগ করতে পারে না। তবে সম্পদ যদি এমন হয়, যে গুলােকে পৃথক করে বণ্টন করা যায় না, যেমন- মেশিনারী দ্রব্য। সে ক্ষেত্রে ঐ সম্পদকে বিক্রি করে বিক্রিলব্ধ অর্থ অংশীদারদের মাঝে বণ্টন করা হবে।

(২) মুশারাকা চলাকালীন যদি কোন অংশীদারের মৃত্যু হয়, তাহলে মৃত ব্যক্তির অংশীদারিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে মৃতের উত্তরাধিকারীগণ ইচ্ছা করলে তার অংশীদারিত্ব উঠিয়ে নিতে পারবে, অথবা মুশারাকা চুক্তি অব্যাহত রাখতে পারবে।

(৩) অংশীদারদের কেউ যদি পাগল বা উম্মাদ হয়ে যায়, কিংবা কোন কারণে ব্যবসায়িক চুক্তির যােগ্যতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে মুশারাকা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ব্যবসা বিলুপ্ত না করে মুশারাকা বিলুপ্ত করা

যদি কোন অংশীদার মুশারাকা বিলুপ্ত করতে চায়, অপরদিকে অন্য অংশীদার বা অংশীদারগণ ব্যবসা অব্যাহত রাখতে চায়, তাহলে পারস্পরিক আলােচনার ভিত্তিতে তা করা যেতে পারে। যে সকল অংশীদার ব্যবসা অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক, তারা বিলুপ্তকারী অংশীদারের অংশ ক্রয় করে নিবে। কেননা, কোন অংশীদারের মুশারাকা বিলুপ্তি করার অর্থ এটা নয় যে, এই মুশারাকা কারবার অন্যান্য অংশীদারের সাথেও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

এরূপ ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব বিলুপ্তকারীর অংশের মূল্য পারস্পরিক আলােচনা ও সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা জরুরী। যদি উক্ত অংশীদারের মূল্য নির্ধারণে মতবিরােধ দেখা দেয় এবং অংশীদারদের সর্বসম্মতিক্রমে কোন মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে মুশারাকা প্রত্যাহারকারী অংশীদার স্বয়ং ব্যবসার পণ্যসামগ্রী (যেভাবে আছে সেভাবেই) বণ্টন করে; অথবা পণ্যসামগ্রী বিক্রি করত তারল্যে রূপান্তরিত করে তার অংশ নিয়ে অন্যান্য অংশীদার থেকে পৃথক হয়ে যেতে পারবে।

এখানে প্রশ্ন হয় যে, মুশারাকায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পূর্বে অংশীদারগণ এ শর্তারােপ করতে পারবে কি না যে, সকল অংশীদার বা অধিকাংশ অংশীদারের সম্মতি ব্যতীত ব্যবসার সম্পদ বন্টন কিংবা তরল আকৃতিতে রূপান্তরিত করা যাবে না এবং কোন একক অংশীদার অংশীদারিত্ব থেকে পৃথক হতে চাইলে তার অংশ অন্য অংশীদারের নিকট বিক্রি করে দিতে হবে। ব্যবসার সম্পদ বণ্টন বা তরল আকৃতিতে রূপান্তরিত করার জন্য তিনি অন্যান্য অংশীদারকে বাধ্য করতে পারবেন না।

ইসলামী ফিকহের গ্রন্থাবলীতে এ প্রশ্নের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে বাহ্যিকভাবে শরীয়তের দৃষ্টিতে এতে কোন অসুবিধা নেই। বরং অংশীদারগণ মুশারাকা চুক্তির শুরু লগ্নে এ ধরনের শর্তে আবদ্ধ হতে পারবে। কোন কোন হাম্বলী ফকীহগণ এ ধরনের শর্তে আবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট অনুমতি দিয়েছেন।

এই নতুন শর্তটি বিশেষত আধুনিক প্রেক্ষাপটে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রতীয়মান হয়। কেননা, বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবসায় সফলতার জন্য অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখার দাবী করে। শুধুমাত্র একজন অংশীদারের দাবীর প্রেক্ষিতে ব্যবসার সম্পদ তরল আকৃতিতে রূপান্তর বা বণ্টন করার দ্বারা অন্য অংশীদারদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে যেতে পারে।

একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়ােগ করে যদি কোন ব্যবসা শুরু করা হয় এবং প্রকল্পের শৈশবকালেই অংশীদারদের কোন একজন সম্পদের তারল্য চায়, তাহলে এ ক্ষেত্রে তাকে বিনা কারণে সম্পদের তারল্য বা বণ্টনের স্বাধীনতা প্রদান করা অন্য অংশীদারদের উন্নয়নের জন্য এমনিভাবে মারাত্মক ক্ষতি হবে যেমনিভাবে সমাজের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকারক হয়। তাই এ ধরনের শর্ত ন্যায়সঙ্গত বলে মনে হয়। এধরনের শর্তারােপের সমর্থনে একটি মূলনীতিও রয়েছে, যে মূলনীতিটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি প্রসিদ্ধ। হাদীসে বর্ণনা করেছেন।   “মুসলমানদের যাবতীয় বিষয় তাদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে আরােপিত শর্ত অনুযায়ীই হয়ে থাকে, তবে সে শর্ত ব্যতীত যা হালালকে হারাম করে বা হারামকে হালাল করে।” (আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৫৫)

এ যাবৎ “শিরকাতুল আমওয়াল” বা “মুশারাকা”-এর মৌলিক ও প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আলােচনা করা হয়েছে। এ পর্যায়ে মুশারাকার এমন কিছু মূলনীতি সম্পর্কে আলােচনা করতে চাই, যা বর্তমান যুগের বৈধ পন্থায় আধুনিক অর্থায়ন পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট। তবে এ আলােচনাটি “মুদারাবা” (Mudarabah)-এর প্রাথমিক আলােচনার পর করা অধিক যৌক্তিক মনে করি। যা (মুদারাবা) লভ্যাংশে অংশীদারিত্বের আরেকটি প্রধান ও আদর্শিক অর্থায়ন পদ্ধতি। যেহেতু মুশারাকা এবং মুদারাবা পদ্ধতিতে অর্থায়নের বিধি-বিধান একই ধরণের এবং বাস্তব প্রয়ােগের মূলনীতির দিক দিয়েও উভয়ে সম্পর্কযুক্ত, তাই মুশারাকার’ বাস্তব প্রয়ােগের মূলনীতির আলােচনার পূর্বে মুদারাবার’ অর্থায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে আলােচনা করা অধিক উপকারী মনে করি।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *