মুরাবাহা কি আলোচনা কর

অধিকাংশ ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুরাবাহাকে একটি ইসলামী অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তাদের অধিকাংশ অর্থায়ন কার্যক্রম (Financial Operations) মুরাবাহার ভিত্তিতেই  পরিচালিত হয়ে থাকে। এ কারণেই বর্তমানে এই পরিভাষাটি অর্থনীতির পরিধিতে একটি ব্যংকিং পদ্ধতি হিসেবে প্রচলিত। অথচ মুরাবাহার প্রকৃত রূপ এই ধারণা থেকে ব্যতিক্রম।

মুরাবাহা মূলত ইসলামী ফিকহের একটি পরিভাষা। এর দ্বারা এক বিশেষ প্রকারের ক্রয়-বিক্রয় উদ্দেশ্য হয়। যার প্রকৃত রূপে অর্থায়নের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। যদি কোন বিক্রেতা তার ক্রেতার সাথে এই চুক্তি করে নেয় যে, সে তাকে একটি নির্দিষ্ট পণ্য নির্দিষ্ট মুনাফার ভিত্তিতে প্রদান করবে, সে মুনাফা ঐ পণ্যের ক্রয় মূল্যের উপর বর্ধিত করা হবে। তাহলে এই ক্রয়-বিক্রয়কে “মুরাবাহা” বলা হয়। মুরাবাহার মূল উপাদান এই যে, বিক্রেতার পণ্য সামগ্রী সংগ্রহ করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা ক্রেতাকে অবগত করে তার উপর কিছু মুনাফা সংযােজন করে নেয়া। এই মুনাফা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থের আকৃতিতেও হতে পারে এবং শতকরার ভিত্তিতেও হতে পারে।

মুরাবাহার ক্ষেত্রে মূল্য পরিশােধ নগদেও হতে পারে এবং উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে পরবর্তী যেকোন তারিখেও হতে পারে। এ কারণে মুরাবাহা অপরিহার্যভাবে শুধুমাত্র বাকিতে পরিশােধ (Deffered Payment) করাকেই বুঝায় না। যা সাধারণত ঐ সকল লােকেদের ধারণা যারা ইসলামী ফিকহের ব্যাপারে অধিক জ্ঞান রাখেনা এবং যারা শুধুমাত্র ব্যাংকিং লেনদেনের সুবাদেই মুরাবাহার নাম শুনে থাকে।

মৌলিক ভাবে মুরাবাহা একটি সাধাসিধা ক্রয়-বিক্রয়। যে বৈশিষ্ট্যটি তাকে ক্রয়-বিক্রয় অন্যান্য প্রকারসমূহ থেকে পৃথক করে দেয় তা এই যে, মুরাবাহায় বিক্রেতা সুস্পষ্টভাবে ক্রেতাকে এ কথা বলে দেয় যে, তার কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং ব্যয়ের উপর কি পরিমাণ মুনাফা নিতে চায়। যদি কোন ব্যক্তি ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা ব্যতীত কোন জিনিস একটি নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রি করে, তাহলে তা মুরাবাহা হবে না। যদিও সে তার ব্যয়ের উপর মুনাফা অর্জন করে। কেননা, এই ক্রয়-বিক্রয় ব্যয়ের উপর কিছু অতিরিক্ত সংযােজন (“Cost-Plus”) করার উপর ভিত্তি নয়। এ ক্ষেত্রে তাকে “দর কষাকষি ক্রয়-বিক্রয় বলা হয়।

এটা হল মুরাবাহা পরিভাষার প্রকৃত অর্থ, যা একটি নির্ভেজাল এবং সাধাসিধা ক্রয়-বিক্রয়। কিন্তু অন্যান্য আরাে কিছু নিয়ম-নীতি বৃদ্ধি করে একে ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে এধরনের চুক্তি বিশুদ্ধ হওয়া কিছু শর্তের উপর নির্ভরশীল, যেগুলাের প্রতি পূর্ণ লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য, যাতে করে এই চুক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযােগ্য হয়।

এসব শর্তসমূহকে সঠিকভাবে বুঝার জন্য সর্বপ্রথম এ কথা মনে রাখা জরুরী যে, মুরাবাহা সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক প্রকারের ক্রয়-বিক্রয়ই।। যার কারণে বিশুদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়ের সকল আনুষঙ্গিক বিষয়াবলী তাতে পাওয়া যাওয়া অপরিহার্য। সুতরাং ক্রয়-বিক্রয়ের কয়েকটি মৌলিক বিধিবিধান বর্ণনার মাধ্যমে এই আলােচনার সূচনা করা হচ্ছে, যেগুলাে ব্যতীত কোন প্রকারের ক্রয়-বিক্রয়ই শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হতে পারে না। এরপর আমরা ঐসব বিধানাবলী সম্পর্কে আলােচনা করব যেগুলাে “মুরাবাহা”র সাথে সম্পর্ক রাখে। অতঃপর ব্যাখ্যার দ্বারা এ কথা বর্ণনা করা হবে যে, মুরাবাহাকে গ্রহণযােগ্য অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করার পদ্ধতি কি।

এক্ষেত্রে বিস্তারিত নীতিমালাসমূহকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বাক্যে বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে যেন আলােচ্য বিষয়ের মৌলিক সূক্ষ্ম বিষয়সমূহ সহজেই দৃষ্টিগােচর হয়ে যায় এবং সূত্র প্রদানে সহজতার জন্য সংরক্ষণ . করা যায়।

ক্রয়-বিক্রয়ের কয়েকটি বিধি-বিধান

ইসলামে ক্রয়-বিক্রয়ের এই সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে যে, “মূল্যবান জিনিসকে মূল্যবান জিনিসের-ই বিনিময়ে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে আদানপ্রদান করা।” মুসলিম ফিকহবিদগণ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ব্যাপারে অনেক বিধি-বিধান উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলাের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বর্ণনা করার জন্য কয়েক খণ্ডে অনেক গ্রন্থও রচনা করেছেন। এখানে শুধুমাত্র সেসব বিধি-বিধানের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলােচনা করা উদ্দেশ্য যেগুলাের সম্পর্ক বিনিয়ােগ প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত মুরাবাহার সাথে রয়েছে।

বিধান নং-১ঃ যে পণ্য বিক্রি করা হবে, বিক্রির সময় তা বিদ্যমান থাকতে হবে। সুতরাং যে পণ্য এখনাে অস্তিত্বে আসেনি, তা বিক্রি করা যাবে না। সুতরাং পারস্পরিক সন্তুষ্টিতেও যদি কোন অস্তিত্বহীন পণ্য বিক্রি করা হয়, তাহলে এই বিক্রি শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হবে।

যেমন : “ক” তার গাভীর বাচ্চা যা এখনাে জন্ম হয়নি “খ” এর নিকট বিক্রি করছে, এই বিক্রি বাতিল বলে গণ্য হবে।

বিধান নং-২: যে পণ্য বিক্রি করা হবে, বিক্রির সময় তা বিক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে। সুতরাং যে পণ্য বিক্রেতার মালিকানায় নেই তা বিক্রি করা যাবে না। যদি মালিকানা প্রতিষ্ঠার পূর্বে তা বিক্রি করা হয়, তাহলে বিক্রি বাতিল বলে গণ্য হবে।

যেমন: “ক” “খ” এর নিকট একটি গাড়ি বিক্রি করছে, যা এখনাে “গ” এর মালিকনায় রয়েছে। কিন্তু সে আশাবাদী, গাড়িটি “গ” থেকে ক্রয় করে “খ” এর নিকট হস্তান্তর করে দিবে। যেহেতু গাড়িটি বিক্রির সময় “ক” এর মালিকানায় ছিল না, সেহেতু এই বিক্রি বাতিল বলে গণ্য হবে।

বিধান নং-৩ঃ যে পণ্য বিক্রি করা হবে, বিক্রির সময় তা বিক্রেতার প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ কজায় থাকতে হবে। “পরােক্ষ” কজা দ্বারা উদ্দেশ্য এমন অবস্থা, যে অবস্থায় কজাকারী উক্ত পণ্য বাহ্যিকভাবে তার অধীনে নেয়নি কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণে এসে গিয়েছে এবং পণ্যের যাবতীয় দায় দায়িত্বও তার উপর ন্যস্ত হয়ে গিয়েছে। সেসব দায়-দায়িত্বের মধ্যে উক্ত পণ্যের ধ্বংসের আশংকা এবং ঝুঁকিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ, এই পণ্য যদি ধ্বংস বা ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে এ কথা মনে করা হবে যে, তা ক্রেতার ক্ষতি হয়েছে।

যেমন : (১) “ক” “খ” থেকে একটি গাড়ি ক্রয় করেছে, “খ” এখনাে ঐ গাড়িটি “ক” বা তার উকিলের কাছে হস্তান্তর করেনি। এমতাবস্থায় “ক” এই গাড়িটি “গ” এর নিকট বিক্রি করতে পারবে না। যদি সে গাড়িটি কজা করার পূর্বে বিক্রি করে দেয়, তাহলে বিক্রি শুদ্ধ হবে না।

(২) “ক” “খ” থেকে একটি গাড়ি ক্রয় করেছে, “খ” ঐ গাড়িটি নির্দিষ্ট এবং চিহ্নিত করার পর তা এমন একটি গ্যারেজে রেখে দিয়েছে, যেখানে “ক” এর স্বাধীনভাবে প্রবেশ করার অনুমতি রয়েছে এবং “খ” তাকে অনুমতি প্রদান করেছে যে, সে গাড়িকে গ্যারেজ থেকে যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিয়ে যেতে পারবে এ পর্যায়ে গাড়ির দায়ভার “ক” এর উপর ন্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এমতাবস্থায় গাড়ি “ক” এর পরােক্ষ কজায় (Constructive Possession) হয়ে গিয়েছে। সুতরাং এ পর্যায়ে “ক” যদি গাড়ির উপর বাহ্যিক এবং প্রত্যক্ষ কজা ব্যতীত “গ” এর নিকট বিক্রি করে দেয় তাহলে বিক্রি শুদ্ধ হবে।

ব্যাখ্যা নং-১ঃ ১ থেকে ৩ নং বিধানের সারাংশ হল কোন ব্যাক্তি এমন জিনিস বিক্রি করতে পারবে না, যা-

(১) এখনাে অস্তিত্বে আসেনি।

(২) বিক্রেতার মালিকানায় নেই।

(৩) বিক্রেতার প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ কজায় নেই।

ব্যাখ্যা নং-২ : প্রকৃত বিক্রি (Actual Sale) এবং শুধুমাত্র বিক্রির অঙ্গীকারের মাঝে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃত বিক্রি ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত উপরােক্ত তিনটি শর্ত পূর্ণ না করা হয়। তবে কোন ব্যক্তি এমন জিনিসের বিক্রির অঙ্গীকার করতে পারে যা তার মালিকানায় কিংবা কজায় নেই। মূলত বিক্রির অঙ্গীকার দ্বারা অঙ্গীকারকারীর উপর শুধুমাত্র চারিত্রিকভাবে তার অঙ্গীকার পূরণের দায়িত্ব অর্পিত হয়। এই অঙ্গীকার পূরণে সাধারণত আদালতের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা যায় না। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ করে যখন অঙ্গীকার করার কারণে দ্বিতীয় পক্ষের উপর কিছু দায়-দায়িত্ব অর্পিত হয়ে যায়, তখন এই অঙ্গীকার আদালতের মাধ্যমেও পূরণ করা যেতে পারে। এমতাবস্থায় আদালত অঙ্গীকারকারীকে তার কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করার ব্যাপারে অর্থাৎ কার্যত বিক্রির জন্য বাধ্য করবে। সে যদি অঙ্গীকার পূরণ করতে না পারে, তাহলে ওয়াদা খেলাফীর কারণে দ্বিতীয় পক্ষের প্রকৃত যে ক্ষতি হয়েছে আদালত অঙ্গীকারকারীকে তা আদায়ের নির্দেশ দিবে। কিন্তু কার্যত বিক্রি সেসময় সংঘটিত হবে যখন উক্ত পণ্য বিক্রেতার কজায় আসবে। তখন। নতুন করে ইজাব-কবুলের (প্রস্তাবনা ও প্রস্তাব গ্রহণের প্রয়ােজন হবে। যতক্ষন পর্যন্তএভাবে বিক্রি না হবে ততক্ষন পর্যন্ত তার আইনগত ফলাফল কার্যকর হবে না।

বর্জন:

বিধান নং- ১-৩ এ উল্লেখিত নিয়মে দু’প্রকারের বিক্রি বর্জন করা হয়েছে। (১) বাইয়ে সালাম (২) ইসতিসনা।

এই উভয় প্রকারের বিক্রি সম্পর্কে সামনে একটি পৃথক অধ্যায়ে আলােচনা করা হবে।

বিধান নং-৪ঃ বিক্রি বিনা শর্তে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সংঘটিত হতে হবে। সুতরাং যে বিক্রি ভবিষ্যতের কোন তারিখের সাথে সম্পৃক্ত হবে কিংবা আগত কোন ঘটনার উপর নির্ভরশীল হবে, সে বিক্রি বাতিল বলে গণ্য হবে। উভয়পক্ষ যদি ক্রয়-বিক্রয়কে বিশুদ্ধ করতে চায়, তাহলে তাদেরকে তখন নতুনভাবে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি সম্পাদন করতে হবে, যখন ভবিষ্যতের সে তারিখ এসে যাবে কিংবা আরােপিত শর্ত পাওয়া যাবে, যার উপর বিক্রি নির্ভরশীল ছিল।

যেমন : (১) “ক” পহেলা জানুয়ারী “খ”কে বলল যে, আমি তােমার নিকট আমার গাড়ি পহেলা ফেব্রুয়ারী থেকে বিক্রি করলাম, তাহলে এই বিক্রি বাতিল বলে গণ্য হবে। কেননা তাকে ভবিষ্যতের একটি তারিখের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

(২) “ক” “খ”কে বলল যে, অমুক পার্টি যদি নির্বাচনে জয়লাভ করে, তাহলে মনে করা হবে আমার গাড়ি তােমার কাছে বিক্রি হয়েছে। এই বিক্রিও বাতিল বলে গণ্য হবে। কেননা, তাকে ভবিষ্যতের একটি ঘটনার উপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

বিধান নং-৫ঃ বিক্রিয় পণ্য মূল্যবান হতে হবে। সুতরাং ব্যবসায়িক প্রথায় যেসব জিনিসের কোন মূল্য নেই, তা বিক্রি করা যাবে না।

বিধান নং-৬ঃ বিক্রিয় পণ্য এমন না হতে হবে, যা শুধুমাত্র হারাম উদ্দেশ্যেই ব্যবহার হয়ে থাকে অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয় না।

বিধান নং-৭ঃ যে জিনিস বিক্রি করা হচ্ছে, তা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানা থাকতে হবে এবং ক্রেতাকে সে জিনিস সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান প্রদান করতে হবে।

ব্যাখ্যা নং-৩ঃ বিক্রিয় পণ্য নির্ধারণ ইঙ্গিতের মাধ্যমেও হতে পারে এবং এমন বিস্ত রিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমেও হতে পারে যার দ্বারা বিক্রিয় পণ্য ঐসব পণ্য থেকে পৃথক হয়ে যায় যেগুলাের বিক্রি উদ্দেশ্য নয়।

যেমন: একটি বিল্ডিং, যে বিল্ডিং-এ একই সাইজে নির্মিত কয়েকটি এ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। বিল্ডিং-এর মালিক “ক” “খ”কে বলল যে, “আমি তােমার নিকট এসব এ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটি এ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করছি”, “খ”ও গ্রহণ করে নিয়েছে, এ বিক্রি ততক্ষণ পর্যন্ত শুদ্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত মৌখিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কিংবা সরাসরি ইঙ্গিতের মাধ্যমে একটি এ্যাপার্টমেন্ট নির্দিষ্ট করে না দেয়া হয়।

বিধান নং-৮ঃ বিক্রিত পণ্য ক্রেতার কজায় আসা নিশ্চিত হতে হবে । এ কজা শুধুমাত্র ঘটনাক্রমের উপর ভিত্তি কিংবা কোন শর্ত পাওয়া যাওয়ার সাথে নির্ভরশীল না হতে হবে।

যেমন: “ক” তার এমন একটি গাড়ি বিক্রি করছে, যা কোন অপরিচিত ব্যক্তি চুরি করে নিয়ে গিয়েছে এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি এ আশায় ক্রয় করছে যে, “ক” তার গাড়িটি পুনরায় পেয়ে যাবে, এই বিক্রি শুদ্ধ হবে না।

বিধান নং-৯ : মূল্য নির্ধারণ করাও বিক্রি শুদ্ধ হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত। মূল্য যদি নির্ধারিত না হয়, তাহলে বিক্রয় শুদ্ধ হবে না।

যেমন : “ক” “খ”কে বলল যে, মূল্য এক মাসের মধ্যে পরিশােধ করা হলে পঞ্চাশ টাকা এবং দু’মাসের মধ্যে পরিশােধ করা হলে পঞ্চান্ন টাকা হবে। “খ”ও একথার উপর একমত হয়ে যায়, এক্ষেত্রে মূল্য অনির্দিষ্ট হওয়ার কারণে বিক্রি শুদ্ধ হবে না। তবে পর্যায়ক্রমিক দুটি মূল্যের যে কোন একটিকে বিক্রির সময় নির্ধারণ করে নেয়া হলে শুদ্ধ হবে।

বিধান নং-১০ ও বিক্রিতে কোনরূপ শর্ত থাকতে পারবে না। যে বিক্রিতে কোন শর্তারােপ করা হবে তা ফাসিদ হবে। তবে যে শর্ত ব্যবসায়িক প্রথায় প্রচলিত এবং ব্যবহৃত থাকে তাতে কোন অসুবিধা নেই।

যেমন : (১) “ক” “খ” থেকে একটি গাড়ি এ শর্তে ক্রয় করছে যে, সে তার ছেলেকে স্বীয় ফার্মে কর্মচারি হিসেবে রাখবে। এ বিক্রি শর্তযুক্ত হওয়ার কারণে ফাসিদ হয়ে যাবে।

(২) “ক” “খ” থেকে একটি ফ্রিজ এ শর্তে ক্রয় করছে যে, “খ” দু’বছর পর্যন্ত এর ফ্রী সার্ভিস প্রদান করবে। এই শর্তটি যেহেতু এ ধরনের লেনদেনের অংশ হিসেবে পরিচিত, তাই এই শর্তারােপ করা সহীহ আছে এবং বিক্রিও শুদ্ধ হবে।

বাইয়ে মুয়াজ্জাল

(মূল্য বাকিতে পরিশােধের ভিত্তিতে বিক্রি)

(১) যে ক্রয়-বিক্রয়ে উভয়পক্ষ এ ব্যাপারে একমত পােষণ করে যে, মূল্য পরে পরিশােধ করা হবে তাকে “বাইয়ে মুয়াজ্জাল” বলা হয়।

(২) বাইয়ে মুয়াজ্জালও বৈধ তবে শর্ত হল মূল্য পরিশােধের তারিখ সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত করে নিতে হবে।

(৩) মূল্য পরিশােধের সময় নির্দিষ্ট তারিখের ভিত্তিতেও নির্ধারণ করা যেতে পারে (যেমন- পহেলা জানুয়ারী পরিশােধ করা হবে) এবং নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতেও হতে পারে, যেমন- তিন মাস পর পরিশােধ করা হবে।  কিন্তু মূল্য পরিশােধের সময় ভবিষ্যতের এমন কোন ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট করে নির্ধারণ করা যাবে না যার চূড়ান্ত তারিখ অজ্ঞাত এবং অনিশ্চিত যদি পরিশােধের তারিখ অনির্দিষ্ট কিংবা অনিশ্চিত হয়, তাহলে বিক্রি শুদ্ধ হবে ।

(৪) যদি মূল্য পরিশােধের জন্য একটি বিশেষ সময় নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে, যেমন- এক মাস, তাহলে সময়ের হিসাব ক্রেতা বিক্রয় পন্য হস্তগত করার সময় থেকে শুরু হবে। তবে উভয়পক্ষ যদি অন্য কোন চুক্তির উপর একমত’ হয়ে থাকে, তাহলে চুক্তি অনুযায়ী শুরু হবে।

(৫) বাকির ক্ষেত্রে মূল্য নগদ অপেক্ষা অধিকও হতে পারে। তবে চুক্তির সময়ই তা নির্ধারণ করতে হবে।

(৬) একবার যে মূল্য নির্ধারিত হয়ে যায়, নির্ধারিত সময়ের পূর্বে পরিশােধের কারণে কিংবা নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্বে পরিশােধের কারণে তাতে কম-বেশী করা বৈধ নয়।

(৭) কিস্তি সময়মত পরিশােধের জন্য ক্রেতার উপর চাপ সৃষ্টি করার সুবিধার্থে তাকে এই অঙ্গীকার করার জন্য বলা যেতে পারে যে, সময় মত পরিশােধ না করার ক্ষেত্রে সে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কোন জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য দান করবে, এমতাবস্থায় বিক্রেতা সে অর্থ ক্রেতা থেকে উসূল করতে পারবে কিন্তু নিজের আয়ের অংশ হিসেবে নয় বরং ক্রেতার পক্ষ হতে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার জন্য। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলােচনা সামনে এই অধ্যায়েই আসবে। –

(৮) মূল্য কিস্তিতে পরিশােধের ভিত্তিতে যদি পণ্য বিক্রি করা হয়, তাহলে বিক্রেতা এই শর্তও আরােপ করতে পারে যে, ক্রেতা যদি কোন একটি কিস্তিও সময়মত পরিশােধ না করে, তাহলে অবশিষ্ট সকল কিস্তি তাৎক্ষণিকভাবে পরিশােধ করা আবশ্যকীয় হয়ে যাবে।

(৯) সময়মত মূল্য পরিশােধ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিক্রেতা ক্রেতা থেকে কোন সিকিউরিটি প্রদানের দাবী করতে পারে, তা বন্ধকের আকৃতিতেও হতে পারে কিংবা অন্য কোন মাধ্যমেও হতে পারে।

(১০) ক্রেতা থেকে প্রমিসরী নােট বা বিনিময় বিল (Bill of exchange) স্বাক্ষরের দাবীও করতে পারে। তবে এই প্রমিসরী নােট বা হুন্ডিকে তৃতীয় কোন ব্যক্তির নিকট তার গায়ে লিখিত মূল্যের চেয়ে কম বা অধিক মূল্যে বিক্রি করতে পারবে না।

মুরাবাহা

(১) মুরাবাহা ক্রয়-বিক্রয়ের এক বিশেষ প্রকার। যে ক্রয়-বিক্রয়ে বিক্রেতা বিক্রিত পণ্যের ব্যয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেয় এবং তার উপর কিছু মুনাফা সংযােজন করে অন্যের নিকট বিক্রি করে।

(2) মুরাবাহায় মুনাফা (Mark Up) নির্ধারণ পারস্পরিক সন্তুষ্টিতে দু’পন্থার কোন এক পন্থায় করা যেতে পারে। হয়ত নির্দিষ্ট পরিমাণের অংক সাব্যস্ত করে নিবে (যেমন- মূল ব্যয়ের উপর এত টাকা অতিরিক্ত) অথবা মূল ব্যয়ের উপর বিশেষ আনুপাতিক হার সাব্যস্ত করে নিবে (অর্থাৎ- মূল ব্যয়ের উপর এত পার্সেন্ট অতিরিক্ত)।

(৩) বিক্রিত পণ্য সংগ্রহ করতে বিক্রেতার যে পরিমাণ টাকা ব্যয় হয়েছে যেমন- মালের ভাড়া, কাস্টম ডিউটি ইত্যাদি সব কিছু ব্যয়ে সংযােজন হবে এবং মুনাফা (Mark Up) সামগ্রিক ব্যয়ের উপর ধার্য করা হবে। কিন্তু ব্যবসার ঐসব খরচ যা শুধুমাত্র একবার পণ্য সংগ্রহ করতে ব্যয় হয় না, বরং বারংবার হতে থাকে যেমন- কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিল্ডিং ভাড়া ইত্যাদি এসব ব্যয়কে একক লেনদেনের ব্যয়ে সংযােজন করা যাবে না। তবে মূল ব্যয়ের উপর যে মুনাফা নির্ধারণ করা হবে তাতে সব ধরনের খরচের প্রতিও লক্ষ্য রাখা যাবে।

(৪) মুরাবাহা ঐ ক্ষেত্রে শুদ্ধ হবে যখন পণ্যের পূর্ণ ব্যয় নির্ধারণ করা যাবে। যদি পণ্যের পূর্ণ ব্যয় নির্ধারণ করা না যায়, তাহলে তাকে মুরাবাহা হিসেবে বিক্রি করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে উক্ত পণ্য দর কষাকষির (Bargaining) ভিত্তিতে বিক্রি করা যাবে। অর্থাৎ- এ ক্ষেত্রে পণ্যের ব্যয় এবং তার উপর নির্ধারিত মুনাফার পরিমাণ ক্রেতাকে জানানাে হবে না। এ সময় পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য ধার্য করা হবে।

যেমন : (১) “ক” এক জোড়া জুতা একশ’ টাকায় ক্রয় করেছে, সে উক্ত জুতা দশ পার্সেন্ট মুনাফার ভিত্তিতে মুরাবাহায় বিক্রি করতে চায় । এখানে মূল ব্যয় যেহেতু পূর্ণভাবে জানা আছে, সেহেতু মুরাবাহার ভিত্তিতে বিক্রি করা শুদ্ধ হবে।

(২) “ক” একই চুক্তিতে একটি রেডিমেট স্যুট এবং এক জোড়া জুতা পাঁচ টাকায় ক্রয় করেছে। এখানে স্যুট এবং জুতা উভয়টি এক সাথে মুরাবাহার ভিত্তিতে বিক্রি করতে পারবে। কিন্তু শুধুমাত্র জুতাকে মুরাবাহার ভিত্তিতে বিক্রি করতে পারবে না। কেননা, শুধুমাত্র জুতার ব্যয় নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। সে যদি শুধুমাত্র জুতাকেই বিক্রি করতে চায়, তাহলে তাকে জুতার ব্যয় এবং তার উপর মুনাফার পরিমাণ ক্রেতাকে বলা ব্যতীত একটি নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রি করতে হবে।।

মুরাবাহা পদ্ধতিতে অর্থায়ন

মূলত মুরাবাহা অর্থায়ন পদ্ধতি নয় বরং ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিশেষ প্রকার। শরীয়তের দৃষ্টিতে অর্থায়নের আদর্শিক পদ্ধতি হচ্ছে মুশারাকা এবং মুদারাবা । যার ব্যাপারে পূর্বের অধ্যায়ে আলােচনা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক সেট-আপের দৃষ্টিতে অর্থায়নের কোন কোন অধ্যায়ে মুশারাকা এবং মুদারাবাকে ব্যবহার করার মধ্যে কিছু প্রয়ােগিক জটিলতা রয়েছে। যার কারণে এ যুগের অভিজ্ঞ ফিকহবিদগণ বিশেষ কিছু শর্ত সাপেক্ষে বাকিতে পরিশােধের ভিত্তিতে মুরাবাহাকে অর্থায়নের পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু এ সম্পর্কে দুটি মৌলিক বিষয় ভালভাবে জেনে নেয়া জরুরী।

(১) এ কথা মনে রাখা জরুরী যে, মুরাবাহা তার প্রকৃতরূপে অর্থায়ন পদ্ধতি নয়। এটা শুধুমাত্র সুদ থেকে বাঁচার একটি মাধ্যম এবং কৌশল। এটা এমন আদর্শিক অর্থায়ন পদ্ধতি নয়, যা ইসলামের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য পূর্ণ করে। এ জন্য অর্থ ব্যবস্থাকে ইসলামী আদর্শে সাজানাের লক্ষ্যে মুরাবাহাকে একটি সাময়িক ধাপ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত এবং মুরাবাহার ব্যবহার সেসব ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত যেখানে মুশারাকা এবং মুদারাবাকে প্রয়ােগ করা যায় না।

(২) গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় বিষয়টি হল, শুধুমাত্র সুদের স্থলে মুনাফা কিংবা মার্কআপ শব্দ ব্যবহার করলেই মুরাবাহা বাস্তবায়ন হয় না। মূলত শরীয়ত বিশেষজ্ঞগণ মুরাবাহাকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে কয়েকটি শর্তের সাথে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত সে সব শর্ত পরিপূর্ণভাবে পালন না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুরাবাহা বৈধ হবে না। হাকীকত এই যে, সে সব শর্ত পালন করার দ্বারাই সুদী ঋণ এবং মুরাবাহার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। যদি সে সব শর্ত পালন না করা হয়, তাহলে এই চুক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ হবে না।

মুরাবাহা পদ্ধতিতে অর্থায়নের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ

(১) মুরাবাহা সুদভিত্তিক প্রদেয় ঋণ নয়। বরং মুরাবাহা হচ্ছে, মূল্য বাকিতে পরিশােধের ভিত্তিতে কোন পণ্য বিক্রি করা, যার মূল্যে ব্যয় ব্যতীত নির্ধারিত মুনাফাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

(2) মুরাবাহা যেহেতু একটি ক্রয়-বিক্রয়, ঋণ প্রদান করা নয়, সেহেতু তাতে ঐসব শর্ত পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যাওয়া অপরিহার্য, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য নির্ধারিত। বিশেষ করে সে সব শর্ত যা এই অধ্যায়ের প্রারম্ভে বর্ণনা করা হয়েছে।

(৩) মুরাবাহাকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে শুধুমাত্র তখনই ব্যবহার করা যেতে পারে, যখন বাস্তবিকপক্ষে গ্রাহকের কোন পণ্য ক্রয়ের জন্য ফান্ডএর প্রয়ােজন হবে। যেমন- গ্রাহকের জিনেং ফ্যাক্টরির জন্য কাঁচা মাল হিসেবে তুলার প্রয়ােজন, তখন তার নিকট মুরাবাহার ভিত্তিতে তুলা বিক্রি করা যাবে। কিন্তু যেখানে অন্য কোন উদ্দেশ্যে ফ্যান্ড-এর প্রয়ােজন হয়, যেমন- যেসব মাল পূর্বে ক্রয় করা হয়েছে, সেগুলাের মূল্য পরিশােধ, বিদুৎ বিল কিংবা অন্য বিলসমূহ আদায়, অথবা কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য অর্থের প্রয়ােজন। এমতাবস্থায় মুরাবাহা প্রয়ােগ করা যাবে না। কেননা, মুরাবাহায় শুধুমাত্র ঋণ প্রদান করা যথেষ্ট হয় না, বরং প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হওয়া অপরিহার্য।

(৪) কোন পণ্য গ্রাহকের নিকট বিক্রির পূর্বে অর্থায়নকারীর তাতে মালিকানা প্রতিষ্ঠা হওয়া অপরিহার্য।

(৫) বিক্রির পূর্বে সে পণ্য অর্থায়নকারীর প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ কজায়। থাকতে হবে। অর্থাৎ- সে পণ্য কিছুক্ষণের জন্য চাই একেবারে স্বল্প সময়ই হােক না কেন, তার দায়ভারে থাকতে হবে।

(৬) শরীয়তের দৃষ্টিতে মুরাবাহার সর্বোত্তম পদ্ধতি এই যে, অর্থায়নকারী স্বয়ং উক্ত পণ্য ক্রয় করে নিজের কজায় নিয়ে নিবে। অথবা এ কাজ তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে উকিল নিয়ােগ করে তার মাধ্যমে করাবে। অতঃপর সে পণ্য গ্রাহকের নিকট বিক্রি করবে। তবে যে ক্ষেত্রে কোন কারণে সরবরাহ কারী থেকে সরাসরি ক্রয় করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে এই অনুমতিও আছে যে, অর্থায়নকারী গ্রাহককে নিজের উকিল হিসেবে। নিয়ােগ করবে। গ্রাহক অর্থায়নকারীর পক্ষ হতে সে পণ্য ক্রয় করবে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক প্রথমে উক্ত পণ্য অর্থায়নকারীর পক্ষ হতে উকিল হিসেবে ক্রয় করবে এবং তাতে তার প্রতিনিধি হিসেবে কজা করবে। অতঃপর তার থেকে বাকি মূল্যে ক্রয় করবে। প্রথম পর্যায়ে উক্ত পণ্যে গ্রাহকের কজা অর্থায়নকারীর উকিল হিসেবে হবে। এ সময় পণ্যটি গ্রাহকের কজায় শুধুমাত্র আমানত হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে, মালিকানা থাকবে অর্থায়নকারীর। ফলে এর দায়ভারও অর্থায়নকারীর উপরই থাকবে। তবে গ্রাহক যখন অর্থায়নকারী থেকে সে পণ্য ক্রয় করে নিবে, তখন মালিকানা এবং দায়ভার গ্রাহকের দিকে প্রত্যাবর্তন হয়ে যাবে।

(৭) পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন পণ্য বিক্রেতার কজায় না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার বিক্রি সঠিক হবে না। কিন্তু সে পণ্য যদি বিক্রেতার কজায় না থাকে, তাহলে বিক্রির অঙ্গীকার করতে পারবে। এই নীতিমালা মুরাবাহায়ও গ্রহণযােগ্য।

(৮) উল্লেখিত নীতিমালাসমূহের আলােকে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিম্ন বর্ণিত প্রক্রিয়া গ্রহণ করে মুরাবাহাকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

প্রথম ধাপ : আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রাহক একটি বহুমুখী চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করবে, যার আলােকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান কাংক্ষিত পণ্যের বিক্রি এবং গ্রাহক উক্ত পণ্য যথাসময়ে একটি নির্ধারিত মুনাফা অনুপাতে ক্রয় করার অঙ্গীকার করবে। চুক্তিনামায় এই ক্রয়-বিক্রয় বাস্তবায়নের সর্বশেষ সময়ও নির্ধারণ

করা যেতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপঃ গ্রাহকের (Client) যখন নির্দিষ্ট পণ্যের প্রয়ােজন হবে, তখন আর্থিক প্রতিষ্ঠান সে পণ্য ক্রয়ের জন্য গ্রাহককে তার উকিল নিয়ােগ করবে। ওকালতির এই চুক্তিনামায় উভয়পক্ষের স্বাক্ষর থাকতে হবে।

তৃতীয় ধাপ : গ্রাহক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে সে পণ্য ক্রয় করবে এবং প্রতিষ্ঠানের উকিল হিসেবে তা কজা করবে।

চতুর্থ ধাপঃ গ্রাহক প্রতিষ্ঠানকে পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে অবগত করবে এবং সে পণ্য তার থেকে ক্রয় করার প্রস্তাব করবে।

পঞ্চম ধাপ : আর্থিক প্রতিষ্ঠান সে প্রস্তাব গ্রহণ করবে, তাতে ক্রয়-বিক্রয় পূর্ণ হয়ে যাবে। যার ফলে উক্ত পণ্যের মালিকানা এবং দায়ভার উভয়টি গ্রাহকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়ে যাবে।

সঠিক মুরাবাহার জন্য এই পাঁচটি ধাপ অপরিহার্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি সে পণ্য সরবরাহকারী (Supplier) থেকে সরাসরি ক্রয় করে নেয় (এবং এটাই সর্বোত্তম) তাহলে ওকালতি চুক্তির প্রয়ােজন থাকবে না। এমতাবস্থায় দ্বিতীয় ধাপ থাকবে না। তৃতীয় ধাপে আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বয়ং সাপ্লাইকারী থেকে ক্রয় করবে এবং চতুর্থ ধাপে শুধুমাত্র গ্রাহকের পক্ষ হতে প্রস্তাব হবে।

এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই, যে পণ্যে মুরাবাহা হচ্ছে, সে পণ্য তৃতীয় এবং পঞ্চম ধাপের মধ্যবর্তী সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি এবং দায়ভারে থাকে।

এই একটি বৈশিষ্ট্য, যা মুরাবাহাকে সুদি ঋণ থেকে ভিন্ন করে দেয়, এ জন্য প্রত্যেক মূল্যে তার প্রতি লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য। নচেৎ মুরাবাহা চুক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক হবে না।

(৯) মুরাবাহা সঠিক হওয়ার জন্য এটাও জরুরী যে, সে পণ্য তৃতীয় কোন পার্টি থেকে ক্রয়কৃত হতে হবে। পণ্যটি স্বয়ং গ্রাহক থেকে buy back এর ভিত্তিতে ক্রয় করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কেননা, বাই ব্যাক-এর ভিত্তিতে মুরাবাহা সুদভিত্তিক ঋণ-ই।

(১০) মুরাবাহার উল্লেখিত প্রক্রিয়া একটি জটিল চুক্তি, যে চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষ এক এক ধাপে এক এক রূপ ধারণ করে।

(ক) প্রথম ধাপে আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রাহক ভবিষ্যতে কোন পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে অঙ্গীকার করে, এটা প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় নয়। এটা শুধুমাত্র ভবিষ্যতে মুরাবাহার ভিত্তিতে বিক্রির একটি অঙ্গীকার। এ জন্য উভয়ের মাঝে অঙ্গীকারকারী (promisor) এবং অঙ্গীকার গ্রহণকারীর (promisee) সম্পর্ক হয়।

(খ) দ্বিতীয় ধাপে উভয়পক্ষের মাঝে মক্কেল এবং উকিলের সম্পর্ক হয়।

আরো পড়তে পারেন:  মুরাবাহার চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক ত্রুটি বিচ্যুতি

(গ) তৃতীয় ধাপে আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরবরাহকারীর (supplier)। মাঝে বিক্রেতা এবং ক্রেতার সম্পর্ক হয় ।

(ঘ) চতুর্থ এবং পঞ্চম ধাপে গ্রাহক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাঝে বিক্রেতা এবং ক্রেতার সম্পর্ক শুরু হয়ে যায়। বিক্রি যেহেতু বাকি মূল্যে হচ্ছে, সেহেতু বিক্রির সাথে সাথে ঋণদাতা এবং ঋণগ্রহিতার সম্পর্কও শুরু হয়ে যায়।

এসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং সেগুলাের যথা সময়ে স্বীয় পরিণামের সাথে বাস্তবায়ন হওয়া জরুরী। এ বিষয়গুলাে পরস্পরে বিমিশ্রিত ও তালগােল পাকানাে অবস্থা সৃষ্টি না হওয়া উচিত।

(১১) মূল্য সময়মত পরিশােধের আশ্বস্ততার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহক থেকে কোন ধরনের জামানতের দাবীও করতে পারবে। সে বিল অফ একচেঞ্জ কিংবা প্রমিসরী নােটে স্বাক্ষরেরও দাবী করতে পারবে। কিন্তু এ দাবী তখন করতে পারবে, যখন কার্যত ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদন হয়ে যাবে। অর্থাৎ- পঞ্চম ধাপে। তার কারণ হল, প্রমিসরী নােটে স্বাক্ষর ঋণগ্রহিতা ঋণদাতার অধিকারের উপর করে। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রাহকের মাঝে এ সম্পর্ক পঞ্চম ধাপেই বাস্তবায়ন হয়, যখন কার্যত ক্রয়বিক্রয় অস্তিত্বে এসে যায়।

(১২) ক্রেতা যদি সময়মত মূল্য পরিশােধ করতে না পারে, তাহলে এ কারণে মূল্যে বৃদ্ধি করা যাবে না। তবে ক্রেতা এ চুক্তি করেছিল যে, সে এক্ষেত্রে জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে অর্থ প্রদান করবে, তাই এ অর্থ পরিশােধ করা তার কর্তব্য হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে বাইয়ে মুয়াজ্জালের বিধি-বিধান বর্ণনা করার সময় ৭ নং বিধানে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু ক্রেতা থেকে গ্রহণকৃত এই অর্থ অর্থায়নকারী কিংবা বিক্রেতা তাদের আয়ের অংশ বানাতে পারবে না। বরং তাদের কর্তব্য হবে সে অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা। এ ব্যাপারে আরাে বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে।

মুরাবাহা সম্পর্কে কয়েকটি আলােচনা

মুরাবাহার মৌলিক ধারণা সম্পর্কে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পর যথাযােগ্য মনে হচ্ছে যে, মুরাবাহায় ঘটমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসাআলার উপর ইসলামী নীতিমালা এবং তা আমলযােগ্য হওয়ার ব্যাপারে আলােচনা করা। কেননা এসব মাসআলাকে সঠিকভাবে বুঝা ব্যতীত মুরাবাহার ধারণা অস্পষ্ট থেকে যায় এবং প্রয়ােগক্ষেত্রে ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে।

(১) বাকি এবং নগদের জন্য পৃথক পৃথক মূল্য নির্ধারণ করা

মুরাবাহা সম্পর্কে সর্বপ্রথম প্রশ্ন হল, যখন মুরাবাহাকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন বিক্রি সর্বদা বাকি মূল্যে হয়। অর্থায়নকারী কাংক্ষিত পণ্য নগদ মূল্যে ক্রয় করে এবং তার গ্রাহকের নিকট বাকিতে বিক্রি করে। বাকিতে বিক্রির ক্ষেত্রে যতদিন পর গ্রাহক মূল্য পরিশােধ করে, সে সময়ের দিকে লক্ষ্য রাখা হয় এবং সে অনুপাতে অর্থায়নকারী মূল্যও বৃদ্ধি করে দেয়। মুরাবাহার পরিপকৃতার সময় (মূল্য পরিশােধের তারিখ) যত বেশি হবে মূল্যও তত বেশি হবে। এ কারণে ইসলামী ব্যাংকসমূহে মুরাবাহায় পণ্যের মূল্য বাজারদর অপেক্ষা বেশি হয়। গ্রাহক যদি সেই পণ্যটি বাজার থেকে নগদ মূল্যে ক্রয় করত, তাহলে মুরাবাহার বাকি মূল্যের থেকে অধিক সস্তায় পেত। এখন প্রশ্ন হল, বাকি বিক্রয়ে কোন জিনিসের মূল্য নগদ মূল্যের তুলনায় অধিক ধার্য করা যাবে কি না। কেউ কেউ বলেন ক্রেতাকে প্রদেয় অবকাশের প্রতি লক্ষ্য রেখে বাকি মূল্যে যে অতিরিক্ত সংযােজন করা হয় তাকে ঋণের উপর গৃহীত সুদেরই সাদৃশ্য মনে করা উচিত। কেননা, উভয় অবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ বাকিতে মূল্য পরিশােধ হওয়ার কারণে গ্রহণ করা হয়। এই যুক্তির ভিত্তিতে তারা বলেন। যে, ইসলামী ব্যাংকসমূহে মুরাবাহার উপর যেভাবে আমল হচ্ছে, তা মূলত আধুনিক ব্যাংকসমূহের সুদি ঋণ থেকে ভিন্ন নয়।

এই যুক্তিটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে যৌক্তিক মনে হলেও মূলত তা শরীয়তে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার উসূলের ভুল বুঝাবুঝির উপর নির্ভরশীল। ব্যাপারটি সঠিকভাবে বুঝার জন্য নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলাে মনে রাখা জরুরী।

(১) আধুনিক পুঁজিবাদি দৃষ্টিভঙ্গী ব্যবসায়িক লেনদেনে পণ্য এবং মুদ্রার (নগদ টাকার) মাঝে কোন পার্থক্য করে না। পারস্পরিক লেনদেনে পণ্য এবং মুদ্রার সাথে সমান আচরণ করা হয়। উভয়টিই ব্যবসাযােগ্য, উভয়টিরই ক্রয়-বিক্রয় ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতিক্রমে যে কোন মূল্যে হতে পারে। কোন ব্যক্তি এক ডলারকে দু’ডলারের বিনিময়ে নগদ বা বাকিতে এমনিভাবে বিক্রি করতে পারে যেমনিভাবে এক ডলার মূল্যের কোন পণ্যকে দু’ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করতে পারে। শর্ত শুধু উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে হওয়া।।

ইসলামী নীতিমালা এই দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করে না। ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী মুদ্রা (নগদ টাকা) এবং পণ্যের পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ কারণে এগুলাের উপর আহকামও পৃথক পৃথক প্রয়ােগ করা হয়। মুদ্রা (Money) এবং পণ্যের (Commodity) মাঝে পার্থক্যের মৌলিক বিষয়গুলাে নিম্নে বর্ণিত হচ্ছে।

(১) মুদ্রার নিজস্ব কোন ভ্যালু নেই। এর দ্বারা সরাসরি মানুষের প্রয়ােজন পূরণ করা যায় না। এগুলােকে শুধুমাত্র পণ্য এবং সেবা অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হয়। পক্ষান্তরে পণ্যের নিজস্ব ভ্যালু রয়েছে। এগুলােকে অন্য কোন জিনিসে রূপান্তরিত করা ব্যতীত সরাসরিও এর দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়।

(২) পণ্য মানদণ্ড এবং গুণগত দিক থেকে বিভিন্ন রকমের হতে পারে। পক্ষান্তরে মুদ্রা শুধুমাত্র মূল্য নির্ধারণ এবং আদান-প্রদানের মাধ্যম। এজন্যই মুদ্রার যে কোন মূল্যমানের একটি একক তার আরেকটি এককের একশ’ পার্সেন্ট সমান। পাঁচশ টাকার পুরাতন এবং ময়লাযুক্ত একটি নােট পাঁচশ টাকার নতুন আরেকটি নােটের একশ’ পার্সেন্ট সমতুল্য। অথচ পণ্য বিভিন্ন মানদণ্ডের হতে পারে। একটি ব্যবহৃত পুরাতন গাড়ির মূল্য একটি নতুন গাড়ির মূল্য অপেক্ষা অনেক কম হয়।

(৩) পণ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি একটি নির্দিষ্ট জিনিসের উপর হয় অথবা কমপক্ষে সে জিনিসের গুণাগুণ নির্দিষ্ট হয়। (যেমন এমন ধরনের গম)। ক’ যদি একটি নির্দিষ্ট গাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে তা ক্রয় করে এবং বিক্রেতাও তাতে একমত পােষণ করে, তাহলে সেই গাড়িটি গ্রহণে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। বিক্রেতা এর স্থলে অন্য কোন গাড়ি নেয়ার জন্য তাকে বাধ্য করতে পারবে না। যদিও অন্য গাড়িটি সেই জাতীয় এবং একই মানদণ্ডের হয়। এরকম শুধু তখন হতে পারে যখন ক্রেতাও এব্যাপারে একমত পােষণ করবে। যার প্রয়ােগিক অর্থ হবে এই যে, প্রথম ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি বাতিল হয়ে গিয়েছে এবং পারস্পরিক সন্তুষ্টিতে নতুন ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হয়েছে।

পক্ষান্তরে মুদ্রা কোন আদান-প্রদানের লেনদেনে নির্দিষ্ট করা যায় না। “ক” যদি “খ” থেকে কোন জিনিস তাকে পাঁচশ টাকার একটি নির্দিষ্ট নােট দেখিয়ে ক্রয় করে, তাহলেও সে উক্ত নােটের স্থলে সেই মূল্যমানের অন্য নােট প্রদান করতে পারবে। বিক্রেতা তাকে এ কথার উপর বাধ্য করতে পারবে না যে, সে শুধুমাত্র সেই নােটটিই নিবে, যা বিক্রির সময় তাকে দেখানাে হয়েছিল।

খরচ

এসব পার্থক্যকে সামনে রেখে ইসলাম মুদ্রা এবং পণ্যের সাথে পৃথক পৃথক আচরণ করে। মুদ্রার যেহেতু নিজস্ব কোন ভ্যালু নেই, সে শুধুমাত্র আদান-প্রদানের মাধ্যম, যার মানদণ্ড এবং গুণগত দিক বলতে কিছুই নেই। সেজন্য মুদ্রার একটি একক সেই মূল্যমানের আরেকটি এককের বিনিময়ে আদান-প্রদান শুধুমাত্র সমান সমান এর ক্ষেত্রে-ই হতে পারে। যদি পাকিস্তানী এক হাজার টাকার একটি নােটের আদান-প্রদান পাকিস্তানী আরেকটি নােটের বিনিময়ে করা হয়, তাহলে দ্বিতীয় নােটটিও এক হাজার টাকার-ই হতে হবে। তার মূল্যমান এক হাজার টাকা থেকে কমবেশি হতে পারবে না। যদি ও ক্রয়-বিক্রয় নগদ হােক না কেন। কেননা, কারেন্সি নােটের না নিজস্ব কোন ভ্যালু আছে এবং না তার যা শরীয়ত সমর্থিত কোয়ালিটিগত কোন পার্থক্য আছে। এ কারণে যে কোন দিকে যে কোন মূল্যমান অতিরিক্ত হবে তা বিনিময় বিহীন হবে, ফলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয হবে। যখন উভয় দিকে মুদ্রার লেন-দেন হবে তখন বিষয়টি যেমনিভাবে নগদ ক্রয়-বিক্রয়ের উপর প্রযােজ্য হয়, তেমনিভাবে বাকি ক্রয়-বিক্রয়ের উপরও প্রযােজ্য হবে। কেননা, টাকার আদান-প্রদান টাকার বিনিময়ে বাকিতে করার সময় যদি একদিক থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র বাকির সময় এবং মেয়াদের বিনিময়েই হবে।

সাধারণ পণ্যে অবস্থা এর চেয়ে ভিন্নরূপ। কেননা, পণ্যের নিজস্ব ভ্যালু রয়েছে এবং পণ্যের মানদণ্ডেও পার্থক্য হয়ে থাকে। এজন্য মালিকের এই অধিকারও রয়েছে যে, চাহিদা ও যােগানের স্বয়ংক্রিয় বিধি অনুযায়ী যে কোন মূল্যে বিক্রি করতে পারবে। বিক্রেতা যদি কোন ধরনের প্রতারণা এবং মিথ্যা বর্ণনা না করে, তাহলে সে ক্রেতার সম্মতিক্রমে পণ্যকে বাজারদরের চেয়ে অধিক মূল্যেও বিক্রি করতে পারবে। ক্রেতা যদি সেই অতিরিক্ত মূল্যে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে বিক্রেতার জন্য এই অতিরিক্ত অর্থও একেবারে বৈধ হবে। যখন নগদ সওদায় পণ্য অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করতে পারে, তাহলে বাকি সওদার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত মূল্য গ্রহণ করতে পারবে। শর্ত শুধু এই যে, বিক্রেতা ক্রেতাকে কোন ধরনের ধোঁকা দিতে পারবে না এবং ক্রেতাকে সেই পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে বাধ্যও করতে পারবে না। বরং সে এই পরিমাণ মূল্য প্রদানে স্বীয় স্বাধীন সন্তুষ্টিতে একমত হতে হবে ।

কোন কোন সময় একথা বলা হয় যে, ক্রয়-বিক্রয় নগদ হওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য বাকিতে আদায়ের উপর নির্ভরশীল নয়, তাই এর তত অনুমতি হওয়া উচিত। কিন্তু যেখানে ক্রয়-বিক্রয় বাকিতে হয় সেখানে

অতিরিক্ত মূল্য সংযােজন একমাত্র সময়ের বিনিময়ে হয়, যার কারণে তাকে সুদেরই সাদৃশ্য করে দেয়। কিন্তু এই যুক্তিও সেই ভ্রান্ত ধারণার উপর নির্ভরশীল যে, যেখানেই পরিশােধের সময়ের দিকে লক্ষ্য রেখে অতিরিক্ত মূল্য সংযােজন করা হয়, সেই লেনদেন সুদের আওতার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই ধারণা করাই সঠিক নয়। বাকিতে পরিশােধের বিনিময়ে গৃহীত অতিরিক্ত পরিমাণ তখনই সুদ হবে, যখন উভয়দিক থেকে চুক্তি  মুদ্রার উপর হবে। কিন্তু যদি পণ্যকে মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়, তাহলে বিক্রেতা মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে কয়েকটি দিককে সামনে রাখে। যার মধ্যে পরিশােধের সময়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এজন্য সে অতিরিক্ত মূল্যও চাইতে পারে এবং ক্রেতা বিভিন্ন কারণের ভিত্তিতে তার সাথে একমত পােষণ করতে পারে।

(ক) যে ক্রেতা মার্কেট কিছুটা দূরে হওয়ার কারণে মার্কেটে যেতে চায় , বিক্রেতার দোকান সেই ক্রেতার খুব নিকটবর্তী।

(খ) ক্রেতার দৃষ্টিতে এই বিক্রেতা অন্যদের তুলনায় অধিক বিশ্বস্ত এবং ক্রেতা বিক্রেতার উপর এ ব্যাপারে অধিক আশ্বস্ত যে, সে তাকে তার কাংক্ষিত বস্তু নির্ভেজাল সরবরাহ করবে।

(গ) যে সব জিনিসের চাহিদা বেশি হয় (এ জন্য তা অপ্রতুল ও হয়ে যায়) সে সব জিনিস বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতা এই ক্রেতাকে প্রাধান্য দেয়, যার কারণে এই ক্রেতাও তার থেকে ক্রয় করা পছন্দ করে, যাতে ঐ জিনিস বাজারে স্বল্প হলেও তা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে।

(ঘ) এর দোকানের পরিবেশ অন্যান্য দোকানের তুলনায় অধিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং আরামদায়ক।

বিক্রেতা গ্রাহক থেকে অধিক মূল্য গ্রহণের জন্য এ জাতীয় আরাে অন্যান্য বিষয় স্বীয় কৌশল হিসেবে অবলম্বন করে। এমনিভাবে যদি কোন বিক্রেতা তার গ্রাহক থেকে অতিরিক্ত মূল্য এ জন্য গ্রহণ করে যে, সে তাকে বাকির সুযােগ প্রদান করছে, তাহলে তাও শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয হবে না। তবে শর্ত হল সে ধোকা দিতে পারবে না এবং ক্রেতা সে পণ্য স্বেচ্ছায়-স্বজ্ঞানে গ্রহণ করতে হবে। কেননা, মূল্যে অতিরিক্তের কারণ যাই হােক না কেন, সম্পূর্ণ মূল্য ঐ জিনিসের বিনিময়েই হয় মুদ্রার বিনিময়ে নয়। একথা সঠিক যে, মূল্য নির্ধারণ করার সময় সে পরিশােধের সময়কে লক্ষ্য রেখেছে। কিন্তু যখন মূল্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে, তখন এই মূল্য উক্ত পণ্যের দিকেই অর্পিত হবে, সময়ের দিকে নয়। একারণেই ক্রেতা যদি নির্ধারিত সময়ে পরিশােধ করতে না পারে, তাহলে মূল্য সেই পরিমাণেই থাকে, বিক্রেতা পরিমান বৃদ্ধি করতে পারে না। মূল্য যদি সময়ের বিনিময়ে হত, তাহলে বিক্রেতা যখন তাকে অতিরিক্ত সময় দেয়, তখন সে মূল্যও বৃদ্ধি করতে পারতাে।

অন্যভাবে এটাও বলা যেতে পারে যে, টাকার আদান-প্রদান যেহেতু শুধুমাত্র সমান সমান হলেই হতে পারে, এজন্য পূর্ব বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী ক্রয়-বিক্রয় বাকি হওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ যে পরিমাণই নেয়া হবে (যখন টাকাকে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হবে ) তা শুধুমাত্র সময়ের বিনিময়েই হবে। এ কারণেই সুদি পদ্ধতিতে নির্ধারিত সময় আসার পর ঋণদাতা ঋণগ্রহীতাকে অতিরিক্ত সময়ের সুযােগ প্রদান করে তার থেকে অতিরিক্ত অর্থও গ্রহণ করে নেয়। পক্ষান্তরে একটি বাকি ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য নির্ধারণে সময় একক উপাদান নয়, মূল্য সেই জিনিসের বিনিময়েই ধার্য করা হয়, সময়ের বিনিময়ে নয়। তদুপরি পূর্বোল্লেখিত অন্যান্য উপাদানের ন্যায় সময়ও মূল্য নির্ধারণে আংশিক সংযােজনের কাজ করেছে, কিন্তু এই উপাদান যখন একবার তার কাজ আদায় করে ফেলেছে, তখন মূল্যের প্রত্যেক অংশ সেই জিনিসের দিকেই অর্পিত হবে।

এসব আলােচনার সারাংশ এই যে, যখন টাকার বিনিময়ে টাকার লেনদেন করা হবে, তখন ক্রয়-বিক্রয় নগদ হােক কিংবা বাকি হােক কোন অবস্থায়ই কম-বেশি করা জায়েয হবে না। কিন্তু যখন টাকার বিনিময়ে কোন পণ্য বিক্রি করা হবে, ক্রয়-বিক্রয় নগদ হােক কিংবা বাকি হােক, তখন উভয়পক্ষের মাঝে নির্ধারিত মূল্য বাজারমূল্য অপেক্ষা বেশিও হতে পারবে। পরিশােধের সময়ের ব্যবধান, মূল্য নির্ধারণে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং তা পরােক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। টাকার বিনিময়ে টাকার লেনদেনের মত নয়, কেননা এক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা শুধুমাত্র সময়ের ব্যবধানের বিনিময়েই হয়ে থাকে।

এই মাসআলাটি চার মাযহাবের ইমামগণের নিকট সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযােগ্য। তারা বলেন যে, বিক্রেতা যদি কোন জিনিসের নগদ এবং কোনরূপ বাকি বিক্রির জন্য পৃথক পৃথক দুটি মূল্য নির্ধারণ করে এবং বাকি বিক্রির মূল্য নগদ মূল্য অপেক্ষা বেশি হয়, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হবে। শর্ত শুধু এই যে, চুক্তির সময়ই সওদা নগদ হবে না বাকি হবে, দু’টির যে কোন একটিকে নির্ধারণ করে নিতে হবে। তাতে অস্পষ্টতা বিদ্যমান থাকতে পারবে না। উদারহরণস্বরূপ ক্রয়-বিক্রয়ে দর কষাকষির (Bargaining) সময় বিক্রেতা ক্রেতাকে বলল, তুমি যদি এই জিনিস নগদ মূল্যে ক্রয় কর, তাহলে একশ’ টাকা, আর যদি ছয় মাসের বাকিতে ক্রয় কর, তাহলে মূল্য হবে একশ’ দশ টাকা। কিন্তু ক্রেতাকে দু’টির যে কোন একটিকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত তখনই গ্রহণ করতে হবে । যেমন সে বলল, এই জিনিস বাকি মূল্যে একশ’ দশ টাকায় ক্রয় করেছে, তাহলে ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদনের সময় মূল্য উভয়পক্ষের মাঝে নির্ধারিত থাকে।

কিন্তু দু’টির যে কোন একটিকে যদি সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করা হয়, তাহলে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হবে না। এমনটি কিস্তিতে পরিশােধের ঐসব ক্রয়-বিক্রয়ও সম্ভব, যেখানে পরিশােধের সময় পৃথক পৃথক হওয়ার কারণে পৃথক পৃথক মূল্যের দাবী করা হয়। তখন বিক্রেতা পরিশােধের সিডিউল হিসেবে মূল্যের একটি সিডিউল তৈরি করে। যেমন তিন মাস বাকির ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা নেয়া হবে, ছয় মাস বাকির ক্ষেত্রে এগারশ’ টাকা, নয় মাস বাকির ক্ষেত্রে বারশ’ টাকা ইত্যাদি। এমতাবস্থায়, ক্রেতা তিনটির কোন একটিকে গ্রহণ করবে তা নির্ধারিত করা ব্যতীত সে জিনিসটি নিয়ে নেয়। আর মনে মনে ভাবে যে, ভবিষ্যতে পরিশােধ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করবে। (অর্থাৎ যদি তিন মাসে পরিশােধ সম্ভব হয়, তাহলে এক হাজার টাকা দিবে আর যদি ছয় মাসে সম্ভব হয়, তাহলে এগারশ’ টাকা দিবে) এই চুক্তি সঠিক হবে না। কেননা, মূল্য এবং পরিশােধের সময় উভয়টি অজানা, কিন্তু সে যদি যে কোন একটিকে সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে নেয়, যেমন সে বলল-এই জিনিসটি ছয় মাসের বাকিতে এগারশ’ টাকায় ক্রয় করেছে, তাহলে ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হবে।

এখানে আরেকটি কথা স্মরণ রাখা উচিত যে, উপরে যে পদ্ধতির বৈধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাহল এই যে, নগদ ক্রয়-বিক্রয় অপেক্ষা বাকি ক্রয়-বিক্রয় মূল্য অধিক ধার্য করা যাবে। তবে বিক্রি যদি নগদই হয়ে থাকে, কিন্তু বিক্রেতা এই শর্তারােপ করে দেয় যে, ক্রেতা যদি মূল্য পরিশােধে বিলম্ব করে, তাহলে সে বার্ষিক দশ পার্সেন্ট অতিরিক্ত জরিমানা হিসেবে কিংবা সুদ হিসেবে গ্রহণ করবে, তাহলে এটা নিশ্চিতরূপে নাজায়েয। কেননা, এখন যে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করা হচ্ছে, তা ঋণের উপর গৃহীত সুদ ছাড়া কিছুই নয়।

উভয় পদ্ধতির মাঝে প্রয়ােগিক পার্থক্য এই, যেখানে অতিরিক্ত টাকা পণ্যের মূল্যেরই একটি অংশ হবে, সেখানে এই অতিরিক্ত টাকা একবারেই উসূল করা হবে, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বারে নয়। ক্রেতা যদি সময়মত পরিশােধ না করে, তাহলে একারণে বিক্রেতা অতিরিক্ত টাকার দাবী করতে পারবে না, বরং মূল্য ততটুকুই থাকবে। পক্ষান্তরে যেখানে বাজারমূল্যের উপর অতিরিক্ত টাকা পণ্যের মূল্যের অংশ হয় না, সেখানে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এই অতিরিক্ত টাকা বাড়তে থাকবে।

(২) প্রচলিত সুদের হারকে নমুনা বানানাে

মুরাবাহার মাধ্যমে অর্থায়নকারী অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের মুনাফার নির্ধারণ প্রচলিত সুদের হারের ভিত্তিতে করে থাকে। যার জন্য সাধারণত LIBOR’ অর্থাৎ লন্ডনে ব্যাংকসমূহের পারস্পরিক সুদের হারকে নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেমন, LIBOR যদি ছয় পার্সেন্ট হয়, তাহলে এই ব্যাংক তার মুনাফা ছয় পার্সেন্ট কিংবা তার চেয়ে কিছু বেশি ধার্য করে নেয়। এই পদ্ধতির উপরও এই অভিযােগ করা হয় যে, যে মুনাফা সুদের হারের উপর নির্ভরশীল হবে, তাও সুদের ন্যায় হারাম হওয়া উচিত।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, হালাল মুনাফা নির্ধারণের জন্য সুদের হারকে ব্যবহার করা অপছন্দনীয় এবং এর দ্বারা এই লেনদেন কমপক্ষে বাহ্যিকভাবে হলেও সুদি ঋণের সাদৃশ্য হয়ে যায়। আর সুদ কঠোরভাবে হারাম হওয়ার দাবি হল এই বাহ্যিক সাদৃশ্যতা থেকেও যথাসম্ভব বেঁচে থাকা উচিত। কিন্তু এই বাস্তবতাও ভুলবার নয় যে, মুরাবাহা সঠিক হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি এই যে, তা একটি প্রকৃত ক্রয়বিক্রয় হতে হবে যেখানে ক্রয়-বিক্রয়ের সকল আনুষঙ্গিক বিষয় পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়। যদি কোন মুরাবাহায় পূর্ব বর্ণিত সেই সব শর্ত পাওয়া যায়, তাহলে শুধুমাত্র মুনাফা নির্ধারণের জন্য সুদের হারকে নমুনা হিসেবে ব্যবহার করার দ্বারা এই চুক্তি অশুদ্ধ এবং হারাম হয়ে যাবে না। কেননা, লেনদেন মূলত সুদের উপর নয়, সুদের হারকে তাে শুধুমাত্র নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ কথাটি একটি উদাহরণের দ্বারা বুঝা যেতে পারে।

“ক” এবং “খ” দু’ভাই। “ক” মদের ব্যবসা করে, যা একেবারে হারাম। “খ” একজন আল্লাহওয়ালা মুসলমান, তাই সে এই ব্যবসাকে পছন্দ করে না। এজন্য সে নেশাবিহীন হালাল পানীয়-এর ব্যবসা শুরু করেছে। কিন্তু সে চায়, তার ব্যবসায়ও সে পরিমাণ মুনাফা হােক, যে পরিমাণ অন্য ভাই মদের ব্যবসায় অর্জন করে। এ জন্য সে মনস্থির করেছে যে, সে তার গ্রাহকদের থেকে ঐ অনুপাতে মুনাফা নিবে, যে অনুপাতে “ক” মদের উপর নেয়। তাহলে সে তার মুনাফার অনুপাতকে “ক” এর নাজায়েয ব্যবসার মুনাফার সাথে সম্পৃক্ত করে নিয়েছে। কোন ব্যক্তি এমন করাটাকে পছন্দ হওয়া বা না হওয়ার অভিযােগ উত্থাপন করতে পারে, কিন্তু এ কথা সুস্পষ্ট যে, কেউ এ কথা বলতে পারবে না, এই বৈধ ব্যবসা থেকে উপার্জিত মুনাফা হারাম। কেননা, সে মদের মুনাফাকে শুধুমাত্র নমুনা হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এমনিভাবে মুরাবাহা যদি ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে হয়ে থাকে এবং তার অপরিহার্য শর্তসমূহও পূরণ করা হয়, তাহলে মুনাফার হারকে প্রচলিত সুদের হারের নমুনায় নির্ধারণ করার দ্বারা এই চুক্তি নাজায়েয হবে ।

তবে এ কথা সত্য যে, ইসলামী ব্যাংকসমূহ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য যত দ্রুত সম্ভব এই পদ্ধতি থেকে নিষ্কৃতি লাভ করা উচিত। কেননা, প্রথমত এতে সুদের হারকে বৈধ ব্যবসার জন্য আদর্শ এবং মানদণ্ড মনে করা হয়, যা অপছন্দনীয়। দ্বিতীয়ত এর দ্বারা ইসলামী অর্থব্যবস্থার মৌলিক দর্শনের অগ্রগতি ও উন্নয়নে চরমােকর্ষণ সাধিত হয় না। কেননা, এর দ্বারা সম্পদ বণ্টন নীতিতে কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করে না। এজন্য ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচিত তারা যেন তাদের মানদণ্ড এবং নমুনা গঠন করে। এর একটি পদ্ধতি এটা হতে পারে যে, ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে তাদের ইন্টার ব্যাংক মার্কেট গঠন করবে। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একটি যৌথ শাখা বানানাে যেতে পারে, যা প্রকৃত সম্পদের ভিত্তিতে আদান-প্রদান যােগ্য ডকুমেন্টে পুঁজি বিনিয়ােগ করবে। যেমন, মুশারাকা, ইজারা ইত্যাদি। যদি সেই শাখার সম্পদ জড় পদার্থ আকৃতির হয় যেমন ইজারাকৃত সম্পদ (Lease) সম্পদ, আসবাবপত্র এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের অংশসমূহ। তাহলে এই শাখার ইউনিটসমূহের ক্রয়-বিক্রয় তার সম্পদের প্রকৃত মূলধনের ভিত্তিতে হতে পারে। যা ধীরে ধীরে নির্ধারণ করা যাবে । এই ইউনিট আদান-প্রদানযােগ্য হবে এবং সেগুলােকে তাৎক্ষণিক এবং সাময়িক অর্থায়নের (Overnight Finance) জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। যেসব ব্যাংক-এর নিকট প্রয়ােজনাতিরিক্ত তারল্য (Liquidity) থাকবে, তারা সেসব ইউনিটসমূহকে ক্রয় করতে পারবে এবং তাদের যখন দ্বিতীয়বার তারল্য অর্জনের প্রয়ােজন হবে, তখন সেগুলাে তারা বিক্রি করতে পারবে। এই ব্যবস্থাপনায় একটি ইন্টার ব্যাংক মার্কেট অস্তিত্বে এসে যাবে এবং ইউনিটসমূহের প্রচলিত মূল্যকে মুরাবাহা ও ইজারায় (Lease) মুনাফা নির্ধারণে নমুনা হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে।

(৩) ক্রয়ের অঙ্গীকার

বর্তমানে শরীয়ত বিদ্বজ্জনদের মাঝে মুরাবাহা সম্পর্কে আরেকটি আলােচনার বিষয় এই যে, গ্রাহক ফিন্যাসের আবেদ করা মাত্রই ব্যাংক/অর্থায়নকারী ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না কেননা, কাংক্ষিত বস্তু তখন ব্যাংক-এর মালিকানায় থাকে না। যেমন পূর্বে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি এমন জিনিস বিক্রি করতে পারবে যা তার মালিকানায় নেই এবং এমন জিনিসও বিক্রি করতে পারবে না যা ভবিষ্যতে অস্তিত্ব লাভ করবে (Forward Sale)। সুতরাং তাকে অবশ্যই প্রথমে সে জিনিস সাপ্লাইকারী থেকে ক্রয় করতে হবে । অতঃপর তা প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ কজা করে গ্রাহকের নিকট বিক্রি করবে। ব্যাংক কিংবা অর্থায়নকারী সে জিনিস ক্রয় করার পর গ্রাহক যদি তা ক্রয় করার পাবন্দী না করে, তাহলে অর্থায়নকারী এমন অবস্থারও সম্মুখীন হতে পারে যে, সেই কাংক্ষিত বস্তু সংগ্রহ করার জন্য অনেক ব্যয় বহন করেছে, কিন্তু গ্রাহক তা ক্রয় করতে অস্বীকার করে দিয়েছে। এই বস্তুটি এমন ধরনেরও হতে পারে যে, মার্কেটে তার ব্যাপক চাহিদা নেই এবং তা থেকে নিস্কৃতি পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে অর্থায়নকারীর অপূরণীয় হয়ে যেতে পারে।

মুরাবাহার এই সমস্যার সমাধান এইরূপে করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, গ্রাহক (Client) একটি চুক্তির উপর স্বাক্ষর করবে, যার আলােকে সে এই অঙ্গীকার করবে যে, অর্থায়নকারী যখন সেই পণ্য সংগ্রহ করবে, তখন সে তা ক্রয় করবে। দু’তরফা হিসেবে ভবিষ্যতের সাথে সংশ্লিষ্ট বিক্রির (Forward Sale) পরিবর্তে গ্রাহকের পক্ষ থেকে একতরফা ক্রয়ের অঙ্গীকার হবে, যা পালন করার দায়িত্ব গ্রাহকের উপর, অর্থায়নকারীর নয়। এই পদ্ধতি ফরওয়ার্ড সেল থেকে ভিন্ন।

এই সমাধানের উপর আরেকটি প্রশ্ন করা হয় যে, একতরফা অঙ্গীকারের দ্বারা গ্রাহকের উপর শুধুমাত্র চারিত্রিক দায়িত্ব অর্পিত হয়, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করানাে যায় না। এর থেকে আমরা আরেকটি প্রশ্নের দিকে ধাবিত হচ্ছি যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে একতরফা অঙ্গীকার বিচারের দৃষ্টিতেও অপরিহার্য কি না। সাধারণত মনে করা হয় যে, এটা বিচারের দৃষ্টিতে অপরিহার্য নয়। কিন্তু এ কথাকে বিনাবাক্যব্যয়ে গ্রহণ করার পূর্বে আমরা শরীয়তের মূল উৎসের আলােকে তার পর্যালােচনা করে দেখব।

ইসলামী ফিকহের গ্রন্থাবলীর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে গভীর অনুসন্ধান করার দ্বারা এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, এই মাসআলায় ফিহবিদদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে। নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে তা উল্লেখ করা হচ্ছে।

(১) অধিকাংশ ফিকহবিদদের মত হল, অঙ্গীকার পূরণ করা একটি উত্তম চরিত্র এবং অঙ্গীকারকারীর তা পূরণ করা উচিত। তা পূরণ না করা ভৎসনা ও তিরস্কার উপযােগী কাজ। কিন্তু তা পূরণ করা অপরিহার্য ও আবশ্যকীয় নয় এবং আদালতের মাধ্যমেও পূরণ করানাে যাবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি বর্ণনা করা হয়েছে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ এবং কোন কোন মালেকী ফিকহবিদদের থেকে। তবে সামনে বর্ণনা করা হবে যে, অধিকাংশ হানাফী ও মালেকী ফিক্হবিদ এবং কোন কোন শাফেয়ী ফিকহবিদগণ এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে একমত পােষণ করেন ।

(২) অধিকাংশ ফিকহবিদদের মত এই যে, অঙ্গীকার পূরণ করা ওয়াজিব এবং অঙ্গীকারকারীর চারিত্রিক দায়িত্বের সাথে সাথে আইনগত দায়িত্বও হল অঙ্গীকার পূরণ করা। তাদের মাযহাব অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমেও অঙ্গীকার পূরণ করানাে যাবে। এই মাযহাবটি প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত সামুরা ইব্‌ন জুনদুব, উমার ইব্‌ন আব্দিল আজীজ, হাসান বসরী, সায়ীদ ইবনুল আশওয়া, ইসহাক ইবন রাহওয়ায় এবং ইমাম বুখারী (রহ.) থেকে বর্ণিত। কোন কোন মালেকী ফিকহবিদদের মাযহাবও এটাই। ইবনুল আরাবী এবং ইবনুশশাত (রহ.) ও এটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রসিদ্ধ শাফেয়ী ফিকহবিদ ইমাম গাযালী (রহ.) ও এর সমর্থন করেছেন।

ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন, অঙ্গীকার যদি পরিপকৃভাবে করা হয়, তাহলে তা পূরণ করা ওয়াজিব। ইন শুরুমা (রহ.)-এর অভিমতও এটাই।

কোন কোন মালেকী ফিকহবিদ তৃতীয় আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গী পেশ করেছেন। তারা বলেন যে, সাধারণ অবস্থায়তাে অঙ্গীকার পূরণ করা (বিচারের দৃষ্টিতে) ওয়াজিব নয়। যদি অঙ্গীকারকারীর অঙ্গীকারের কারণে দ্বিতীয় ব্যাক্তির কোনরূপ ব্যয় বহন করতে হয় কিংবা সেই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে কোন দায়িত্ব গ্রহণ করে নেয়, তাহলে এধরনের অঙ্গীকার পূরণ করা অপরিহার্য, যা পূরণের জন্য আদালতের মাধ্যমেও চাপ সৃষ্টি করা যাবে।।

আরো পড়তে পারেন:  ইসলামী ব্যাংক এর কার্যাবলী

সমকালীন কোন কোন আলিমের দাবি এই যে, যে সব ফিকহবিদ অঙ্গীকার পূরণ করা ওয়াজিব হওয়াকে সমর্থন করেছেন তা এক তরফা দান কিংবা অন্য কোন জিনিস স্বেচ্ছায় পরিশােধের ব্যাপারে। দু’তরফা ব্যবসায়িক কিংবা আর্থিক চুক্তির অঙ্গীকার সম্পর্কে ঐসব ফিকহবিদ এই ওয়াজিব হওয়াকে সমর্থন করেননি। কিন্তু গভীরভাবে অধ্যয়নের পর এই দৃষ্টিভঙ্গী সঠিক বলে মনে হয় না। কেননা, হানাফী এবং মালেকী ফিকহবিদগণ অঙ্গীকার ওয়াজিব হওয়ার ভিত্তিতে বাইউল ওয়াফা’কে বৈধ বলে সাব্যস্ত করেছেন। “বাইউল ওয়াফা” ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিশেষ প্রকার। যার মাধ্যমে কোন স্থাবর সম্পদের ক্রেতা এই অঙ্গীকার করে যে, বিক্রেতা যখন তাকে ঐ সম্পদের মূল্য ফেরত দিয়ে দিবে, তখন সে উক্ত সম্পদকে পুনরায় বিক্রি করে দিবে। বাইউল ওয়াফা বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে প্রথম অধ্যায়ের ক্ষীয়মান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে হাউজ ফিন্যান্সিং-এর ধারণা প্রসঙ্গে আলােচনা করতে গিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। সে আলােচনার সারাংশ এই যে, পুনর্বার ক্রয়কে যদি প্রথম বিক্রির জন্য শর্ত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে এই ক্রয়-বিশুদ্ধ হবে না। যদি উভয়পক্ষ প্রথম ক্রয়-বিক্রয়কে নিঃশর্তে করে থাকে, কিন্তু বিক্রেতা আলাদা এবং পৃথকভাবে উক্ত বিক্রিত সম্পদকে পুনর্বার ক্রয় করার অঙ্গীকারের উপর স্বাক্ষর করে থাকে, তাহলে অঙ্গীকারকারীর উপর এই অঙ্গীকার পূরণ করা অপরিহার্য হয়ে যাবে এবং আদালতের মাধ্যমেও তা বাস্তবায়ন করানাে যাবে। এ ক্ষেত্রে অঙ্গীকার পূরণের অপরিহার্যতাকে হানাফী এবং মালেকী উভয় ফিকহবিদগন সমর্থন করেছেন।

এ কথা সুস্পষ্ট যে, এই অঙ্গীকারের সম্পর্ক দানের সাথে নয়। এটা ভবিষ্যতে বিক্রি করার একটি অঙ্গীকার। এতদসত্ত্বেও হানাফী এবং মালেকী ফিকহবিদগণ তাকে ওয়াজিব এবং আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথা বলেছেন। এ কথা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, যে সব ফিকহবিদ অঙ্গীকারকে ওয়াজিব বলেন, তারা দান ইত্যাদির অঙ্গীকারের সাথে এই হুকুমকে বিশিষ্ট করেন না। বরং তাদের নিকট এই উসূল ভবিষ্যতের দু’তরফা চুক্তির অঙ্গীকারের উপরও প্রযােজ্য হবে। বস্তুত কুরআন এবং হাদীস অঙ্গীকার পূরণ করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “এবং অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে (কিয়ামতের দিবসে) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সূরা বনী ইসরাঈল ও আয়াত নং-৩৪)

“হে মুমিনগণ! তােমরা যা কর না তা কেন বল? তােমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট খুবই অসন্তোষজনক।” (সূরা আসসাফ আয়াত নং-২ ও ৩)

ইমাম আবু বাকর জাসাস (রহ.) বলেন, কুরআনে কারীমের এই আয়াত বর্ণনা করে যে, যদি কোন ব্যক্তি কোন কাজ করার দায়িত্ব গ্রহণ করে নেয়, চাই তা ইবাদাতে হােক কিংবা লেনদেনে হােক, তা পূর্ণ করা অপরিহার্য হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- “মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি, যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করে, যখন তার নিকট কোন আমানত রাখা হয় তাতে খিয়ানত করে।”

এটা তাে শুধুমাত্র একটি উদাহরণ। নতুবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসসমূহের এক বিরাট সংখ্যক হাদীস এমন রয়েছে, যেগুলাের মধ্যে অঙ্গীকার পূরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং যুক্তিসঙ্গত কোন ওজর ব্যতীত অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

এসব উদ্ধৃতি দ্বারা এতটুকু পরিষ্কার প্রতিভাত হয়েছে যে, অঙ্গীকার পূরণ করা ওয়াজিব। তবে প্রশ্ন হল আদালতের মাধ্যমেও তা পূরণ করানাে যাবে কি না, তা অঙ্গীকারের ধরণের উপর নির্ভরশীল। বাস্তবিক পক্ষে কিছু অঙ্গীকার এমন ধরনের হয়ে থাকে, যা আদালতের মাধ্যমে পূরণ করানাে যায় না। যেমন বাগদানের সময় উভয়পক্ষ বিবাহ-শাদীর অঙ্গীকার করে থাকে, এই অঙ্গীকার দ্বারা একটি চারিত্রিক দায়িত্ব অর্পিত হয়ে যায়, কিন্তু একথা সুস্পষ্ট যে, এই অঙ্গীকার আদালতের মাধ্যমে পূরণ করানাে যায় না। কিন্তু ব্যবসায়িক লেনদেনে যদি কোন পার্টি থেকে কোন জিনিস বিক্রি বা ক্রয় করার অঙ্গীকার করা হয় এবং সে ব্যক্তি এর ভিত্তিতে কিছু দায়দায়িত্বও গ্রহণ করে নেয়, তাহলে এখানে সেই অঙ্গীকারকে আদালতের মাধ্যমে পূরণ না করানাের কোন যুক্তি সঙ্গত কারণ নেই। সুতরাং ইসলামের সুস্পষ্ট শিক্ষার আলােকে উভয় পক্ষ যদি এ কথার উপর একমত পােষণ করে যে, এই অঙ্গীকার অঙ্গীকারকারীর উপর অপরিহার্য হবে, তাহলে বিচারের দৃষ্টিতেও অপরিহার্য হওয়া উচিত। এই মাসআলার  সম্পর্ক শুধুমাত্র মুরাবাহার সাথে নয়। ব্যবসায়িক লেনদেনে যদি অঙ্গীকারকে বিচারের দৃষ্টিতে অপরিহার্য না করা হয়, তাহলে এর দ্বারা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক ক্ষতি সাধন হতে পারে। এক ব্যক্তি কোন ব্যবসায়ীকে অর্ডার দিচ্ছে যে, আমার জন্য অমুক জিনিস সংগ্রহ করুন এবং এই অঙ্গীকার করে যে, আমি আপনার নিকট থেকে তা ক্রয় করে নিব। ব্যবসায়ী এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে অনেক ব্যয়ভার বহন করে সে জিনিস বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে আনে, এখন অঙ্গীকারকারীকে উক্ত জিনিস ক্রয়ে অস্বীকার করার অনুমতি কিভাবে দেয়া যেতে পারে। কুরআন এবং হাদীসে এমন কোন বিধান নেই, যা এধরনের অঙ্গীকারকে অপরিহার্য সাব্যস্ত করার ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হবে।।

এসব কারণের ভিত্তিতে “মুজাম্মাউল ফিকহিল ইসলামী জিদ্দাহ” ব্যবসায়িক লেনদেনে অঙ্গীকারকে নিম্ন বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে অপরিহার্য বলে সাব্যস্ত করেছেন।

(১) এই অঙ্গীকার একতরফা হতে হবে।

(২) এই অঙ্গীকারের কারণে অপর ব্যক্তি (যার সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছে) কোন দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করে নিয়েছে।

(৩) অঙ্গীকার যদি কোন জিনিস ক্রয়-বিক্রয়ের হয়ে থাকে, তাহলে এটা জরুরী যে, নির্ধারিত সময়ে ইজাব-কবুলের মাধ্যমে কার্যত ক্রয় – বিক্রয়ে করতে হবে, শুধুমাত্র অঙ্গীকারকে ক্রয়-বিক্রয়ে মনে করা যাবে না।

(৪) যদি অঙ্গীকারকারী তার অঙ্গীকার পূরণ না করে, তাহলে আদালতের মাধ্যমে তাকে বাধ্য করা হবে যে, হয়ত উক্ত জিনিস ক্রয় করে স্বীয় অঙ্গীকার পূরণ করবে অথবা বিক্রেতার প্রকৃত ক্ষতিপূরণ আদায় করবে। এই ক্ষতিপূরণে বাস্তবিক পক্ষে প্রকৃত মূলধনের যতটুকু লােকসান হয়েছে, শুধুমাত্র ততটুকু অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রত্যাশিত এবং সম্ভাব্য (Opportunity) মুনাফাকে (অন্যত্র বিনিয়ােগের সূযােগ থাকা সত্ত্বেও  বিনিয়ােগ না করার কারণে যে সম্ভাব্য মুনাফা অর্জনের সূযােগ হারানাে হয়) তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।

সঞ্চয়

এ জন্য গ্রাহকের অর্থায়নকারীর সাথে এই অঙ্গীকার করা জায়েয আছে যে, যখন অর্থায়নকারী সাপ্লাইকারী থেকে মাল সংগ্রহ করে নিবে তখন সে তা ক্রয় করে নিবে। এই অঙ্গীকার পূরণ করা তার উপর অপরিহার্য হবে এবং উপরােল্লেখিত পদ্ধতিতে আদালতের মাধ্যমেও তা পূরণ করানাে যাবে। এটা শুধুমাত্র ক্রয়-বিক্রয়ের অঙ্গীকার হবে, তাকে প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় মনে করা হবে না। প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় তখন হবে যখন অর্থায়নকারী সংশ্লিষ্ট মাল সংগ্রহ করবে, যার জন্য ইজাব-কবুল জরুরী হবে।

(৪) মুরাবাহার মূল্যের বিপরীতে সিকিউরিটি 

মুরাবাহা পদ্ধতিতে অর্থায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি আলােচনা এই যে, মুরাবাহার মূল্য পরবর্তীতে পরিশােধ করা হয়, এ জন্য স্বাভাবিক কথা হল বিক্রেতা (অর্থায়নকারী) সময়মত মূল্য পরিশােধ করার নিশ্চয়তা চাইবে। এই উদ্দেশ্যের জন্য সে তার গ্রাহক থেকে সিকিউরিটির দাবি করতে পারে। এই সিকিউরিটি বন্ধক কিংবা অন্য কোন পন্থায় সম্পদ আটকে রাখার অধিকার ইত্যাদির আকৃতিতে হতে পারে। এই সিকিউরিটি সম্পর্কে কয়েকটি মৌলিক বিধি-বিধান মনে রাখা জরুরী।

(১) সিকিউরিটি শুধুমাত্র ঐ ক্ষেত্রে দাবি করতে পারবে, যখন চুক্তির কারণে কোন ঋণ কিংবা দায়িত্ব অস্তিত্বে এসে যাবে। এমন ব্যক্তি থেকে কোন সিকিউরিটি দাবি করতে পারবে না, যার উপর এখন পর্যন্ত কোন ঋণ নেই কিংবা সে কোন দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। যেমন পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মুরাবাহা পদ্ধতিতে অর্থায়ন বিভিন্ন চুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। যা বিভিন্ন ধাপে অস্তিত্বে আসে। প্রথম ধাপে গ্রাহকের উপর কোন ঋণ আসে না। ঋণ শুধুমাত্র ঐ সময় আসে যখন অর্থায়নকারী সংশ্লিষ্ট জিনিস তার কাছে বাকি মূল্যে বিক্রি করে। যার ফলে উভয়ের মাঝে ঋণদাতা এবং ঋণগ্রহীতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়। এজন্য মুরাবাহা চুক্তির সঠিক পদ্ধতি এই যে, অর্থায়নকারী তার গ্রাহক থেকে সিকিউরিটির দাবি তখন করতে পারবে যখন কার্যত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সংঘটিত হবে এবং মূল্য পরিশােধ করা গ্রাহকের উপর ওয়াজিব হয়ে যাবে । কেননা এই ধাপে গ্রাহক ঋণগ্রহীতা হয়ে যায়। কিন্তু গ্রাহকের জন্য এই ধাপের পূর্বেই সিকিউরিটি প্রদান করা বৈধ। তবে এটা ঐ সময় হওয়া উচিত, যখন মুরাবাহার মূল্য নির্ধারিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে অর্থায়নকারী যদি সেই সিকিউরিটি অধিকার করে নেয়, তাহলে সিকিউরিটির জিনিস তার দায়ভারে (Risk) থাকবে। যার অর্থ এটা হবে যে, বন্ধকীর সম্পদ যদি কার্যত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে অর্থায়নকারী হয়ত গ্রাহককে বন্ধকী সম্পদের বাজারমূল্য পরিশােধ করবে এবং মুরাবাহা চুক্তি বাতিল করে দিবে। অথবা কাংক্ষিত জিনিস গ্রাহকের নিকট বিক্রি করবে কিন্তু তার মূল্য থেকে বন্ধকী সম্পদের বাজার মূল্যের সমপরিমাণ কমিয়ে দিবে।

(২) বিক্রিত জিনিসই বিক্রেতাকে গ্যারান্টি (সিকিউরিটি) হিসেবে দিয়ে দেওয়াও বৈধ আছে। কোন কোন আলিমের মতামত এই যে, এমনটি করা শুধুমাত্র ঐ সময় জায়েয হবে যখন ক্রেতা একবার সেই ক্রয়কৃত জিনিস কজা করে নিবে। যার অর্থ এই যে, ক্রেতা প্রথমে সেই জিনিস প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ কজা করবে, অতঃপর সে বিক্রেতাকে বন্ধক হিসেবে প্রদান করবে। যাতে করে বন্ধকীর চুক্তি ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিষয় অধ্যয়নের পর একথা বলা যেতে পারে যে, পূর্ববর্তী ফিকহবিদগণ প্রথমে কজা করে অতঃপর বন্ধক হিসেবে দেওয়ার শর্ত নগদ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আরােপ করেছেন বাকি বিক্রির ক্ষেত্রে নয়। সুতরাং ক্রয়কৃত জিনিস বন্ধক হিসেবে প্রদানের পূর্বে গ্রাহকের প্রথমে তাতে নিজের কজা করা জরুরী নয়। তবে শর্ত হল, এ কথা নির্দিষ্ট করে নিতে হবে যে, এই পণ্য কখন থেকে বন্ধকী হিসেবে ধর্তব্য হবে। কেননা, এই বিশেষ নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকেই এই পণ্য বিক্রেতার কজায় বন্ধকী হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। এজন্য এ সময়টি সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ পহেলা জানুয়ারী “ক” “খ” এর নিকট একটি গাড়ি পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করল, মূল্য পরিশােধ করা হবে ত্রিশে জুন, মূল্য সময়মত পরিশােধকল্পে “ক” “খ” এর কাছ থেকে সিকিউরিটি দাবি করল, “খ” এখনাে গাড়িটি কজা করেনি, সে “ক” এর নিকট প্রস্তাব করল যে, ২রা জানুয়ারী থেকে সেই গাড়িটিই যেন তার কাছে বন্ধক হিসেবে রেখে দেয়। যদি এই গাড়িটি ২রা জানুয়ারীর পূর্বে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে এবং “খ”-এর কোন রকম ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব বহন করতে হবে না। কিন্তু গাড়িটি যদি ২রা জানুয়ারীর পরে ধ্বংস হয়, তাহলে ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি বাতিল হবে। তবে এখানে বন্ধকী সম্পদ ধ্বংস হওয়ার ক্ষেত্রে যে মূলনীতি নির্ধারিত আছে তা প্রযােজ্য হবে। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী সেই পণ্যের বাজারদর এবং উভয়ের মাঝে সাব্যস্তকৃত মূল্যের মাঝে যেটা কম হবে বিক্রেতা ততটুকু পরিমাণ গাড়ির ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব বহন করবে। সুতরাং যদি গাড়ির বাজারমূল্য সাড়ে চার লাখ টাকা হয় (পক্ষান্তরে সাব্যস্তকৃত মূল্য পাঁচ লাখ টাকা ছিল) তাহলে বিক্রেতা ক্রেতা থেকে শুধুমাত্র অবশিষ্ট মূল্যের দাবি করতে পারবে। অর্থাৎ পঞ্চাশ হাজার টাকা। (সাড়ে চার লাখ টাকা বিক্রেতার ক্ষতি মনে করা হবে)। আর যদি গাড়ির বাজারমূল্য পাঁচ লাখ টাকা হয় বা তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে বিক্রেতা ক্রেতা থেকে কোন কিছুর দাবি করতে পারবে না।

এটা ছিল ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিভঙ্গী। শাফেয়ী এবং হাম্বলী ফিক্হবিদদের মাযহাব হল গাড়ি যদি বন্ধকগ্রহীতার (যার কাছে বন্ধক রাখা হয়, এখানে বিক্রেতা) উদাসীনতার কারণে ধ্বংস হয়, তাহলে সে তার বাজার মূল্য সমপরিমাণ ক্ষতি পূরণের দায়িত্ব বহন করবে। কিন্তু গাড়ি ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারে তার যদি কোনরূপ হস্তক্ষেপ না থাকে, তাহলে সে কোন কিছুর দায়িত্ব বহন করবে না। এই ক্ষতি ক্রেতা বহন করবে এবং বিক্রেতাকে পূর্ণ মূল্য পরিশােধ করতে হবে।

উপরােল্লেখিত উদাহরণ দ্বারা এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, “ক”এর গাড়িতে বিক্রেতা হিসেবে কজার উপর যে আহকাম প্রযােজ্য হবে তা বন্ধকগ্রহীতা হিসেবে কজার উপর প্রযােজ্য আহকাম থেকে ভিন্ন হবে। এজন্য জরুরী হল, সেই সময়কে উত্তমভাবে নির্ধারণ করে নেয়া যখন থেকে গাড়িটি তার কাছে বন্ধকগ্রহীতা হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। অন্যথায় বিভিন্ন দিক তালগােল পাঠিয়ে যাবে এবং কলহ-কোন্দল সৃষ্টিরও সম্ভাবনা থাকবে, যার ফলে এই সিকিউরিটি সঠিক থাকবে না।

(৫) মুরাবাহায় জামানত

মুরাবাহা পদ্ধতির অর্থায়নে বিক্রেতা ক্রেতার (গ্রাহক) কাছে তৃতীয় কোন পার্টিকে জামিন হিসেবে প্রদানের দাবিও করতে পারবে। ক্রেতা যদি সময়মত মূল্য পরিশােধ না করে, তাহলে বিক্রেতা জামিনদার ব্যক্তির নিকট মূল্য পরিশােধের দাবি করবে। যার দায়িত্ব হবে ঐ অর্থ পরিশােধ করে দেওয়া, যার সে জামিনদার হয়েছে। জামানতের শরয়ী আহকামের উপর ফিহের গ্রন্থাবলীতে বিস্তারিত আলােচনা করা হয়েছে। তদুপরি

আমি ইসলামী ব্যাংকিং-এর সাথে সম্পৃক্ত দু’টি মাসআলার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করাতে চাই ।

বর্তমান ব্যবসায়িক পরিবেশে জামিনদার ব্যক্তি সাধারণত আসল ঋণগ্রহীতা থেকে ফিস নেয়া ব্যতীত কোনদায় পরিশােধের জামানত প্রদান করে না। পূর্ববর্তী ফকীহগণ এব্যাপারে প্রায় একমত যে, জামানত একটি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব গ্রহণের চুক্তি। যার উপর কোন ফিস নেয়া যায় না। বেশির চেয়ে বেশি জামিন ব্যক্তি ঐ সকল প্রকৃত অফিসিয়াল ব্যয়ের দাবি করতে পারে। যা তাকে জামানত প্রদানের কাজে বহন করতে হয়েছে। ফিস নাজায়েয হওয়ার কারণ হল, যে ব্যক্তি কাউকে ঋণ প্রদান করেছে, সে ব্যক্তি ঋণের বিনিময়ে কোন ফিস গ্রহণ করতে পারে না। কেননা, এই ফিস রিবা এবং সুদের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। যা নিষিদ্ধ এবং নাজায়েয। জামানত প্রদানকারী এই নিষিদ্ধতায় আরাে উত্তমভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা, সে তাে ঋণ হিসেবে অর্থ প্রদান করে না, বরং সে তাে আসল ঋণগ্রহীতার পক্ষ থেকে সময়মত ঋণ পরিশােধ না হওয়ার ক্ষেত্রে তার স্থলে নির্দিষ্ট অর্থ আদায় করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। যদি প্রকৃত অর্থ প্রদানকারী কোন ফিস উসূল করতে না পারে, তাহলে যে ব্যক্তি শুধুমাত্র পরিশােধের অঙ্গীকার করে, কার্যত কোন কিছু আদায় করে না, সে ব্যক্তি কিভাবে ফিস গ্রহণ করতে পারে।

মনে করুন- যায়েদ আমর থেকে একশ’ ডলার ঋণ গ্রহণ করেছে। আমর যায়েদ থেকে জামিন প্রদানের দাবি করছে, বকর যায়েদকে বলল, আমি তােমার ঋণ আমরকে এখনি আদায় করে দিচ্ছি, কিন্তু তুমি পরবর্তী কোন তারিখে আমাকে একশ’ দশ ডলার আদায় করবে এটা সুস্পষ্ট যে, যায়েদ থেকে অতিরিক্ত যে দশ ডলার নেয়া হচ্ছে, তা সুদ হওয়ার কারণে নাজায়েয। এখন খালেদ যায়েদের কাছে এসে বলল, আমি তােমার পক্ষ থেকে জামিন হচ্ছি, কিন্তু তুমি আমাকে এই কাজের জন্য দশ ডলার দিবে। আমরা যদি জামানতের ফিসকে জায়েয় বলি, তাহলে এর অর্থ হবে, বকর বাস্তবিক পক্ষে এত অর্থ আদায় করা সত্ত্বেও দশ ডলার নিতে পারে না, কিন্তু খালেদ বাস্তবিক পক্ষে কোন কিছু আদায় করেনি, কেবল যায়েদের সময়মত অনাদায়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আদায়ের অঙ্গীকার করেছে, সে দশ ডলার নিতে পারে। যেহেতু এই পদ্ধতি বাহ্যিকভাবে ন্যায় সঙ্গত নয়, এজন্য পূর্ববর্তী ফকীহগণ জামানতের উপর ফিস গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করেছেন, যাতে করে উল্লেখিত উদাহরণে বকর এবং খালেদের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করা যায়।

তবে সমকালীন কোন কোন ফকীহগ মাসআলাটিকে কিছুটা ভিন্ন। দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাদের মত হল, বর্তমানে জামানত একটি প্রয়ােজনীয় বিষয়ে পরিণত হয়ে গিয়েছে। বিশেষত আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে। যেখানে বিক্রেতা এবং ক্রেতার মাঝে একে অপরের সাথে কোন পরিচিতি থাকে না এবং মাল পাওয়ার সাথে সাথেই ক্রেতার পক্ষ থেকে মূল্য পরিশােধও সম্ভব হয় না। এজন্য এমন একটি মাধ্যমের প্রয়ােজন হয়, যিনি মূল্য পরিশােধের জামানত প্রদান করবে। কোন বিনিময় ব্যতীত কাংক্ষিত সংখ্যক জামানত প্রদানকারী পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। এসব বাস্ত বতার প্রতি লক্ষ্য রেখে বর্তমান যুগের কোন কোন আলিম ভিন্ন একটি চিন্ত -চিন্তার কথা বলেন। তারা বলেন যে, জামানতের উপর ফিস/ নেওয়ার নিষিদ্ধ কুরআন এবং হাদীসের সুস্পষ্ট কোন হিদায়াতের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং এটা সুদের নিষিদ্ধতার হুকুম থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। কেননা এটা তার একটি আনুষঙ্গিক বিষয়। অধিকন্তু অতীতকালে জামানত সাধাসিধা ধরনের হত, বর্তমান যুগে জামিন ব্যক্তির অনেক অফিসিয়াল কাজ আঞ্জাম দিতে হয় এবং বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করতে হয়। এজন্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হল, জামানতের উপর ফিসের নিষিদ্ধতার ব্যাপারেও এই দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বার গবেষণা করা প্রয়ােজন। এ সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে আরে গবেষনার প্রয়ােজন এবং এ বিষয়টিকে উচ্চ পর্যায়ের অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের আন্তর্জাতিক ফোরামে গবেষণার জন্য উত্থাপন করা উচিত। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত এ ধরনের কোন ফোরাম থেকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসবে, ততদিন পর্যন্ত ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জামানতের বিনিময়ে কিছু ফিস দেয়া উচিত কিন্তু নেয়া উচিত নয়। তবে জামানত প্রদানের কাজে বাস্তবিক পক্ষে যে ব্যয় হয়, তা পূরণের জন্য বিনিময় দেয়াও যাবে এবং নেয়াও যাবে।

(৬) অনাদায়ের কারণে জরিমানা

মুরাবাহা পদ্ধতির অর্থায়নে আরেকটি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। তাহল গ্রাহক যদি মূল্য সময়মত পরিশােধ না করে, তাহলে মূল্যে অতিরিক্ত কিছু সংযােজন করা যায় না। সুদভিত্তিক ঋণে অনাদায়ের সময় অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু মুরাবাহা পদ্ধতির অর্থায়নে মূল্য একবার নির্ধারণের পর তাতে আর অতিরিক্ত কিছু সংযােজন করা যায় না। যে সকল বদদ্বীন গ্রাহক জেনে শুনে সময়মত মূল্য পরিশােধ করা থেকে অনীহা প্রকাশ করে তারা এই পাবন্দীকে কোন কোন সময় অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে। কেননা তারা জানে যে, সময়মত মূল্য পরিশােধ না করার কারণে তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে না।

মুরাবাহার এই বৈশিষ্ট্যের কারণে সেসব দেশে তেমন কোন জটিলতা সষ্টি করতে পারবে না, যেসব দেশের সকল ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কেননা এ ক্ষেত্রে প্রশাসন  এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবে, যে নীতিমালা অনুযায়ী সময়মত মূল্য পরিশােধ না করার কারণে তাদেরকে এই শাস্তি দেয়া যাবে যে, সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানই যে কোন ধরনের সুযােগ-সুবিধা প্রদান করা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করে দিবে। এই নীতিমালা স্বেচ্ছায় সময়মত মূল্য পরিশােধ না করার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু যেসব দেশে ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুদভিত্তিক অধিকাংশ ব্যবসায়িকও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক হয়ে কাজ করছে, সেখানে এমন নীতিমালা কার্যকর করা জটিল হয়ে দাঁড়াবে। কেননা, গ্রাহককে যদি কোন ইসলামী ব্যাংক থেকে কোন ধরনের সুযােগ সুবিধা প্রদান করা থেকে বঞ্চিত করেও দেয়া হয়, তাহলে সে প্রচলিত ব্যাংকসমূহের শরণাপন্ন হবে।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য বর্তমান যুগের কোন কোন আলিম এই প্রস্তাব পেশ করেন, যে গ্রাহক জেনে শুনে স্বেচ্ছায় মূল্য পরিশােধে বিলম্ব করে তাকে এ ব্যাপারে বাধ্য করা হবে যে, তার মূল্য পরিশােধ না করার কারণে ইসলামী ব্যাংকের যে পরিমাণ লােকসান হবে তার বিনিময় আদায় করতে হবে। এসব আলিমগণ মনে করেন যে, এই বিনিময় সেই মুনাফার সমপরিমাণও হতে পারে যা এই সময়ে ব্যাংক তার আমানতকারীগণকে প্রদান করেছে। যেমন ঋণ খেলাফী ব্যাক্তি নির্ধারিত সময় থেকে তিন মাস বিলম্ব করে মূল্য পরিশােধ করেছে, এই তিন মাসে ব্যাংক যদি তার আমানতকারীদের পাঁচ পার্সেন্ট হিসেবে মুনাফা প্রদান করে থাকে, তাহলে এই ঋণ খেলাফী ব্যক্তিও মূল ঋণের অতিরিক্ত পাঁচ পার্সেন্ট ব্যাংকের লােকসান হিসেবে বিনিময় প্রদান করতে হবে। তবে যেসব আলিম এই বিনিময়কে জায়েয বলেন, তাঁরা তাকে নিম্নবর্ণিত শর্তসাপেক্ষে জায়েয বলেন-

(১) পরিশােধের সময় আসার পর ঋণ খেলাফীকে কমপক্ষে অতিরিক্ত আরাে এক মাসের সুযােগ প্রদান করতে হবে। যার মাঝে তার কাছে প্রতি সপ্তাহে নােটিশ পাঠাতে হবে, যে নােটিশে তাকে এই হুশিয়ারি দেয়া হবে, সে যেন মূল্য পরিশােধ করে অন্যথায় তাকে লােকসানের বিনিময় পরিশােধ করতে হবে।

(২) নিঃসন্দেহে মূল্য পরিশােধে বিলম্ব এবং টালবাহানা যুক্তিসঙ্গত কোন ওজর-আপত্তি ব্যতীত করতে হবে। যদি একথা স্পষ্ট হয় যে, সে ব্যক্তি দারিদ্রতার কারণে বিলম্ব করছে, তাহলে তার কাছ থেকে কোন বিনিময় নেয়া যাবে না। বস্তুত যতদিন পর্যন্ত সে পরিশােধে সক্ষম না হবে, ততদিন পর্যন্ত তাকে সুযােগ প্রদান করা জরুরী। কেননা, কুরআনে কারীম সুস্পষ্টভাবে ইরশাদ করছে ।

“সে (ঋণী ব্যক্তি) যদি একান্ত অভাবী হয়, তাহলে তাকে স্বাচ্ছন্দ ফিরে পাওয়া পর্যন্ত অবকাশ দিতে হবে” (সূরা বাকারা, আয়াত নং-২৮০)

(৩) এই আর্থিক ক্ষতিপূরন শুধুমাত্র সে সময় জায়েয, যখন ইসলামী ব্যাংকের পুঁজি বিনিয়ােগ একাউন্টে কিছু মুনাফা অর্জিত হবে, যা আমানতকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। যদি পুঁজি বিনিয়ােগ একাউন্টে এ সময়ে কোন মুনাফা অর্জিত না হয়, তাহলে গ্রাহক থেকেও কোন রকম বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে না।’

বর্তমান যুগের অধিকাংশ আলিম বিনিময়ের এই পদ্ধতিকে সমর্থন করেননি। (লেখকের মতামতও তাই) তাদের চিন্তা-চেতনা হল, এই প্রস্ত বি শরীয়তের নীতিমালার সাথেও সামঞ্জস্যতা রাখে না এবং ঋণখেলাফীর সমস্যাকেও সমাধান করার যােগ্যতা রাখে না।

সর্ব প্রথম কথা হল, ঋণগ্রহীতা থেকে অতিরিক্ত যে কোন অর্থ নেয়া হবে তা সুদ হবে। জাহেলী যুগে ঋণগ্রহীতা যখন নির্দিষ্ট তারিখে ঋণ পরিশােধে ব্যর্থ হত, তখন ঋণদাতা তার থেকে সাধারণত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করত। এ ক্ষেত্রে সাধারণত এরূপ বলা হত

“হয়ত এখনি ঋণ পরিশােধ করতে হবে, অন্যথায় ঋণে সংযােজন করা হবে।” বিনিময় আদায়ের উল্লেখিত প্রস্তাব এই দৃষ্টিভঙ্গীরই সাদৃশ্য।

এ প্রসংগে একথা বলা যেতে পারে যে, উল্লেখিত প্রস্তাব জাহেলী যুগের ঐ নিয়ম-নীতি থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। কেননা, ক্ষতিপূরন গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ঋণগ্রহীতাকে অতিরিক্ত এক মাসের সুযােগ প্রদান করা হয়। যাতে করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সে কোন যুক্তিসঙ্গত ওজর ব্যতীত পরিশােধে অনীহা প্রকাশ করছে এবং যাতে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, পরিশােধ না করার কারণ দারিদ্রতা অথবা অন্য কোন জটিলতা, সেক্ষেত্রে তার থেকে ক্ষতিপূরন গ্রহণ করবে না। কিন্তু এই ধারণাকে কার্যকর করার সময় সেসব শর্ত পূর্ণ করা অত্যন্ত জটিল ব্যাপার। কেননা সকল ঋণগ্রহীতাই এই দাবি করবে যে, তার পক্ষ থেকে সময়মত পরিশােধ না করার কারণ তার আর্থিক অক্ষমতা। কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রত্যেক গ্রাহকের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করা এবং এ কথার সত্যায়ন করা যে, পরিশােধ করার ব্যাপারে সে অক্ষম কি না, তা অত্যন্ত জটিল ব্যাপার। সাধারণত ব্যাংক এটাই মনে করে যে, প্রত্যেক গ্রাহকই পরিশােধে সক্ষম। কিন্তু তাকে যদি দেউলিয়া ঘােষণা করে দেয়া হয়, (তাহলে তাকে অক্ষম মনে করা হবে) যার অর্থ হল, উল্লেখিতি প্রস্তাবে যে সুযােগ এবং অবকাশ দেয়া হয়েছে, তার থেকে শুধুমাত্র দেউলিয়া লােকেরাই উপকৃত হবে এটা সুস্পষ্ট যে, দেউলিয়ার বিদ্যমানতা অত্যন্ত বিরল এবং দুর্লভ। এমন বিরল ঘটনায় সাধারণ সুদি ব্যাংকও ঋণগ্রহীতা থেকে সুদ গ্রহণ করে না। এ কারণে এই প্রস্তাব অনুযায়ী সুদী অর্থায়ন এবং ইসলামী অর্থায়নের মাঝে কোন প্রায়ােগিক এবং উদ্দেশ্যগত পার্থক্য  বিদ্যমান থাকে না।

অতিরিক্ত সময়ের যে বিষয়টি তা তাে সাধারণ সুযােগ, যা কোন কোন সময় আধুনিক ব্যাংক-এর পক্ষ থেকেও দেয়া হয়। পুনরায় একই কথা যে, সুদ এবং বিলম্বে পরিশােধের উপর আর্থিক ক্ষতিপূরন গ্রহণ করার মাঝে বাস্তবিক পক্ষে কোন পার্থক্য নেই।

ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করার ব্যাপারে কোন কোন সময় এই যুক্তি প্রদান করা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তির ভৎসনা করেছেন, যে ব্যক্তি কোন ওজর ব্যতীত আর্থিক দায়িত্ব পরিশােধে বিলম্ব করে। একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন ?

“আর্থিকভাবে স্বচ্ছল যে ব্যক্তি তার ঋণ পরিশােধে টালবাহানা করে, সে শান্তি এবং ভৎসনা পাওয়ার উপযুক্ত হয়।”

এর দ্বারা এভাবে প্রমান পেশ করা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন এবং শাস্তি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যার মধ্যে আর্থিক জরিমানাও অন্ত ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু এ প্রমাণ পেশ করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়েছে যে, যদি এ কথা মেনেও নেয়া হয় আর্থিক জরিমানা আরােপ করা জায়েয, তারপরও তা আদালতের মাধ্যমে আরােপ করা হয় এবং সাধারণত প্রশাসনের নিকট তা পরিশােধ করা হয়। এমনটি কারাে নিকটই বৈধ নয় যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষ সমস্যা সমাধানের উপযুক্ত আদালতের কোন সিদ্ধান্ত ব্যতীত নিজেই নিজের স্বার্থের জন্য জরিমানা আরােপ করে দিবে।

আরো পড়তে পারেন:  মুদারাবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

অধিকন্তু এটাকে যদি একটি শাস্তিই মেনে নেয়া হয়, তাহলে তা পুঁজি বিনিয়ােগ একাউন্টে কোন মুনাফা না হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়ােগ হওয়া উচিত। কেননা পরিশােধ না করার অপরাধ তাে পাওয়া গিয়েছে এবং এর সাথে ব্যাংকের পুঁজি বিনিয়ােগ একাউন্টে কোন মুনাফা হওয়া বা না হওয়ার সাথে কোন সম্পর্ক নেই।

মূলত ব্যাংকের মুনাফার সমপরিমাণ ক্ষতিপুরণ করা অর্থের (money) প্রত্যাশিত মুনাফার’ (Opportunity cost) ধারণার উপর নির্ভরশীল। এই ধারণা শরীয়তের নীতিমালার সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না। ইসলাম সম্ভাব্য মুনাফার এই ধারণাকে সমর্থন করে না। কেননা অর্থনীতি থেকে সুদের পরিসমাপ্তির পর অর্থের (money) কোন নির্দিষ্ট মুনাফা অবশিষ্ট থাকে না। এতে যেখানে মুনাফা অর্জনের সুযােগ রয়েছে সেখানে লােকসানের। আশংকাও রয়েছে। লােকসানের এই ঝুঁকিই তাকে মুনাফা অর্জনে সক্ষম করে তােলে।

এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, লক্ষণীয় সূক্ষ্ম ও আরেকটি বিষয় হল, যে ব্যক্তি ঋণ খেলাফীর অপরাধে অভিযুক্ত হয়, তাকে বেশির চেয়ে বেশি একজন চোর কিংবা আত্মসাৎকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। চুরি এবং আত্মসাৎকারী সম্পর্কে শরীয়তের বিধি-বিধান অধ্যয়ন করা দ্বারা বুঝা যায় যে, চোর একটি বড় শাস্তি অর্থাৎ হাত কর্তনের উপযুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু তার কাছে কখনাে এই দাবি করা যাবে না, সে যেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোন রকম ক্ষতিপুরণ পরিশােধ করে দেয়। এমনিভাবে কেউ যদি কোন ব্যক্তির অর্থ আত্মসাৎ করে নেয়, তাহলে তাকে তা’যীর হিসেবে শাস্তি তাে দেয়া যাবে, কিন্তু কোন ফকীহ মালিককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের জন্য তার উপর মূল অর্থ থেকে অতিরিক্ত আর্থিক কোন জরিমানা ধার্য করেননি।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মাযহাব হল, যদি কোন ব্যক্তি অন্যের যমিন আত্মসাৎ করে হস্তগত করে নেয়, তাহলে তাকে বাজারমূল্য অনুযায়ী সেই যমিনের ভাড়া প্রদান করতে হবে, কিন্তু সে যদি নগদ অর্থ আত্মসাৎ করে, তাহলে সে ঐ পরিমাণ অর্থই ফেরৎ দিবে, যে পরিমাণ অর্থ সে আত্মসাৎ করেছে, তার চেয়ে অতিরিক্ত নয়।

এসব আহকাম থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, অর্থের (money) প্রত্যাশিত মুনাফা (Opportunity Cost) কে শরীয়ত সমর্থন করেনি। কেননা, পূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, মুদ্রার উপর নির্দিষ্ট মুনাফা নেয়া যায় না এবং তার কোন নিজস্ব ভ্যালুও নেই।

উপরে বর্ণিত কারণসমূহের ভিত্তিতে বর্তমান যুগের অধিকাংশ আলিমগণ ঋণ খেলাফী ব্যক্তি থেকে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করার দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করেননি। ইসলামী ফিক্হ একাডেমী জিদ্দাহ-এর বার্ষিক সেমিনারেও এই প্রশ্নের ব্যাপারে বিস্তারিত আলােচনা-গবেষণা হয়েছে এবং সেখানেও এই সিদ্ধান্তই নেয়া হয়েছে যে, এ ধরণের বিনিময় গ্রহণ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।

এ যাবৎ আর্থিক ক্ষতিপুরণ (জরিমানা) সম্পর্কে শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধতা এবং অবৈধতা নিয়ে আলােচনা করা হয়েছে। এ পর্যায়ে একথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, এই প্রস্তাব দ্বারা ঋণ খেলাফীর সমস্যা একেবারে নিরসন হবে না। বরং এর দ্বারা ঋণগ্রহীতা ঋণ অনাদায়ের প্রতি আরাে উৎসাহিত হবে। তার কারণ হল, এই প্রস্তাব অনুযায়ী ঋণ খেলাফীকে যে পরিমান বিনিময় পরিশােধের জন্য বলা হবে, তা সেই মুনাফার সমতুল্য হবে যা পরিশােধ না করাকালীন সময়ে আমানতকারীদের অর্জিত হয়েছে। আর একথা সুস্পষ্ট যে, আমানতকারীদের অর্জিত মুনাফা ঐ মুনাফার হার থেকে সর্বদা কম হয় যা মুরাবাহার চুক্তিতে গ্রাহককে পরিশােধ করতে হয়। এ কারণে এই গ্রাহক যে পরিমাণ মুনাফা ঋণ খেলাফী হওয়ার পূর্বে দিয়েছিল, ঋণ খেলাফী হওয়ার পর তার চেয়ে অনেক কম দিতে হবে। সুতরাং সে জেনে শুনে এই ক্ষতিপুরন (বিনিময়) আদায় করার প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করবে এবং মূল ঋণ পরিশােধ করবে না। বরং তা কোন অধিক লাভজনক কাজে বিনিয়ােগ করবে। মনে করুন,! ছয় মাসের একটি মুরাবাহা চুক্তিতে বর্ষিক পনের পার্সেন্ট হিসেবে মুনাফা সিদ্ধান্ত হয়েছে, আর আমানতকারীদেরকে যে মুনাফা দেয়া হয়েছে তা হল বার্ষিক দশ পার্সেন্ট। এর অর্থ হল, পরিশােধের তারিখের পরও যদি গ্রাহক অতিরিক্ত ছয় মাসের জন্য এই মূল অর্থ তার কাছে রেখে দেয় এবং আদায় না করে, তাহলে তাকে বার্ষিক দশ পার্সেন্ট হিসেবে বিনিময় প্রদান করতে হবে। যা আসল মুরাবাহার মুনাফার হারের অর্থাৎ পনের পার্সেন্ট থেকে অনেক কম। এমতাবস্থায় সে মূল অর্থ পরিশােধ করবে না এবং অতিরিক্ত আরাে ছয় মাসের জন্য স্বল্প মুনাফার হারের ভিত্তিতে এই সুযােগ গ্রহণ করবে।

বিকল্প প্রস্তাব

এখন প্রশ্ন হল, একটি ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সমস্যার সমাধান কিভাবে করবে। যদি ঋণ খেলাফী ব্যক্তি থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা হয়, তাহলে এর দ্বারা বদদীন ব্যক্তিরা সর্বদা ঋণ পরিশােধ না করার প্রতি আরাে উৎসাহী থাকবে। তাই এই প্রশ্নের উত্তরও রয়েছে-

আমরা পূর্বে বর্ণনা করেছি যে, এই মাসআলার প্রকৃত সমাধান হল, এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা, যার দ্বারা ঋণ খেলাফী ব্যক্তিকে এই শাস্তি দেয়া যায় যে, ভবিষ্যতে সে সকল আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। যেমন, পূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, এমনটি শুধুমাত্র সেখানেই হতে পারে যেখানে সকল ব্যাংকিং পদ্ধতি ইসলামী শিক্ষার আলােকে পরিচালিত হয়, অথবা ইসলামী ব্যাংকসমূহকে ঋণ খেলাফী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়ােজনীয় নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে। এজন্য যতদিন পর্যন্ত এই পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের আরেকটি বিকল্প পদ্ধতির প্রয়ােজন।

এই উদ্দেশ্যের জন্য এই প্রস্তাব করা হয়েছে যে, মুরাবাহা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির সময় গ্রাহক এই দায়িত্ব গ্রহণ করবে যে, সময়মত পরিশােধ না করার ক্ষেত্রে সে ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি জনকল্যাণমূলক ফান্ডে একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ প্রদান করবে। এ প্রসংগে এই নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য যে, এই অর্থের কোন একটি অংশ ও ব্যাংকের আয়ের অংশ হবে না। ব্যাংক এ উদ্দেশ্যে একটি জনকল্যাণমূলক ফান্ড গঠন করবে এবং এই ফান্ডে অর্জিত অর্থ শরীয়ত অনুযায়ী একমাত্র জনকল্যাণমূলক কাজেই ব্যয় করবে। ব্যাংক এই কল্যাণ ফান্ড থেকে উপযুক্ত ব্যক্তিদের বিনা সুদে ঋণও প্রদান করতে পারে।

এই প্রবস্তাবটি কোন কোন মালেকী ফকীহর বর্ণনাকৃত একটি ফিকহী বিধানের উপর নির্ভরশীল। কোন কোন মালেকী ফকীহ বলেন, যদি ঋণগ্রহীতা থেকে এই দাবি করা হয় যে, সে সময়মত পরিশােধ না করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করবে, তাহলে এই পদ্ধতি শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয হবে, কেননা এটা সুদের সাদৃশ্য। কিন্তু ঋণদাতাকে সময়মত ঋণ পরিশােধের নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য ঋণগ্রহীতা এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। সে সময়মত পরিশােধ না করার ক্ষেত্রে কিছু অর্থ দান হিসেবে প্রদান করবে, এটা মূলত এক ধরনের (ছলফ) কসম, যা কোন ব্যক্তির স্বয়ং নিজের পক্ষ থেকে নিজ স্কন্ধে আরােপিত একটি শাস্তি, যাতে সে নিজেকে ঋণ খেলাফী হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। সাধারণ অবস্থায় এই ধরনের কসম দ্বারা চারিত্রিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব অর্পিত হয়। আদালতের মাধ্যমে এর উপর আমল করানাে যায় না। কিন্তু কোন কোন মালেকী ফকীহ নিকট তাকে বিচারের দৃষ্টিতেও অপরিহার্য বলা যায় এবং কুরআন ও হাদীসে এমন কোন কথা নেই যা এধরনের কসমকে আদালতের মাধ্যমে প্রয়ােগ করার ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হবে সুতরাং যেখানে বাস্তবিক পক্ষে প্রয়ােজন হবে, সেখানে এই দৃষ্টিভঙ্গীর উপর আমল করা যেতে পারে। কিন্তু এই প্রস্তাবের উপর আমল করতে হলে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলাে স্মরণ রাখা অপরিহার্য।

(১) এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ঋণগ্রহীতার উপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে করে সে তার দায়িত্ব আদায় করে। এর উদ্দেশ্য ঋণদাতা/অর্থায়নকারীর আয়-উপার্জনে প্রবৃদ্ধি ঘটানাে কিংবা তার থেকে প্রত্যাশিত মুনাফার (Opportunity Cost) ক্ষতিপূরন আদায় করা নয়।

এজন্য এ কথা নিশ্চিত করতে হবে যে, কোন অবস্থাতেই এই জরিমানার কোন একটি অংশ ও ব্যাংকের আয়ের অংশ হবে না, এর দ্বারা ট্যাক্সও আদায় করা যাবে না এবং এগুলােকে অর্থায়নকারীর কোন দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যও ব্যবহার করা যাবে না ।

(২) ব্যাংক তার আয় হিসেবে যেহেতু জরিমানার এই টাকার মালিক হয় না, বরং তা জনকল্যাণমূলক কাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার হবে, সেজন্য এটাকার পরিমান এমন হতে পারে যে পরিমান ঋণগ্রহীতা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করবে। তা বার্ষিক পার্সেন্টিস হিসেবেও নির্ধারিত হতে পারে, এজন্য এই অর্থ স্বেচ্ছায় সময়মত ঋন পরিশােধ না করার বিরুদ্ধে প্রকৃত নিরাপত্তার কাজে আসবে। পক্ষান্তরে পূর্ব বর্ণিত আর্থিক ক্ষতিপূরনের প্রস্তাব যেমন পূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, তা সময়মত ঋন পরিশােধ না করার ব্যাপারে আরাে উৎসাহী করে।

(৩) এই জরিমানা যেহেতু মূলত গ্রাহকের নিজের পক্ষ হতে নিজের উপর আরােপিত একটি কসম, এমন জরিমানা নয় যা অর্থায়নকারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এজন্য চুক্তিতে এই চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন হওয়া উচিত। এ কারণে জরিমানা সংশ্লিষ্ট ধারার কিছু বাক্য এধরনের হতে পারে যে, “গ্রাহক এমর্মে দায়িত্ব গ্রহণ করছে যে, সে যদি এই চুক্তির আলােকে পরিশােধযােগ্য অর্থের কোন অংশ যথাসময়ে পরিশােধ না করে, তাহলে সে ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জনকল্যাণমূলক একাউন্টে ফান্ডে এত টাকা দান করবে, যার হিসাব অনাদায়ের প্রতিদিনের বিনিময়ে বার্ষিক ……% ভিত্তিতে করা হবে। কিন্তু সে যদি ব্যাংক/অর্থায়নকারীর নিকট বিশ্বস্ত ও গ্রহণযােগ্য স্বাক্ষী দ্বারা একথা প্রমাণ করে দেয় যে, অনাদায়ের কারণ দারিদ্রতা কিংবা তার একান্ত অক্ষমতা ও অপারগতা ছিল।”

(৪) যেহেতু এটা কল্যাণমূলক কাজের কসম, তাই মূলত সেই নির্দিষ্ট অর্থ স্বয়ং গ্রাহক নিজের মনমত কোন কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করাও জায়েয ছিল। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে সে যে এই অর্থ পরিশােধ করবে, একথা নিশ্চয়তা প্রদানকল্পে কল্যাণ ফান্ড/একাউন্টকে নির্ধারণ করা হয়েছে। এরূপ নির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করা শরীয়তের কোন উসূলের পরিপন্থি নয়। কিন্তু একথা অপরিহার্য যে, ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ উদ্দেশ্যের জন্য একটি পৃথক ফান্ড অথবা কমপক্ষে পৃথক একটি একাউন্টের ব্যবস্থা করবে এবং তাতে সংগৃহীত অর্থ গ্রাহক/ঋণগ্রহীতার অবগতিক্রমে শরীয়তসম্মত কল্যাণমূলক কাজে ব্যয়িত হতে হবে। বর্তমানে বহুসংখ্যক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এই প্রক্রিয়ার উপর সফলতার সাথে কাজ চলছে।

(৬) মুরাবাহায় রােল ওভারের কোন সুযােগ নেই

আরেকটি নীতিমালা যা স্মরণ রাখা এবং তার উপর আমল করা অত্যন্ত জরুরী। তা হল, মুরাবাহা লেনদেনে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মেয়াদের জন্য রােল অভারের (Roll Over) সুযােগ নেই। সুদ ভিত্তিক অর্থায়নে কোন ব্যাংকের গ্রাহক যদি কোন কারণে নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশােধ করতে না পারে, তাহলে সে ব্যাংকের নিকট তার ঋণের ব্যাপারে আরেকটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নবায়নের জন্য আবেদন করে। ব্যাংক যদি তার সাথে একমত পােষণ করে, তাহলে এই ঋণের উপর পারস্পরিক শর্তসাপেক্ষে রােল অভার করে দেয়া হয়, যার আলােকে নতুন মেয়াদে সুদের হার নতুন করে প্রযােজ্য হবে। কার্যত এর অর্থ এই যে, ততটুকু পরিমাণেই একটি নতুন ঋণ (নতুন করে সুদের হারে) ঋণগ্রহীতাকে পুনর্বার প্রদান করা হয়েছে।

কোন ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান যারা মুরাবাহার পদ্ধতিকে সঠিকভাবে বুঝে না এবং তাকে সুদী অর্থায়নের ন্যায় শুধুমাত্র একটি অর্থায়ন পদ্ধতি মনে করে, তারা রােল অভারের পদ্ধতিকে মুরাবাহায়ও ব্যবহার করা শুরু করে দিয়েছে। গ্রাহক যদি তাদের কাছে মুরাবাহা পরিশােধের তারিখ নবায়নের আবেদন করে, এসব ব্যাংক ঐ মুর রােল অভার করে অতিরিক্ত মুনাফার শর্তের সাথে পরিশােধের সময় বৃদ্ধি করে দেয়। কার্যত এর অর্থ এই যে, সেই পণ্যে (Commodity) আরেকটি মুরাবাহা সংঘটিত হয়ে যায়। (অর্থাৎ, ব্যাংক সেই এক জিনিসই গ্রাহকের কাছে নতুন মুনাফার ভিত্তিতে বিক্রি করে দিয়েছে) এ নীতি শরীয়তসম্মত উসূলের পরিপন্থী।

এ কথা পরিষ্কারভাবে বুঝা উচিত যে, মুরাবাহা কোন ঋণ নয়। বরং একটি পণ্যের বিক্রি, যার মূল্য পরিশােধ একটি নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত বিলম্বিত করে দেয়া হয়েছে। যখন এ পণ্য একবার বিক্রি হয়ে গিয়েছে, তখন এর মালিকানা গ্রাহকের দিকে অর্পিত হয়ে গিয়েছে। এখন আর বিক্রেতার (ব্যাংকের) মালিকানা নেই। বিক্রেতা আইনগতভাবে শুধুমাত্র মূল্যের দাবি করতে পারে, যা ক্রেতার দায়িত্বে পরিশােধযােগ্য ঋণ (Debt)। এ কারণে পূর্বের ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে একই বস্তুকে পুনর্বার বিক্রির প্রশ্নই উঠতে পারে না। রােল অভার (Roll Over) নির্ভেজাল সুদ। কেননা, এটা মুরাবাহা বিক্রি থেকে সৃষ্ট ঋণের (Debt) উপর অতিরিক্ত অর্থ নেয়ার চুক্তি।

(৭) সময়ের পূর্বে পরিশােধের কারণে রোয়ায়াত-সুযােগ

কোন কোন সময় ঋণগ্রহীতা (Debtor) নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ঋণ পরিশােধ করতে চায়। এমতাবস্থায় সে নির্ধারিত বাকি মূল্যে হ্রাস কিছুটা করতেও অভিলাষী হয়। সুতরাং সময়ের পূর্বে পরিশােধের কারণে তাকে রেয়ায়াত দেয়ার ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুমতি আছে কি না- এ প্রশ্নের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ফিকহবিদগণ বিস্তারিত আলােচনা করেছেন। ইসলামের আইনগত গ্রন্থাবলীতে এই মাসআলাটি  (ঋণের পরিমাণে হ্রাস কর এবং জলদী উসূল কর) এর শিরােনামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। কোন কোন ফিক্হবিদ এই ব্যবস্থাপনাকে জায়েয বলেছেন। তবে চার ইমামসহ অধিকাংশ ফিকহবিদের নিকট যদি সময়ের পূর্বে পরিশােধের জন্য এই হ্রাসকে শর্ত হিসেবে আরােপ করে, তাহলে জায়েয নেই।

যেসব ফিক্হবিদের নিকট জায়েয, তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তি হল হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসের উপর। হাদীসটি হল- যখন বনু নযীরের ইয়াহুদীদেরকে তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে। মদীনা মুনাওয়ারা থেকে বহিষ্কার করা হল, তখন কিছু সংখ্যক লােক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-দরবারে উপস্থিত হয়ে আবেদন করল যে, আপনি তাে তাদেরকে দেশান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু কিছুসংখ্যক লােকের নিকট সেসব ইয়াহুদীদের প্রাপ্ত ঋণ রয়েছে যা যার পরিশােধের তারিখ এখনাে আসেনি, এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) সেসব ইয়াহুদীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেনঃ “নিজেদের ঋণ হ্রাস কর এবং জলদী উসূল কর”।

অধিকাংশ ফকীহগণ এই হাদীসকে সঠিক বলে সমর্থন করেন না, হাদীসের বর্ণনাকারী স্বয়ং ইমাম বাইহাকী সুস্পষ্ট বলেছেন যে, এই হাদীসটি যয়ীফ (দুর্বল)।

যদি এই হদীসকে সঠিক বলে সমর্থনও করা হয়, তাহলেও বনু নযীরের দেশান্তর হিজরতের দ্বিতীয় বছরে সংঘটিত হয়েছে। অথচ তখনও সুদের নিষিদ্ধতা অবতীর্ণ হয়নি।

এছাড়া আল্লামা ওয়াক্বেদী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, বনু নযীর সুদি ঋণ প্রদান করত, এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) যে ব্যবস্থাপনার অনুমতি দিয়েছিলেন তা এই ছিল যে, ঋণদাতা সুদ ছেড়ে দিবে এবং ঋণগ্রহীতা মূল পুঁজি জলদী আদায় করবে। ওয়াক্বেদী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, বনু নযীরের একজন ইয়াহুদী সালাম ইবন আবী হুকাইক সাহাবী উসাইদ ইবন হুযাইরকে আশি দীনার দিয়েছিল, যা এক বছর পর অতিরিক্ত চল্লিশ দীনারসহ পরিশােধ করতে হবে। এভাবে উসাইদ (রা.)-এর দায়িত্বে সালামের ১২০ দীনার পরিশােধ করা ওয়াজিব ছিল। এই উল্লেখিত ব্যবস্থাপনার পর উসাইদ (রা.) সালামকে মূল পুঁজি অর্থাৎ আশি দীনার পরিশােধ করে দিয়েছেন এবং সালাম অবশিষ্ট থেকে দায়িত্ব মুক্ত হয়েছেন।

এসব কারণের ভিত্তিতে অধিকাংশ ফকীহদের মতামত হল, যদি সময়ের পূর্বে পরিশােধ করাকে ঋণ হ্রাস করার শর্ত হিসেবে আরােপ করা হয়, তাহলে এটা জায়েয নেই। তবে জলদী পরিশােধের জন্য যদি এই শর্তাআরােপ না করা হয় এবং ঋণদাতা স্বেচ্ছায় স্বীয় সন্তুষ্টিতে রেয়ায়াত দিয়ে দেয়, তাহলে জায়েয আছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গীকে ইসলামী ফিকহ একাডেমী তাদের বার্ষিক সেমিনারে গ্রহণ করেছে।

এর অর্থ এই যে, একটি ইসলামী ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক মুরাবাহার চুক্তিতে এধরনের রেয়ায়াত চুক্তির সময় সিদ্ধান্ত করা যাবে না এবং গ্রাহকও তার প্রাপ্য হিসেবে তা দাবি করতে পারবে । তবে ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি তাদের সম্মতিক্রমে এধরনের সুযােগ দিয়ে দেয়, তাহলে এটাও প্রশ্নযােগ্য নয়। বিশেষ করে গ্রাহক যখন অভাবগ্রস্ত হবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন দরিদ্র কৃষক যদি একটি ট্রাক্টর কিংবা ফসলের বীজ ইত্যাদি মুরাবাহার ভিত্তিতে ক্রয় করে, তাহলে ব্যাংকের উচিত, স্বেচ্ছায় সময়ের পূর্বে আদায়ের ক্ষেত্রে তাকে সুযােগ দিয়ে দেয়া।

(৮) মুরাবাহায় ব্যয়ের হিসাব

একথা পূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, মুরাবাহার চুক্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ইসলামী পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। যে পদ্ধতিতে মূল ব্যয়ের উপর মুনাফা ধার্য করা হয়। এজন্য মুরাবাহা সেখানেই কার্যকর হতে পারে যেখানে বিক্রেতা বিক্রিত পণ্যের উপর ব্যয়িত অর্থের পূর্ণ হিসাব করতে পারে। যদি ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব না করা যায়, তাহলে মুরাবাহা সম্ভবপর হবে না। এক্ষেত্রে দর কষাকষির ভিত্তিতে বিক্রি হবে। (অর্থাৎ, এমন বিক্রি যেখানে মূল ব্যয়ের কথা উল্লেখ থাকে না)।

এই উসূল থেকে আমরা আরেকটি বিধানের দিকে ফিরে যাচ্ছি যে, মুরাবাহা সেই মুদ্রার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত যার দ্বারা বিক্রেতা ঐ পণ্যকে ক্রয় করেছে, সে যদি ঐ জিনিস পাকিস্তানী মুদ্রা দ্বারা ক্রয় করে, তাহলে পরবর্তী বিক্রিও পাকিস্তানী মুদ্রার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। প্রথম বিক্রি যদি আমেরিকান ডলার দ্বারা হয়, তাহলে মুরাবাহাও আমেরিকান ডলারের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, যাতে করে সঠিক ব্যয় নির্ধারণ হতে পারে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে উভয় বিক্রি একই মুদ্রার ভিত্তিতে হওয়া জটিল হতে পারে। গ্রাহকের নিকট যে জিনিস বিক্রি করা হচ্ছে, তা যদি ভিনদেশ থেকে আমদানী করা হয়, অন্যদিকে পরবর্তী ক্রেতা পাকিস্ত নী, তাহলে মূল ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য ভিনদেশের মুদ্রা দ্বারা আদায় করা হবে এবং দ্বিতীয় ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য নির্ধারণ পাকিস্তানী মুদ্রায় হবে।।

এই সমস্যার নিরসন দু’ভাবে করা যেতে পারে। প্রথমত- ক্রেতা যদি একমত হয় এবং সে দেশের আইন-কানুনও তার অনুমতি দেয়, তাহলে দ্বিতীয় ক্রয়-বিক্রয়ও ডলারের ভিত্তিতে হতে পারে।

দ্বিতীয়ত- বিক্রেতা (ব্যাংক) যদি সে জিনিস পাকিস্তানী মুদ্রাকে ডলারে রূপান্তরিত করে ক্রয় করে, তাহলে পাকিস্তানী টাকার সেই পরিমাণ যা তাকে ডলারে রূপান্তরিত করার জন্য আদায় করতে হয়েছে, সেটাকে মূল ব্যয় ধরে মুরাবাহায় তার উপর মুনাফার সংযােজন করা যেতে পারে।

কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যাংক সেই জিনিস ভিনদেশ থেকে ক্রয় করে এবং মূল্য তিন মাস পর কিংবা কিস্তিতে পরিশােধ করতে হয়। সে মূল সরবরাহকারীকে পূর্ণ মূল্য পরিশােধের পূর্বেই উক্ত জিনিস তার গ্রাহকের নিকট বিক্রি করে দেয়। ব্যাংক যেহেতু ডলারের মাধ্যমে মূল্য পরিশােধ করবে এবং পরবর্তিতে গ্রাহকের নিকট যখন সেই জিনিস বিক্রি করা হবে তখন ঐ পরিমান ডলারের বিনিময়ে কত পাকিস্তানী মুদ্রা কত হবে তা জানা যায় না। কেননা, ডলার এবং পাকিস্তানী মুদ্রার মূল্য উঠা-নামা করতে থাকে। এজন্য এমনও হতে পারে যে, মুরাবাহার সময় যে পরিমাণ মূল্যের ধারণা করা হয়েছে ব্যাংকের হয়ত এর চেয়ে অধিক মূল্য পরিশােধ করতে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মুরাবাহার সময় একটি আমেরিকান ডলারের মূল্য ছিল চল্লিশ রুপী, মুরাবাহার মূল্যের নির্ধারণও সেই দর অনুযায়ী ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক যখন মূল সরবরাহকারীকে মূল্য আদায় করেছে তখন ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে একচল্লিশ রুপী হয়ে গিয়েছে। যার পরিণামে ব্যাংকের ব্যয়ে ২.৫ পার্সেন্ট বৃদ্ধি হয়ে গিয়েছে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য কোন কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুরাবাহার চুক্তিতে এরূপ শর্তারােপ করে দেয় যে, মুদ্রার দরে উঠা নামার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় গ্রাহক বহন করবে। কিন্তু পূর্ববর্তী ফকীহদের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী এ ধরনের শর্তে মুরাবাহা সঠিক নয়। কেননা, এমতাবস্থায় ক্রয়বিক্রয়ের সময় মুল্য অস্পষ্ট থেকে যায় এবং এই অস্পষ্টতা ততদিন পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে যতদিন পর্যন্ত ক্রেতা (ব্যাংক) সরবরাহকারীকে মূল্য আদায় না করবে। এ ধরনের অস্পষ্টতার কারণে চুক্তি সঠিক থাকে না। এ সমস্যার সমাধানের জন্য ব্যাংকের কাছে তিনটি পন্থা রয়েছে।

(১) ব্যাংক সেই জিনিস LC at sight এর ভিত্তিতে ক্রয় করবে (যে পন্থায় ক্রেতার নিকট মাল পৌছার সাথে সাথেই মূল্য পরিশােধ করতে হয়) এবং ব্যাংক তার গ্রাহকের নিকট বিক্রির পূর্বে মূল্য পরিশােধ করবে। এ পদ্ধতিতে মুদ্রার দরে উঠা নামার প্রশ্ন সৃষ্টি হবে না। মুরাবাহার মূল্য নির্ধারণ ঐ দিনের মুদ্রার দর অনুযায়ী হবে, যে দিন ব্যাংক সরবরাহকারীকে (Supplier) মূল্য পরিশােধ করেছে।

(২) ব্যাংক মুরাবাহার মূল্যের নির্ধারণও পাকিস্তানী রুপীর পরিবর্তে আমেরিকান ডলার দ্বারা করবে, যাতে করে গ্রাহক মুরাবাহার বাকি মূল্যও আমেরিকান ডলার দ্বারা পরিশােধ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক তার গ্রাহক থেকে আমেরিকান ডলার উসূল করার হকদার হবে। এজন্য ডলারের মূল্যে উঠা নামার আশংকাও ক্রেতাকে (গ্রাহককে) বহন করতে হবে।

(৩) মুরাবাহার পরিবর্তে ক্রয়-বিক্রয় দর কষাকষির ভিত্তিতে করবে (অর্থাৎ, এমন বিক্রি যেখানে মূল ব্যয় উল্লেখ থাকে না) এবং মূল্য এই হিসেবে নির্ধারণ করা হবে, যাতে মুদ্রার দরে সম্ভাব্য কম-বেশিকেও কভার করে নেয়।

(৯) মুরাবাহা কোন জিনিসে হতে পারে

যে সকল জিনিস মুনাফার উপর বিক্রি করা যায় সে সকল জিনিষ মুরাবাহার ভিত্তিতে বিক্রি হতে পারে। কেননা, মুরাবাহাও ক্রয়-বিক্রয়েরই একটি প্রকার। সুতরাং কোন কোম্পানির শেয়ারও মুরাবাহার ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয় হতে পারবে। কেননা, ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী কোম্পানির শেয়ার তার বাহককে কোম্পানির সম্পদে আনুপাতিক হারে মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে। যদি কোম্পানির সম্পদের ক্রয়-বিক্রয় মুনাফার ভিত্তিতে হতে পারে, তাহলে তার শেয়ারকেও মুরাবাহা হিসেবে বিক্রি করা যাবে। তবে জরুরী হল, চুক্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের পূর্ব বিবৃত সকল শর্ত পুরােপুরিভাবে পাওয়া যেতে হবে। এজন্য জরুরী হল, বিক্রেতা প্রথমে শেয়ারকে তার দায়-দায়িত্বসহ কজা করবে অতঃপর সেগুলােকে তার গ্রাহকের নিকট বিক্রি করবে, buy back কিংবা কজা করা ব্যতীত শেয়ারকে বিক্রি করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই।

পক্ষান্তরে যেসব জিনিস ক্রয়-বিক্রয় হতে পারে না, সেগুলাের উপর মুরাবাহা চুক্তি ও হবে না। যেমন, মুদ্রার পারস্পরিক আদান-প্রদানে মুরাবাহা সম্ভব নয়। কেননা, মুদ্রার পারস্পরিক বিক্রি হয়ত নগদ হতে হবে অথবা বাকির ক্ষেত্রে সে দিনের বাজারদর অনুযায়ী হতে হবে যা বিক্রির দিন প্রচলিত ছিল। এমনিভাবে ঐ সকল ব্যবসায়িক ডকুমেন্ট যা বাহকের জন্য উসূলযােগ্য ঋণের প্রতিনিধিত্ব করে, সেগুলাের ক্রয়-বিক্রিও গায়ের মূল্য অনুযায়ী হতে পারবে। এজন্য এধরনের ডকুমেন্টেও মুরাবাহা হতে পারবে না। এমনিভাবে ঐসব ডকুমেন্ট যা বাহককে ইস্যুকারীর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট অর্থ উসূলের হকদার বানায়, সেগুলাের ক্রয়-বিক্রি হতে পারবে না । সেগুলাের আদান-প্রদানের পদ্ধতি হল, শুধুমাত্র লিখিত মূল্য (Face Value) অনুযায়ী আদান-প্রদান করা, সুতরাং মুরাবাহার ভিত্তিতে সেগুলাের বিক্রি হতে পারবে না।

(১০) মুরাবাহায় মূল্য পরিশােধে রি-সিডিউল করা

ক্রেতা/গ্রাহক যদি মুরাবাহা চুক্তিতে আদায়ের তারিখে কোন কারণে পরিশােধ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে সে কখনাে কখনাে বিক্রেতা/ব্যাংকের কাছে কিস্তিসমূহকে রি-সিডিউল করে দেয়ার আবেদন করে। আধুনিক বাংকসমূহে ঋণকে সাধারণত অতিরিক্ত সুদের ভিত্তিতে রি-সিডিউল করা হয়। কিন্তু মুরাবাহার মূল্য পরিশােধের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। কিস্তিসমূহকে যদি রি-সিডিউল করা হয়, তাহলে রি-সিডিউলিং-এর কারণে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া যায় না। মুরাবাহার পরিশােধযােগ্য মূল্য ঐ পরিমানই থাকবে এবং পূর্ব নির্ধারিত মুদ্রাও বলবৎ থাকবে।

কোন কোন ইসলামী ব্যাংকের এমন প্রস্তাব ও রয়েছে যে, মুরাবাহার মূল্যকে এমন মযবুত মুদ্রায় রি-সিডিউল করা হবে, যা ঐ মুদ্রা থেকে ভিন্ন হবে যেগুলােতে মূল মুরাবাহা সংঘটিত হয়েছিল। এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঐ মযবুত মুদ্রার মূল্যে বেশি হওয়ার কারণে এর দ্বারা ব্যাংককে বিনিময় প্রদান করা। এই উপকারিতা যেহেতু রি-সিডিউলের মাধ্যমে অর্জন করা হচ্ছে এজন্য এটা জায়েয নেই, রি-সিডিউলিং অবশ্যই সেই মুদ্রা এবং সেই পরিমাণেই হতে হবে। তবে পরিশােধের সময় ক্রেতা বিক্রেতার সম্মতিতে অদল-বদল হিসেবে ভিন্ন মুদ্রায় সেই দিনের (অর্থাৎ পরিশােধের দিনের) দর অনুযায়ী পরিশােধ করতে পারে। কিন্তু যে দিন চুক্তি হয়েছিল সে দিনের দর অনুযায়ী এই অদল-বদল হতে পারবে না।

(১১) মুরাবাহাকে আদান-প্রদান যােগ্য ডকুমেন্টে রূপান্তরিত করা

মুরাবাহা এমন একটি চুক্তি যাকে আদান-প্রদানযােগ্য এমন ডকুমেন্টে রূপান্তরিত করা যায় না যে ডকুমেন্ট সেকেন্ডারী মার্কেটে (Secondary Market) বিক্রি করা যায়। তার কারণ সুস্পষ্ট, ক্রেতা/গ্রাহক যদি এমন ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করে, যা এ কথা প্রমাণ করে যে, সে বিক্রেতা/অর্থায়নকারীর নিকট এত টাকা ঋণী, তাহলে এ কাগজ তার থেকে উসূলযােগ্য ঋণের মুদ্রার প্রতিনিধিত্ব করে। অথবা ভিন্ন শব্দে, এমন অর্থের প্রতিনিধিত্ব করে, যা তার দায়িত্বে পরিশােধ করা ওয়াজিব। সুতরাং এই ডকুমেন্টকে তৃতীয় ব্যক্তির নিকট বিক্রি করার অর্থ মুদ্রাই (Money) বিক্রি করা। আর একথা পূর্বে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে যে, যখন মুদ্রার আদান-প্রদান একই দেশের মুদ্রার সাথে হবে, তখন এই আদান-প্রদান সমান সমান হওয়া অপরিহার্য। কম বা বেশি মূল্যে বিক্রি করা যাবে না। সুতরাং মুরাবাহা করার ফলে যে মুদ্রার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তার  প্রতিনিধিত্বকারী কাগজ দ্বারা আদান-প্রদানযােগ্য ডকুমেন্ট অস্তিত্বে আসতে পারে না। তাতে যদি কাগজের আদান-প্রদান হয়, তাহলে তা গায়ের মূল্য অনুযায়ীই হতে হবে। তবে যদি কোন বিমিশ্রিত শাখা বিদ্যমান থাকে যা বিভিন্ন চুক্তি যেমন মুশারাকা, ভাড়া এবং মুরাবাহার উপর শামিল, তাহলে সেই মিশ্র শাখার ভিত্তিতে আদান-প্রদানযােগ্য সার্টিফিকেট চালু করা যেতে পারে।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *