মুদারাবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

“মুদারাবা” ( Mudarabah ) অংশীদারিত্বের একটি বিশেষ পদ্ধতি। যে অংশীদারিত্বে এক শরীক অপরকে ব্যবসায় বিনিয়ােগের জন্য অর্থ সরবরাহ করে। পুঁজি বিনিয়ােগ করে প্রথম পক্ষ, তাকে বলা হয় “রাব্দুলমাল” বা “পুঁজি বিনিয়ােগকারী” অপরদিকে ব্যবসার ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা (Management) এবং কাজের দায়িত্ব দ্বিতীয় পক্ষের উপর, যাকে বলা হয়। “মুদারিব” বা “কারবারি”।

মুশারাকা এবং মুদারাবার মাঝে পার্থক্য

(১) মুশারাকায় পুঁজি উভয়পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু মুদারাবায় পুঁজি বিনিয়ােগের দায়িত্ব শুধু রাব্দুল মালের উপর।

(2) মুশারাকায় সকল অংশীদারগণ ব্যবসার জন্য কাজ করতে পারে এবং ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় (Management) সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু মুদারাবায় রাব্দুলমাল ব্যবস্থাপনায় অংশ গ্রহণের কোন অধিকার রাখেনা, বরং তা শুধুমাত্র মুদারিবই আঞ্জাম দিবে।

(৩) মুশারাকায় সকল অংশীদার স্বীয় পুঁজির পরিমাণ অনুপাতে লােকসানে অংশীদার হয়। কিন্তু মুদারাবায় যদি লােকসান হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র রাব্দুলমালকেই বহন করতে হবে। কেননা, মুদারিতাে কোন মূলধনই বিনিয়ােগ করে না। তার লােকসান শুধুমাত্র এতটুকু যে, শ্রম বিফলে গেল এবং কোন পারিশ্রমিক পেল না।

তবে এই নীতিমালা এ শর্তের সাথে সম্পৃক্ত যে, মুদারিবকে এমন পূর্ণ সতর্কতা এবং দায়িত্বের সাথে কাজ করতে হবে যা সাধারণত ঐ জাতীয় ব্যবসার জন্য জরুরী মনে করা হয়। কিন্তু মুদারিব যদি উদাসীনতা এবং বেপরওয়ার হয়ে কাজ করে বা নীতিবিরােধী কোন আচরণ করে, তাহলে বেপরওয়া এবং অসতর্কতার কারণে ব্যবসায় যে লােকসান হবে তা মুদারিবকে বহন করতে হবে।

(৪) মুশারাকায় সাধারণত অংশীদারদের দায়িত্ব (স্বীয় অংশের সাথে) সীমাবদ্ধ থাকে না। সুতরাং ব্যবসার দায়িত্ব (ঋণ) যদি তার সম্পদের তুলনায় বেশী হয়ে যায় এবং পর্যায়ক্রমে ব্যবসার পণ্যসামগ্রী তারল্যে রূপান্তরিত হয়ে যায়, তাহলে সম্পদ অপেক্ষা অতিরিক্ত দায়িত্ব (ঋণ) অংশীদারগণকে স্বীয় অংশ অনুপাতে বহন করতে হবে। তবে সকল অংশীদার যদি এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, কোন অংশীদার ব্যবসা চলাকালীন সময়ে কোন ঋণ গ্রহণ করবে না, তাহলে এক্ষেত্রে অতিরিক্ত দায়িত্ব (ঋণ) শুধুমাত্র সেই অংশীদারকেই বহন করতে হবে যিনি উল্লেখিত শর্ত লংঘন করে ব্যবসায় ঋণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

কিন্তু মুদারাবায় ব্যাপারটি ভিন্ন ধরনের। মুদারাবায় রাব্দুলমালের দায়িত্ব তার বিনিয়ােগকৃত পুঁজির পরিমাণের সাথে সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে রাব্দুলমাল যদি মুদারিকে তার (রাব্দুলমালের) পক্ষ থেকে ঋণ গ্রহণের অনুমতি দিয়ে থাকে। (তাহলে অতিরিক্ত ঋণের দায়িত্ব রাব্দুলমালকে বহন করতে হবে)।

(৫) মুশারাকায় যখনই অংশীদারগণ স্বীয় পুঁজি মিশ্রণ করে নিবে, তখনই মুশারাকার সমুদয় সম্পদে অংশীদারদের অংশ অনুপাতে তাদের যৌথ মালিকানা হয়ে যাবে। (এবং প্রত্যেকেই সম্পদের প্রত্যেক অংশের মালিক হয়ে যাবে)। ফলে অংশীদারদের প্রত্যেকেই উক্ত সম্পদের মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে লাভবান হতে থাকবে, যদিও তা বিক্রি করে লাভবান হয়নি।

কিন্তু মুদারাবার অবস্থা ভিন্নরূপ। মুদারাবায় ক্রয়কৃত সমুদয় সম্পদের মালিক হয় শুধুমাত্র রাব্দুলমাল। মুদারিব শুধুমাত্র উক্ত সম্পদ লাভে বিক্রি করার ক্ষেত্রে লভ্যাংশ থেকে স্বীয় অংশ গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং মুদারিব সম্পদের মূল্য বৃদ্ধি হলেও তাতে স্বীয় অংশের দাবী করার অধিকার রাখে না।

মুদারাবা ব্যবসা

রাব্দুলমাল মুদারিকে বিশেষ ধরনের ব্যবসা করা নির্দিষ্ট করে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে মুদারিবকে শুধুমাত্র রালমালের নির্দেশ মুতাবেক ব্যবসায় অর্থ বিনিয়ােগ করতে হবে। এ ধরনের মুদারাবাকে ‘মুদারাবা মুক্বাইয়াদা’ বলা হয়। পক্ষান্তরে রাব্দুলমাল যদি মুদারিবকে যে কোন ধরনের ব্যবসা করার স্বাধীনতা প্রদান করে, তাহলে মুদারিব ইচ্ছানুযায়ী যে কোন ব্যবসায় অর্থ বিনিয়ােগ করতে পারবে। এ ধরনের মুদারাবাকে ‘মুদারাবা মুত্বলাকা’ বলা হয়।

মুশারাকা

একজন রাব্দুলমাল একই চুক্তিতে একাধিক ব্যক্তির সাথে মুদারাবার চুক্তি করতে পারে। অর্থাৎ, রাব্দুলমাল তার পুঁজি ‘ক’ এবং ‘খ’ উভয়কে (যৌথভাবে) প্রদান করতে পারে। সুতরাং তাদের প্রত্যেকেই রাব্দুলমালের জন্য মুদারিব হিসেবে কাজ করতে পারবে এবং মুদারাবার মূলধন উভয়ে যৌথভাবে ব্যবহার করবে, মুদারিবের অংশ তাদের উভয়ের মাঝে পূর্ব নির্ধারিত অনুপাতে বণ্টন করা হবে। এক্ষেত্রে উভয় মুদারিব পরস্পরের অংশীদারের ন্যায় ব্যবসার কাজ পরিচালনা করবে।

মুদারিব একজন হােক কিংবা একাধিক হােক, তারা ব্যবসায় ঐ সকল কাজ করতে পারবে, যা সাধারণত এ ধরনের ব্যবসায় করা হয়ে থাকে। কিন্তু মুদারিব যদি এমন কোন অসাধারণ কাজ করতে চায়, যা ব্যবসায়ীগণ সাধারণত করে না, তাহলে তা রাব্দুলমালের সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতীত করতে পারবে না ।

মুনাফা বণ্টন 

মুদারাবা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য অন্যতম জরুরী শর্ত হল, কারবার শুরু করার পূর্বেই উভয়পক্ষ প্রকৃত লভ্যাংশ বণ্টনের হার নির্ধারণের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে, যে অনুযায়ী রাব্দুলমাল এবং মুদারিব উভয়ে লভ্যাংশের পাওনাদার হবে। শরীয়ত লভ্যাংশ বন্টনের নির্দিষ্ট কোন অনুপাত বর্ণনা করেনি, বরং তা নির্ধারণের ব্যাপারে উভয়পক্ষের স্বাধীন মতামতের উপর ছেড়ে দিয়েছে। তারা লভ্যাংশে সমহারেও অংশীদার হতে পারে কিংবা রাব্দুলমাল এবং মুদারিবের জন্য পৃথক পৃথক অনুপাতও নির্দিষ্ট করতে পারে। তবে তারা কোন পক্ষের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ ধার্য করতে পারবে না। এমনিভাবে কোন পক্ষের মুনাফা মূলধনের কোন আনুপাতিক অংশের সাথেও নির্দিষ্ট করতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপমূলধন যদি এক লাখ টাকা হয়, তাহলে তারা এ শর্তে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে না যে, সমুদয় মুনাফার দশ হাজার টাকা মুদারিব পাবে এবং এ ধরনের চুক্তিও করতে পারবে না যে, (যেমন) মূলধনের ২০% রাব্দুলমালকে দেয়া হবে। তবে এ চুক্তি করতে পারবে যে, প্রকৃত মুনাফার ৪০% মুদারিব পাবে এবং ৬০% রাব্দুলমাল পাবে, কিংবা ৬০% মুদারিব এবং ৪০% রাব্দুলমাল পাবে।

বিভিন্ন অবস্থায় মুনাফার বিভিন্ন অনুপাত ধার্য করাও জায়েয আছে। যেমন- রাব্দুলমাল মুদারিবকে একথা বলতে পারে যে, তুমি যদি গমের ব্যবসা কর, তাহলে সমুদয় মুনাফার ৫০% পাবে, আর যদি আটার ব্যবসা কর, তাহলে সমুদয় মুনাফার ৩৩% পাবে। এমনিভাবে রাব্দুলমাল একথাও বলতে পারে যে, তুমি যদি নিজ শহরে ব্যবসা কর, তাহলে ৩০% পাবে, আর যদি ভিন্ন শহরে ব্যবসা কর, তাহলে মুনাফায় তােমার অংশ ৫০% হবে । মুনাফার সিদ্ধান্তকৃত আনুপাতিক অংশ ব্যতীত মুদারিব মুদারাবার জন্য কৃত স্বীয় কাজের বিনিময়ে কোন রকম বেতন, ভাতা বা বিনিময়ের দাবী করতে পারবে না।

ফিকহবিদদের সর্বসম্মতিক্রমে মুদারিব পূর্ব সিদ্ধান্তকৃত আনুপাতিক হারে মুনাফা ব্যতীত মুদারাবার ব্যবসা পরিচালনার কারণে কোন রকম বেতন, ভাতা বা বিনিময়ের দাবী করতে পারবে না। তবে ইমাম আহমাদ (রহ.) মুদারিবকে মুদারাবা একাউন্ট থেকে শুধুমাত্র দৈনিক খােরাকের খরচ গ্রহণ করার অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু হানাফী ফিকহবিদদের নিকট মুদারিব মুদারাবা একাউন্ট থেকে দৈনিক খােরাকের খরচ ঐ সময় গ্রহণ করতে পারবে, যখন সে মুদারাবা ব্যবসার জন্য নিজ শহরের বাইরে ভ্রমণ করবে। তখন সে তার থাকা খাওয়া ইত্যাদির খরচ গ্রহণ করতে পারবে। নিজ শহরে থাকাকালীন সময়ে দৈনিক কোন খরচের পাওনাদার হবে না। | যদি মুদারাবার কোন ব্যবসায় লােকসান হয় এবং কোন ব্যবসায় লাভ হয়, তাহলে প্রথমে লাভ দ্বারা লােকসানের ক্ষতিপূরণ করা হবে। ক্ষতিপূরণের পর যা থাকবে, তা উভয়ের মাঝে পূর্ব সিদ্ধান্তকৃত আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে।

মুদারাবা সমাপ্ত করা

মুদারাবা চুক্তি উভয়পক্ষের যে কেউ যে কোন সময় অপর পক্ষকে নােটিশ প্রদানের মাধ্যমে সমাপ্ত করতে পারে। সমাপ্তির সময় মুদারাবার সমুদয় সম্পদ যদি তরল আকৃতির হয় এবং মূলধনের বিনিময়ে কিছু মুনাফাও অর্জিত হয়, তাহলে তা উভয়ের মাঝে মুনাফার সিদ্ধান্তকৃত আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে। কিন্তু মুদারাবার সম্পদ যদি তরল আকৃতির না হয়, তাহলে মুদারিবকে মুদারাবার সম্পদ বিক্রি করে তারল্যে রূপান্তরিত করার সুযােগ দেয়া হবে, যাতে প্রকৃত মুনাফা নির্ধারণ করা যায়।

মুসলিম ফিক্হবিদদের এ প্রশ্নের ব্যাপারে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যে, মুদারাবাকে এমন কোন নির্দিষ্ট মেয়াদের সাথে নির্ধারণ করা যাবে কিনা, যে মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে মুদারাবা চুক্তি নিজে নিজেই  সমাপ্ত হয়ে যাবে । হানাফী এবং হাম্বলী মাযহাব অনুযায়ী মুদারাবাকে সুনির্দিষ্ট মেয়াদের সাথে সীমাবদ্ধ করা যাবে। যেমন, এক বছর, ছয় মাস ইত্যাদি। যার পরে মুদারাবা বিনা নােটিশে সমাপ্ত হয়ে যাবে। অপরদিকে মালেকী এবং শাফেয়ী ফিহবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি হল মুদারাবাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের সাথে সীমাবদ্ধ করা যাবে না।

তবে ফিকহবিদদের এ মতবিরােধ মুদারাবার মেয়াদের সর্বশেষ এবং সর্বোচ্চ সময়সীমার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু উভয়ের পক্ষ থেকে মুদারাবার এমন কোন সর্বনিম্ন সময়সীমা নির্ধারণ করা যাবে কিনা, যার পূর্বে মুদারাবা চুক্তি সমাপ্ত করা যাবে না? ইসলামী ফিকহের গ্রন্থাবলীতে এ প্রশ্নের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু একটি মূলনীতি যা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, এ ধরনের কোন সময়সীমা নির্ধারণ করা যাবেনা। বরং উভয়পক্ষের যে কেউ যখন ইচ্ছা করবে মুদারাবা চুক্তি সমাপ্ত করতে পারবে।

উভয়পক্ষের মুদারাবা সমাপ্তি করার এই অসীম স্বাধীনতা বর্তমান যুগে কিছু সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কেননা, বর্তমানে অধিকাংশ ব্যবসাবাণিজ্যে সফলতা দেখানাের জন্য বেশ কিছু সময়, দৃঢ়সংকল্প ও স্থিরচিত্তসম্পন্ন পরিশ্রমের প্রয়ােজন হয়। এ কারণে রাব্বলমাল যদি ব্যবসার একেবারেই শুরুলগ্নে মুদারাবা সমাপ্ত করে দেয়, তাহলে তা এই প্রকল্পের জন্য বিরাট জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে মুদারিবের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হবে, কেননা সে সার্বিক প্রচেষ্টা ব্যয় করার পরও কোন কিছু অর্জন করতে পারেনি। এজন্য মুদারাবা চুক্তির প্রারম্ভেই যদি উভয়পক্ষ এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, কোন পক্ষ একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত বিশেষ কোন সমস্যা ব্যতীত মুদারাবাকে সমাপ্ত করবেনা, তাহলে এ শর্তটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে শরীয়তের কোন মূলনীতির পরিপন্থি বলে মনে হয় না। বিশেষত ঐ হাদীসের আলােকে যা পূর্বেও উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে যে, “মুসলমানদের মাঝে সিদ্ধান্তকৃত শর্তকে স্থির রাখা হবে, কিন্তু ঐ শর্ত যা কোন হারামকে হালাল করে বা হালালকে হারাম করে।” (আবু দাউদ, হাদীস নং- ৩৫৫৫)।

মুশারাকা এবং মুদারাবার সমন্বয়

সাধারণ অবস্থায় এটাই মনে করা হয় যে, মুদারিব মুদারাবায় কোন পুঁজি বিনিয়ােগ করে না, সে শুধু ব্যবস্থাপনার যিম্মাদার, সমুদয় পুঁজি রাব্দুলমাল বিনিয়ােগ করে। কিন্তু এমন অবস্থাও হতে পারে যে, মুদারিবও তার কিছু পুঁজি মুদারাবা ব্যবসায় বিনিয়ােগ করতে চায়, এ ক্ষেত্রে মুশারাকা এবং মুদারাবা চুক্তিদ্বয় একত্রিত হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ- ‘A’ ‘B’ কে মুদারাবার ভিত্তিতে এক লাখ টাকা প্রদান করল। অতঃপর ‘B’ ‘A’ এর সম্পতিতে নিজের পক্ষ থেকে আরাে পঞ্চাশ হাজার টাকা মুদারাবায় সংযুক্ত করল। এ জাতীয় অংশীদারিত্বের সাথে মুশারাকা এবং মুদারাবার সমন্বিত মু’আমালা করা হবে। এখানে মুদারিব নিজের জন্য অংশীদার হিসেবে মুনাফার বিশেষ একটি অংশ ধার্য করতে পারবে। এর সাথে সাথে সে মুদারিব হিসেবে মুদারাবার ব্যবস্থাপনা এবং পরিশ্রমের কারণে মুনাফার আরেকটি অংশ ধার্য করতে পারবে। উল্লেখিত উদাহরণে মুনাফা এ ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে যে, ‘B’ প্রকৃত মুনাফার এক তৃতীয়াংশ স্বীয় পুঁজির কারণে পাবে, অবশিষ্ট দুই তৃতীয়াংশ মুনাফা উভয়ের মাঝে সমহারে বণ্টন হবে, কিন্তু (এই দুই তৃতীয়াংশ বণ্টনে) উভয়পক্ষ অন্য কোন আনুপাতিক। হারের উপরও চুক্তিবদ্ধ হতে পারে। তবে এতটুকু শর্ত যে, নিষ্ক্রিয় অংশীদার (Sleeping Partner) স্বীয় পুঁজির অনুপাত অপেক্ষা বেশি গ্রহণ করতে পারবে না। সুতরাং উল্লেখিত উদাহরণে ‘A’ নিজের জন্য সমুদয় মুনাফার দুই তৃতীয়াংশের অধিক ধার্য করতে পারবে না। কেননা, তার বিবিয়ােগকৃত পুঁজি সমুদয় পুঁজির দুই তৃতীয়াংশের অধিক নয়।

মুশারাকা এবং মুদারাবা পদ্ধতিতে অর্থায়ন

পূর্বে মুশারাকা এবং মুদারাবার প্রাচীন ধারণা এবং সে অনুযায়ী শরয়ী বিধানাবলীর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আধুনিক ব্যবসা বাণিজ্যে এ দুটি পদ্ধতিকে অর্থায়ন (Financing) -এর উদ্দেশ্যে কিভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে সে বিষয়ে আলােকপাত করা প্রয়ােজন মনে করি।।

ইসলামী ফিকহের গ্রন্থাবলীতে মুশারাকা এবং মুদারাবার স্বরূপ এ চিন্তা-চেতনার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়েছে যে, এ দু’টি চুক্তি এমন যৌথ কারবার শুরু করার জন্য যেখানে উভয়পক্ষ একেবারে শুরু থেকেই ব্যবসায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং একেবারে শেষ পর্যন্ত তথা সম্পদ তরল আকৃতিতে রূপান্তর করা পর্যন্ত অংশীদার থাকে। ইসলামী ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে এ ধরনের চলমান ব্যবসার বর্ণনা পাওয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার, যেখানে অংশীদারগণ ব্যবসার চলমান অবস্থায় কোন রকম জটিলতা সৃষ্টি ব্যতীত অংশীদার হয় এবং পৃথক হয়ে যায়। বস্তুত ইসলামী ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থাবলী এমন পরিবেশে লিখা হয়েছে যেখানে বড় ধরনের কোন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচলন ছিল না এবং বর্তমান যুগের ন্যায় তৎকালীন ব্যবসা-বাণিজ্যে এত জটিলতাও ছিল না। যার ফলে পূর্ববর্তী মনীষীগণ এ ধরনের প্রচলিত ব্যবসার সমাধানের প্রতি মনােনিবেশ করেননি। কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে, মুশারাকা এবং মুদারাবাকে চলমান ব্যবসার অর্থায়নের জন্য ব্যবহার করা যায় না। মুশারাকা এবং মুদারাবার পদ্ধতি যেসব বুনিয়াদী মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, সেসব মূলনীতির প্রতি লক্ষ্য রেখে কালের পরিবর্তনে সেগুলাের প্রয়ােগের প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা যেতে পারে।

বিস্তারিত আলােচনার পূর্বে সেসব বুনিয়াদী মূলনীতির প্রতি আমাদের একটু দৃষ্টিপাত করা উচিত।

(১) মুশারাকা এবং মুদারাবার মাধ্যমে অর্থায়ন ঋণ হিসেবে অর্থ প্রদানের সদৃশ্য নয়। বরং মুশারাকার পদ্ধতিতে অর্থায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিনিয়ােগকৃত পুঁজির অনুপাতে ঐ ব্যবসার সম্পদে অংশীদার হওয়া।

(২) বিনিয়ােগকারী/অর্থযােগানদাতা তার পুঁজির অনুপাতে ব্যবসার লােকসানেও অবশ্যই অংশীদার হতে হবে।

(৩) অংশীদারদের এ স্বাধীনতা রয়েছে যে, তারা তাদের পারস্পরিক সন্তুষ্টিতে প্রত্যেকের জন্য মুনাফার অনুপাত সাব্যস্ত করতে পারে। তবে যে অংশীদার সুস্পষ্টভাবে নিজেকে ব্যবসার জন্য কাজ করার দায়িত্ব থেকে পৃথক করে নেয়, সে তার পুঁজির অনুপাত অপেক্ষা অধিক মুনাফার দাবী করতে পারে না।

(৪) লােকসান প্রত্যেককেই তাদের পুঁজির অনুপাতে বহন করতে হবে।

এসব মূলনীতিকে সামনে রেখে মুশারাকা এবং মুদারাবাকে অর্থায়নের বিভিন্ন অধ্যায়ে কিভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, এ পর্যায়ে আমরা সে বিষয়ে আলােচনা করব।

প্রকল্প অর্থায়ন : (Project Financing)

প্রকল্প অর্থায়ন (Project Financing)-এর জন্য মুশারাকা এবং মুদারাবার প্রাচীন পদ্ধতি খুব সহজতার সাথে অবলম্বন করা যায়। পুঁজি বিনিয়ােগকারী (Financier) যদি (এককভাবে) পূর্ণ প্রজেক্টে পুঁজি বিনিয়ােগ করতে চায়, তাহলে মুদারাবা পদ্ধতি গ্রহণ করবে। আর উভয়পক্ষ পুঁজি বিনিয়ােগ করলে মুশারাকা পদ্ধতি অবলম্বন করা যায় । পুঁজি উভয়পক্ষ বিনিয়ােগ করার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা যদি এক পক্ষের দায়িত্বে থাকে, তাহলে পূর্বোল্লেখিত নিয়মানুযায়ী মুশারাকা এবং মুদারাবার সমম্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করবে।

আরো পড়তে পারেন:  আপনার জন্য সেরা ক্রেডিট কার্ড কোনটি

যেহেতু মুশারাকা এবং মুদারাবা প্রকল্পের একেবারে প্রথম থেকেই কার্যকর হবে, তাই পুঁজির মূল্য নির্ধারণের সমস্যাও সামনে আসবেনা । এমনিভাবে সাধারণ হিসাব-নিকাশের নিয়ম-নীতি (Accounting Standards) অনুযায়ী মুনাফা বণ্টনেও কোন সমস্যা হবে না। তবে পুঁজি বিনিয়ােগকারী (Financier) যদি মুশারাকা থেকে পৃথক হয়ে যেতে চায় এবং দ্বিতীয় পক্ষ ব্যবসা চালু রাখতে চায়, তাহলে দ্বিতীয় পক্ষ প্রথম পক্ষের অংশ পারস্পরিক আলােচনা সাপেক্ষে মূল্য নির্ধারণ করত ক্রয় করতে পারবে। এভাবে পুঁজি বিনিয়ােগকারী লভ্যাংশসহ তার বিনিয়ােগকৃত পুঁজি ফেরত নিতে পারে। ব্যবসায় যদি কিছু মুনাফা অর্জন হয়, তাহলে তার অংশের মূল্য কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে এ বিষয়টি সামনে ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যালের অর্থায়নের আলােচনায় আসবে।

অপরদিকে ব্যবসায়ী (পুঁজি ব্যবহারকারী) ইচ্ছা করলে তার প্রজেক্ট চালু রাখতে পারে। হয়ত নিজের মালিকানায় রেখে কিংবা প্রথম অর্থায়নকারীর অংশ অন্য কোন ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে। অন্যের নিকট বিক্রির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পুঁজি বিনিয়ােগকারী প্রথম বিনিয়ােগকারীর স্থলাভিষিক্ত হয়ে যাবে।

যেহেতু অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান (Financial Institution) সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদের জন্য বিশেষ কোন প্রজেক্টে অংশীদার থাকতে চায় না, এজন্য উল্লেখিত পন্থানুযায়ী উক্ত প্রতিষ্ঠান স্বীয় অংশ প্রজেক্টের অন্যান্য অংশীদারদের নিকট বিক্রি করতে পারবে। যদি প্রজেক্টে তরল আকৃতির পুঁজি অর্থাৎ নগদ অর্থের স্বল্পতার কারণে তা একসঙ্গে বিক্রি করা সম্ভব না হয়, তাহলে অর্থায়নকারীর অংশকে ছােট ছােট ইউনিটে ভাগ করে কিছুদিন পর পর সময়মত বিক্রি করা যায়। যখন একটি ইউনিট বিক্রি হয়ে যাবে, তখন বিনিয়ােগকারী (Financier) -এর সে পরিমাণ অংশ প্রজেক্ট থেকে কমে যাবে। এভাবে যখন সকল ইউনিট বিক্রি হয়ে যাবে তখন অর্থায়নকারী প্রজেক্ট থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে যাবে।

মুশারাকাকে আদান-প্রদান যােগ্য ডকুমেন্টে রূপান্তরিত করা : (Securitization of Musharakah)

মুশারাকা এমন একটি অর্থায়ন পদ্ধতি, যাকে সহজেই সিকিউরিটাইজ করা যায়। (অর্থাৎ আদান-প্রদান যােগ্য ডকুমেন্টে রূপান্তরিত করা যায়)। বিশেষ করে এমন বৃহদায়তনের প্রজেক্ট যেখানে প্রচুর পরিমাণ অর্থের প্রয়ােজন হয়, যা সীমিত সংখ্যক লােক যােগান দিতে পারে না। ফলে উদ্যেক্তারা পুঁজি গঠনের জন্য ৫০/১০০ টাকা করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে বিভক্ত করে শেয়ার হিসেবে বিক্রির জন্য ছাড়ে) প্রত্যেক অর্থ প্রদানকারীকে একটি “মুশারাকা সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়, যে সার্টিফিকেট পরিশােধিত মূলধন অনুপাতে মুশারাকার সমুদয় সম্পদে প্রতিনিধিত্ব করে। যখন জড় সম্পদ এবং দ্রব্যগত সম্পদ সংগ্রহ করে ব্যবসার প্রজেক্ট শুরু হয়ে যাবে, তখন ঐ “মুশারাকা সার্টিফিকেটসমূহ” আদান-প্রদানযােগ্য ডকুমেন্টের মর্যাদায় উপনীত হয়ে যাবে এবং সেগুলােকে শেয়ার মার্কেটে বেচাকেনা করা যাবে। কিন্তু এসব সার্টিফিকেটের ব্যবসা মুশারাকার সমুদয় সম্পদ তরল আকৃতি (অর্থাৎনগদ টাকা-পয়সা, উসূলযােগ্য ঋণ, অন্যকে প্রদানকৃত ঋণের টাকা) থাকাকালীন জায়েয হবে না।

উক্ত বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝার জন্য একথা স্মরণ রাখা জরুরী যে, মুশারাকায় পুঁজি বিনিয়ােগ করা ঋণের সাদৃশ্য নয়। কোন ঋণের প্রমাণপত্র হিসেবে জারীকৃত বন্ডের ঋণকৃত অর্থ দ্বারা পরিচালিত ব্যবসার সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। এই বন্ড শুধুমাত্র ঐ ঋণের প্রতিনিধিত্ব করে যার বাহককে সর্বাবস্থায় সাধারণত সুদসহ ফেরৎ দেয়া হয়। পক্ষান্তরে মুশারাকা সার্টিফিকেট প্রজেক্টের সম্পদে বাহকের সরাসরি আনুপাতিক একটি অংশের মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে। যদি যৌথ প্রজেক্টের সমুদয় সম্পদ তরল আকৃতির হয়, তাহলে উক্ত সার্টিফিকেট প্রজেক্টের মালিকানাধীন অর্থের একটি বিশেষ আনুপাতিক অংশের প্রতিনিধিত্ব করবে। উদাহরণস্বরূপ- একশ’ সার্টিফিকেট ছাড়া হল, যার প্রতিটির মূল্য এক মিলিয়ন টাকা। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, প্রজেক্টের সমুদয় মূলধন হল একশ’ মিলিয়ন টাকা। যদি এ অর্থ দ্বারা কোন প্রকার দ্রব্যগত সম্পদ ক্রয় করা হয়, তাহলে প্রতিটি সার্টিফিকেট এক মিলিয়ন টাকার প্রতিনিধিত্ব করবে। এমতাবস্থায় এই সার্টিফিকেটকে শুধুমাত্র গায়ের মূল্য (এক মিলিয়ন টাকা)-এর বিনিময়েই বিক্রি করা যাবে। কেননা, যদি একটি সার্টিফিকেটকে এক মিলিয়ন টাকা অপেক্ষা অধিক মূল্যে বিক্রি করা হয়, তাহলে এর অর্থ হবে এক মিলিয়ন টাকা, এক মিলিয়ন টাকার অধিক মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে যার অনুমতি নেই। কারণ, যখন টাকার বিনিময়ে টাকা বিক্রি করা হয়, তখন উভয় দিকে টাকার পরিমাণগত সমতা রক্ষা করা জরুরী। যে কোন পক্ষ থেকে টাকার পরিমাণ বেশি পরিশােধ করা হলে তা সুদ হয়ে যাবে।

কিন্তু যৌথ মূলধন দ্বারা যখন দ্রব্যগত সম্পদ যেমন- যমিন, বিল্ডিং, মেশিনারী, জড় সম্পদ এবং ফার্নিচার ইত্যাদি ক্রয়ে বিনিয়ােগ করা হবে, তখন মুশারাকা সার্টিফিকেট ঐ সম্পদসমূহে সার্টিফিকেট হােল্ডারের পরিশােধিত মূলধন অনুপাতে মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করবে। সুতরাং উল্লেখিত উদাহরণে একটি সার্টিফিকেট ঐ সম্পদসমূহের একশ’ ভাগের এক ভাগের (১০০/১) প্রতিনিধিত্ব করবে। এমতাবস্থায় উক্ত সার্টিফিকেটকে শেয়ার মার্কেটে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতিক্রমে যে কোন মূল্যে বিক্রি করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হবে। এ মূল্য শেয়ারের লিখিত মূল্য (Face Value) থেকেও অধিক হতে পারবে। কেননা, এক্ষেত্রে যে জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে তা দ্রব্যগত এবং জড় সম্পদের একটি অংশ। শুধু মুদ্রা বা টাকা পয়সা নয়। সুতরাং উক্ত সার্টিফিকেটকে অন্যান্য যে কোন দ্রব্যগত সম্পদের ন্যায় মনে করে লাভ লােকসানের ভিত্তিতে (কম বেশিতে) বিক্রি করা যাবে।

অধিকাংশ সময় প্রজেক্টের সম্পদ তরল এবং দ্রব্যগত-এর সংমিশ্রণ হয়। এরূপ তখন হয়, যখন সক্রিয় অংশীদার (Working Partner) যৌথ মূলধনের একটি অংশকে জড় সম্পদ বা কাঁচা মালে রূপান্তরিত করে ফেলে এবং অবশিষ্ট মূলধন তরল আকৃতির থেকে যায়। অথবা মূলধনকে দ্রব্যগত সম্পদে রূপান্তরিত করার পর তার থেকে কৃয়দাংশ সম্পদ বিক্রি করে কিছু নগদ অর্থ সংগ্রহ করে নেয়। কোন কোন অবস্থায় এমনও হতে পারে যে, ঐ দ্রব্যগত সম্পদ বাকিতে বিক্রি করার কারণে মূল্য এখনাে উসূল হয়নি, তবে উসূলযােগ্য। সেই উসূলযােগ্য অর্থ ঋণ হওয়ার কারণে তরল আকৃতির সম্পদ মনে করা হবে। এক্ষেত্রে যখন কোন প্রজেক্টের সম্পদ তরল আকৃতির (নগদ অর্থ) এবং দ্রব্যগত সম্পদের বমিশ্রণ হয়, তখন তার শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে প্রশ্ন উঠে যে, এমন প্রজেক্টের মুশারাকা সার্টিফিকেটের ব্যবসা করা যাবে কিনা? এই বিষয়ে সমকালীন ফিকহবিদদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। পূর্ববর্তী শাফেয়ী ফিকহবিদদের মতে এ ধরনের সার্টিফিকেটকে বিক্রি করা যাবে না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল, যেখানে তরল আকৃতির সম্পদ এবং দ্রব্যগত সম্পদের বিমিশ্রণ হবে, সেখানে ততক্ষণ পর্যন্ত বেচাকেনা করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পদের দ্রব্যগত অংশকে পৃথক করে তা আলাদাভাবে বিক্রি না করা হবে।

হানাফী ফিকহবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি হল, তরল এবং দ্রব্যগত বমিশ্রিত সম্পদকে বিক্রি করা যাবে। তবে শর্ত হল, ধার্যকৃত মূল্য সমুদয় সম্পদের অন্তর্ভুক্ত তরল সম্পদের মূল্যমান থেকে অধিক হতে হবে। যাতে একথা মনে করা যায় যে, মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয় তার সমপরিমাণ মুদ্রার বিনিময়ে হয়েছে এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যবসার মালিকানাধীন বিদ্যমান দ্রব্যগত সম্পদের মূল্য।

উদাহরণস্বরূপ- মুশারাকা প্রজেক্টের ৪০% সম্পদ দ্রব্যগত, অর্থাৎ মেশিনারি, স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি। ৬০% সম্পদ তরল আকৃতির, অর্থাৎ নগদ ক্যাশ এবং উসূলযােগ্য অর্থ। এ প্রজেক্টের একশ’ টাকা মূল্যমানের সার্টিফিকেট ৬০ টাকার তরল এবং ৪০ টাকার দ্রব্যগত সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে। উক্ত সার্টিফিকেটকে ৬০ টাকার অধিক যে কোন মূল্যে বিক্রি করা যাবে। যদি তাকে ১১০ টাকায় বিক্রি করা হয়, তার অর্থ দাঁড়াবে ৬০ টাকা সার্টিফিকেটের তরল ৬০ টাকার বিনিময়ে এবং অবশিষ্ট ৫০ টাকা দ্রব্যগত সম্পদের আনুপাতিক অংশের বিনিময়ে। কিন্তু এ সার্টিফিকেটকে ৬০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি করা অবশ্যই জায়েয হবে না। কেননা, এক্ষেত্রে অবশিষ্ট দ্রব্যগত সম্পদকে পৃথক করত ৬০ টাকাকে ৬০ টাকার বিনিময়ে ধরা যাচ্ছে না। (যেহেতু দ্রব্যগত সম্পদের বিনিময়ে ঐ ৬০ টাকার কিছু অংশ অবশ্যই এসে যাবে) যার ফলে ৬০ টাকার বিনিময়ে আর ৬০ টাকা থাকবে না।

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী মিশ্র সম্পদে দ্রব্যগত সম্পদের বিশেষ কোন আনুপাতিক হার নির্দিষ্ট নেই। সুতরাং যদি দ্রব্যগত সম্পদ মিশ্র সম্পদের ৫০% থেকে কমও হয়, তাহলেও উল্লেখিত নিয়মানুযায়ী তার ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হবে।

MUSHARAKA

তবে শাফেয়ী ফিকহবিদ এবং অধিকাংশ সমকালীন ফিহবিদ ব্যবসার দ্রব্যগত সম্পদ ৫০% থেকে বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে ঐ ইউনিটসমূহের ক্রয়-বিক্রির অনুমতি প্রদান করেন।

সুতরাং মুশারাকা সার্টিফিকেটের ব্যবসা সকল ফিকহবিদদের নিকট গ্রহণযােগ্য হওয়ার জন্য জরুরী হল- মুশারাকার দ্রব্যগত সম্পদ মিশ্র সম্পদের (Portfolio) ৫০% থেকে অধিক হতে হবে। কিন্তু যদি শুধু হানাফী মাযহাব অনুযায়ী আমল করা হয়, তাহলে দ্রব্যগত সম্পদ ৫০% থেকে কম হওয়ার ক্ষেত্রেও এর ব্যবসা করা জায়েয হবে। তবে এই দ্রব্যগত সম্পদ এত স্বল্প না হতে হবে যা একেবারেই অনুল্লেখযােগ্য।

এক চুক্তির অর্থায়ন : (Financing of Single Transaction)

মুশারাকা এবং মুদারাবা একই চুক্তির অর্থায়নের জন্য খুব সহজেই ব্যবহৃত হতে পারে। ছােটখাট ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন প্রয়ােজন পূরণ করা ছাড়াও মুশারাকা এবং মুদারাবাকে আমদানি এবং রফতানির অর্থায়নের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন আমদানিকারক (Importer) (রফতানিকারকের সাথে) চুক্তিকৃত অর্থ পরিশােধের জন্য যে কোন অর্থায়নকারী (financier) -এর নিকট মুশারাকা এবং মুদারাবার ভিত্তিতে অর্থায়নের জন্য আবেদন করতে পারে। ব্যাংকও এ দুটি পদ্ধতি (মুশারাকা এবং মুদারাবা) কে আমদানির অর্থায়ন (Import Financing)-এর জন্য ব্যবহার করতে পারে। এলসি যদি জিরাে মার্জিনে খােলা হয়, তাহলে মুদারাবা পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে, আর যদি এলসি আংশিক মার্জিনে খােলা হয়, তাহলে শুধু মুশারাকা কিংবা মুদারাবা এবং মুশারাকার সমন্বিত পদ্ধতি অবলম্বন করা যাবে। আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে খালাস করার পর সেগুলাের বিক্রিলব্ধ অর্থ আমদানিকারক এবং অর্থায়নকারীর মাঝে পূর্ব সিদ্ধান্তকৃত আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে।

এক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্য অর্থায়নকারীর বিনিয়ােগকৃত পুঁজির অনুপাতে তার মালিকানায় থাকবে। এই মুশারাকাকে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্তও সীমাবদ্ধ করা যায়। যদি সেই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আমদানিকৃত পণ্য বিক্রি না হয়, তাহলে আমদানিকারক নিজে অর্থায়নকারীর অংশ ক্রয় করে এককভাবে ঐ পণ্যের মালিক হয়ে যাবে । কিন্তু এ অবস্থায় ক্রয়-বিক্রয় ও বাজার মূল্য অনুযায়ী, অথবা বিক্রির দিন উভয়ের মাঝে সাব্যস্তকৃত মূল্যে হতে হবে। মুশারাকায় অদ্ভুক্তির সময় যে মূল্য ধার্য করা হয়েছিল, সে মূল্যে বিক্রি করা সঠিক হবে না। মূল্য যদি পূর্বেই সাব্যস্তকৃত হয়, তাহলে অর্থায়নকারী নিজ গ্রাহক আমদানিকারককে তা ক্রয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না।

এমনিভাবে রফতানির অর্থায়ন (Export Financing)-এর জন্যও মুশারাকা পদ্ধতি খুব সহজভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। যে মূল্যে পণ্য রফতানি করা হবে তা পূর্বেই জানা থাকার কারণে অর্থায়নকারী (Financier) প্রত্যাশিত মুনাফার ধারণা খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারে এবং মুশারাকা ও মুদারাবার ভিত্তিতে অর্থায়ন করে রফতানিকৃত সম্পদে পূর্ব সিদ্ধান্তকৃত আনুপাতিক হারে অংশীদার হতে পারে। রফতানিকারকের কোনরূপ উদাসীনতার কারণে লােকসান হলে অর্থায়নকারী নিজেকে তা থেকে মুক্ত রাখার জন্য এ শর্তারােপ করতে পারে যে, এলসির শর্তানুযায়ী পণ্য পাঠানাের দায়িত্ব রফতানিকারকের উপর। যদি এলসির শর্তের সাথে কোন রকম ব্যবধান পাওয়া যায়, তাহলে এর দায়-দায়িত্ব শুধুমাত্র রফতানিকারকের উপর বর্তাবে। এধরনের শর্তারােপ থাকলে কোন লােকসান হলে তা থেকে অর্থায়নকারী মুক্ত থাকবে। কেননা, এ লােকসান রফতানিকারকের উদাসীনতার কারণে হয়েছে। কিন্তু অর্থায়নকারীকে রফতানিকারকের সাথে অংশীদার হওয়ার সুবাধে ঐসব লােকসান বহন করতে হবে, যা রফতানিকারকের কোনরূপ অসতর্কতা বা উদাসীনতা ছাড়া হয়েছে।

ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যালে অর্থায়ন : (Financing of the working capital)

যদি কোন চলতি ব্যবসার ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যালের জন্য অর্থায়নের প্রয়ােজন হয় তাহলে মুশারাকার মাধ্যম নিম্নবর্ণিত পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হতে পারে।

(১) পারস্পরিক সন্তুষ্টিতে চলতি ব্যবসার সমুদয় সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করে নেয়া হবে। পূর্বে মুশারাকার প্রাচীন পদ্ধতির বর্ণনায় আলােচনা করা হয়েছে যে, ইমাম মালেক (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী মুশারাকার মূলধন তরল-নগদ আকৃতিতে বিনিয়ােগ করা জরুরী নয়। দ্রব্যগত সম্পদও মূল্য নির্ধারণ করত মুশারাকার অংশ হতে পারে। এ দৃষ্টিভঙ্গিকে এখানে গ্রহণ করা যেতে পারে। এভাবে ব্যবসার সম্পদের মূল্যকে ব্যবসায়ীর মূলধন ধরা হবে, অপরদিকে অর্থায়নকারীর প্রদেয় অর্থকে মূলধনে তার অংশ মনে করা হবে। মুশারাকা একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা তথা এক বছর, ছয় মাস বা এর চেয়ে কম-বেশি সময়ের জন্যও হতে পারে। উভয়পক্ষ অর্থায়নকারীর প্রাপ্য মুনাফার আনুপাতিক হার নির্ধারণ করে নিবে। তবে অর্থায়নকারী ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ না করার কারণে মুনাফার হার তার মূলধনের চেয়ে অধিক না হতে হবে। মুশারাকার মেয়াদান্তে তরল এবং দ্রব্যগত সমুদয় সম্পদের পুনরায় মূল্য নির্ধারণ করে মুনাফা উক্ত মূল্যের ভিত্তিতে বণ্টন করে নেয়া হবে।

যদিও প্রাচীন পদ্ধতি অনুযায়ী মুনাফা ততক্ষণ পর্যন্ত নির্ধারণ করা যায় না, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবসার সমুদয় সম্পদকে তরল আকৃতিতে রূপান্তরিত করা না হবে। কিন্তু সম্পদের মূল্য নির্ধারণকে পারস্পরিক সন্তুষ্টিতে তরল আকৃতির মনে করা যেতে পারে। কেননা এরূপ করার ব্যাপারে শরীয়তে কোন নিষিদ্ধতা নেই। অথবা এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, সক্রিয় অংশিদার (Working Partner) ব্যবসার সম্পদে অর্থায়নকারীর অংশকে ক্রয় করে নিয়েছে, এবং তার অংশের মূল্য নির্ধারণ ব্যবসার সম্পদের মূল্য ধরে করা হয়েছে, এতে মুশারাকার শর্তানুযায়ী তার জন্য সাব্যস্তকৃত মুনাফার হারকেও সামনে রাখা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ- ‘A’ এর ব্যবসার সমুদয় সম্পদ ৩০ ইউনিট। ‘B’ আরাে ২০ ইউনিট অর্থায়ন করেছে। এতে করে ব্যবসার মােট সম্পদ হল ৫০ ইউনিট। শতকরা হিসেবে এই ব্যবসায় ৪০% ‘B’ -এর পক্ষ থেকে বিনিয়ােগ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৬০% ‘A’ -এর ছিল। উভয়পক্ষ এ সিদ্ধান্ত করল যে, ‘B’ প্রকত মুনাফার ২০% পাবে। মেয়াদান্তে ব্যবসার মােট সম্পদ হলাে ১০০ ইউনিট। এ পর্যায়ে ‘A’ যদি ‘B’ -এর অংশ ক্রয় করতে চায়, তাহলে ‘B’ ব্যবসার ৪০% মালিক হওয়ার কারণে ‘A’ ‘B’ কে ৩০ ইউনিটের মূল্য দিয়ে দিবে। তবে তার অংশের মূল্যে মুনাফার পূর্ব নির্ধারিত হারের বিপরীত হবে, মূল্য ধার্যের ফরমুলা ভিন্ন, ব্যবসার যে কোন মুনাফা উভয়পক্ষের মাঝে ২০% এবং ৮০% হারে বণ্টন হবে, যেহেতু মুনাফা বণ্টনের এই আনুপাতিক হার চুক্তিতে পূর্বেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।

আরো পড়তে পারেন:  ইসতিসনা কি ইসতিসনা এবং সালাম ও ইজারার মধ্যে পার্থক্য

ব্যবসার মূল্যে যেহেতু ৫০ ইউনিট লাভ হয়েছে। তাই এ ৫০ ইউনিট উভয়ের মাঝে ২০-৮০% হারে বণ্টন হবে। যার অর্থ এটা দাঁড়াবে যে, ‘B’ মুনাফার ১০ ইউনিট পেয়েছে, এ ১০ ইউনিটকে মূলধন ২০ ইউনিটের সাথে যােগ করা হলে তার অংশের মূল্য ৩০ ইউনিট দাঁড়াবে।

লােকসানের ক্ষেত্রে সম্পদের মূল্যে যে কোন ধরনের ঘাটতি তাদের বিনিয়ােগকৃত পুঁজির অনুপাতেই বণ্টন হবে। অর্থাৎ, ৪০% এবং ৬০% হারে লােকসান বহন করতে হবে। সুতরাং উল্লেখিত উদাহরণে ব্যবসার মূল্যে যদি ১০ ইউনিট ঘাটতি হয়, যার কারণে ৪০ ইউনিট অবশিষ্ট থাকে, তাহলে ৪ ইউনিটের লােকসান ‘B’ বহন করবে, (যা সমুদয় লােকসানের ৪০%)। এই ৪ ইউনিটকে তার বিনিয়ােগকৃত ২০ ইউনিট থেকে বিয়ােগ করা হলে ‘B’ -এর অংশের মূল্য দাঁড়াবে ১৬ ইউনিট। এই ফরমুলাটি ২ নং চিত্রে আরাে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হবে।

MUDARABA২। শুধু গ্রোস প্রফিটে (মােট লাভে) অংশীদারিত্ব:

যে ব্যবসায় স্থাবর সম্পদ (Fixed Assets) বেশি, সে ব্যবসায় উল্লেখিত নিয়মানুযায়ী মুশারাকা পদ্ধতিতে অর্থায়ন করা জটিল হতে পারে, বিশেষ করে চলতি শিল্প কারখানায়। কেননা, অংশীদারিত্বের সময় সমুদয় সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা এবং ব্যবসার মেয়াদান্তে সেগুলাের মূল্যে ঘাটতি ও বৃদ্ধি নির্ধারণ একাউন্টিং-এর দৃষ্টিতে জটিলতা এবং পরস্পরে দ্বন্দ-কলহের কারণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মুশারাকায় অন্য আরেকটি পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে।

এমতাবস্থায় পরােক্ষ খরচের হিসাব-নিকাশে বেশি জটিলতা দেখা দেয়। যেমন- মেশিনারী দ্রব্যের মূল্যে ঘাটতি, কর্মচারিদের বেতন-ভাতা ইত্যাদি। এ জটিলতা সমাধানের জন্য উভয়পক্ষ এ সিদ্ধান্তে একমত হতে পারে যে, নীট লাভ (Net Profit) -এর পরিবর্তে মােট লাভ (Gross Profit) বণ্টন হবে।

যার অর্থ এটা হবে যে, যাবতীয় পরােক্ষ খরচ শিল্পপতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বহন করবে। শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ খরচ (যেমন- কাঁচা মাল, সরাসরি কর্মচারি বেতন, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি) মুশারাকা বহন করবে। তবে শিল্পপতি যেহেতু স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীয় মেশিনারী, বিল্ডিং এবং কর্মচারি স্টাফ মুশারাকায় পেশ করে, এজন্য তাকে উপযুক্ত প্রতিদান দেওয়ার ব্যাপারে মুনাফায় তার আনুপাতিক অংশ অধিক ধার্য করা যেতে পারে।

উক্ত পদ্ধতিটি এ কারণেও যুক্তিসঙ্গত যে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের গ্রাহক (অর্থাৎ তাদের থেকে অর্থ গ্রহণকারী) সাধারণত নিজেকে ঐ উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না, যে উদ্দেশ্যের জন্য সে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। বরং তার মেশিনারী এবং কর্মচারি স্টাফ অন্যান্য এমন কাজেও লিপ্ত থাকে, যেগুলাের মুশারাকার সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। এ ক্ষেত্রে (মেশিনারী ইত্যাদির) এসব ব্যয় মুশারাকা থেকে প্রদান করা যায় না। একটি বাস্তব উদাহরণ যেমনএকটি তুলা ফ্যাক্টরীর একটি বিল্ডিং রয়েছে, যার মূল্য বাইশ মিলিয়ন টাকা, প্লন্ট এবং মেশিনারী দ্রব্যের মূল্য দুই মিলিয়ন এবং কর্মচারি স্টাফের মাসিক বেতন পঞ্চাশ হাজার পরিশােধ করা হয়। ফ্যাক্টরী একটি ব্যাংক থেকে এক বছরের মেয়াদে পঞ্চাশ লাখ (পাঁচ মিলিয়ন) টাকা মুশারাকার ভিত্তিতে ফিন্যান্সিং হিসেবে গ্রহণ করতে চায়, অর্থাৎ এক বছর পর মুশারাকা চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে এবং এক বছর পর্যন্ত অর্জিত মুনাফা উভয়পক্ষের মাঝে নির্ধারিত আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে। মুনাফা নির্ধারণের সময় যাবতীয় প্রত্যক্ষ খরচ (Direct Expenses) লাভ থেকে বাদ যাবে।

প্রত্যক্ষ খরচে নিম্নবর্ণিত ব্যয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত হয় :

১। কাঁচা মাল ক্রয়ে ব্যয়িত টাকা।

২। যেসব কর্মচারি কাঁচামাল উন্নয়নে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত তাদের বেতন।

৩। তুলার কাজে ব্যয়িত বিদ্যুৎ বিল।

৪। অন্যান্য সেবাসমূহের বিল যা প্রত্যক্ষভাবে মুশারাকাকে সরবরাহ করা হয়েছে।

এই বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, বিল্ডিং, মেশিনারী এবং কর্মচারিদের বেতনভাতা শুধুমাত্র মুশারাকা ব্যবসার জন্য নয়। কেননা, মুশারাকাতাে এক বছর পর শেষ হয়ে যাবে, অথচ বিল্ডিং-মেশিনারী দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্রয় করা হয়েছে। যে সময়ের মধ্যে তুলা ফ্যাক্টরী বিল্ডিংকে স্বীয় কারবারের জন্য ব্যবহার করতে থাকবে। যার এক বছর মুশারাকার সাথে কোন সম্পর্ক হবে না। এ কারণে বিল্ডিং এবং মেশিনারীর মূল্যের যাবতীয় ব্যয়ভার ঐ স্বল্প সময়ের মুশারাকার উপর দেয়া যায় না। বেশির চেয়ে বেশি এতটুকু করা যেতে পারে যে, মুশারাকা চলাকালীন সময়ে বিল্ডিং এবং মেশিনারীর ক্ষয়িতকে মুশারাকার খরচে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এই ক্ষয়িতের মূল্য নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন হবে এবং এ কারণে কলহ-কোন্দলও সৃষ্টি হতে পারে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য দু’টি পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে।

প্রথমত, উভয়পক্ষ এই সিদ্ধান্ত করবে যে, “মুশারাকা” গ্রাহককে (অর্থ গ্রহণকারী আসল মালিককে) মেশিনারী এবং বিল্ডিং ব্যবহার করার কারণে নির্ধারিত ভাড়া প্রদান করবে। মুশারাকার পক্ষ থেকে সে এই ভাড়া সর্বাবস্থায় পাবে, চাই ব্যবসায় লাভ হােক কিংবা লােকসান হােক । দ্বিতীয়ত, গ্রাহককে ভাড়া প্রদানের পরিবর্তে মুনাফায় তার আনুপাতিক হার বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে ‘সেবায় মুদারাবার উপর কিয়াস করে সঠিক সাব্যস্ত করা যেতে পারে, যা ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ.)-এর নিকট বৈধ।

(৩) দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে চলতি যৌথ একাউন্ট

অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোন কোন ব্যবসার ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অর্থায়ন এ পদ্ধতিতে করে যে, (আর্থিক প্রতিষ্ঠানে) উক্ত ব্যবসার জন্য একটি চলতি একাউন্ট খােলা হয়। যে একাউন্ট থেকে সে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করে। এমনিভাবে প্রয়ােজনাতিরিক্ত টাকা সে একাউন্টে পুনরায় জমাও দেয়। এভাবে উত্তোলন এবং জমা (Debit and Credit) এর কার্যক্রম মেয়াদ উত্তীর্ণ (Maturity) -এর তারিখ পর্যন্ত চলতে থাকে এবং সুদের হিসাব দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে (On the basis of daily products) করা হয়।

এ ধরনের পদ্ধতি মশারাকা এবং মদারাবার অর্থায়নে সম্ভব কি না। এ কথা সুস্পষ্ট যে, এটি একটি নতুন পদ্ধতি হওয়ার কারণে এ প্রশ্নের উত্তর সুস্পষ্টভাবে প্রাচীন ইসলামী গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায় না। এতদসত্ত্বেও মুশারাকার মৌলিক ধারণাকে সামনে রেখে এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য নিম্নবর্ণিত পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে।

(১) সার্ভিসের জন্য প্রকৃত মুনাফার একটি বিশেষ আনুপাতিক হার নির্ধারণ করতে হবে।

(২) মুনাফার অবশিষ্ট আনুপাতিক অংশ শুধুমাত্র পুঁজি বিনিয়ােগকারীর জন্য হতে হবে।

(৩) যদি কোন লােকসান হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র পুঁজি বিনিয়ােগকারীগণ তাদের পুঁজির অনুপাতে বহন করতে হবে।

(৪) যৌথ একাউন্টে অন্তর্ভুক্তকৃত টাকার স্থিতি গড় (যার হিসাব দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে করা হবে) অর্থায়নের শেয়ার ক্যাপিটাল ধরা হবে।

(৫) মেয়াদ শেষে অর্জিত মুনাফার হিসাব দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে করা হবে এবং সে অনুযায়ীই তা বণ্টন করা হবে। যদি এ ধরনের চুক্তি উভয়ের মাঝে সাব্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুশারাকার কোন বুনিয়াদি মূলনীতির পরিপন্থি বলে মনে হয় না। এতদসত্ত্বেও এই প্রক্রিয়ার ব্যাপারে অভিজ্ঞ ইসলামী ফিকহবিদদের আরাে অধিক গবেষণা এবং অনুসন্ধানের প্রয়ােজন রয়েছে। বাহ্যিক কার্যক্রমে এ কথা বুঝা যায় যে, উভয়পক্ষ এ নীতিমালায় একমত হয়েছে যে, মেয়াদান্তে যৌথ একাউন্টে অর্জিত মুনাফা দৈনিক ব্যবহৃত পুঁজির ভিত্তিতে বণ্টিত হবে। যার অর্থ এটা দাঁড়াবে যে, দৈনিক এক টাকায় অর্জিত মুনাফার গড় বের করে প্রতি দিনের প্রতি টাকার মুনাফার গড়কে তত দিনের সংখ্যার সাথে গুণ দেয়া হবে যত দিন প্রত্যেক পুঁজি বিনিয়ােগকারী স্বীয় অর্থ ব্যবসায় রেখেছে। যার ফলে বিনিয়ােগকারীর মুনাফায় পাওনাদার হওয়ার ফায়সালা দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে করা হবে।

সমকালীন কোন কোন আলিমগণ এ পদ্ধতিতে মুনাফা হিসাব করার অনুমতি প্রদান করেন না। এ ভিত্তিতে যে, এটা একটি আনুমানিক পদ্ধতি যা কোন অংশীদারের অর্জিত প্রকৃত মুনাফার প্রতিবিম্ব বর্ণনা করে না। কেননা, এমন হতে পারে যে, কোন এক সময় ব্যবসায় প্রচুর মুনাফা অর্জিত হয়েছে, যখন বিশেষ কোন পজি বিনিয়ােগকারীর কোন পুঁজি এ সময়ে ব্যবসায় বিনিয়ােগ-ই হয়নি বা হলেও তা ন্যূনতম ও অনুল্লেখযােগ্য পরিমাণ ছিল। অথচ তার সাথে অন্যান্য ঐ সকল পুঁজি বিনিয়ােগকারীদের ন্যায় লেনদেন করা হবে, যারা এ সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবসায় বিনিয়ােগ করেছিল। পক্ষান্তরে কোন সময় ব্যবসায় প্রচুর লােকসান হতে পারে, যখন একজন বিশেষ পুঁজি বিনিয়ােগকারী বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবসায় বিনিয়ােগ করেছিল, অথচ সে তার লােকসানের একটি অংশ অন্যান্য ঐ সকল পুঁজি বিনিয়ােগকারীদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যারা উক্ত সময়ে ব্যবসায় কোন অর্থ বিনিয়ােগ করেনি বা করলেও উল্লেখযােগ্য পরিমাণ ছিল না।

এ যুক্তির এই উত্তর দেয়া যেতে পারে যে, মুশারাকায় কোন অংশীদারের জন্য শুধুমাত্র তার বিনিয়ােগকৃত অর্থ দ্বারা অর্জিত মুনাফাই পেতে হবে তা জরুরী নয়। বরং মুশারাকা অস্তিত্বে আসার পর যৌথ একাউন্টে অর্জিত মুনাফা সকল অংশীদারগণ পাবে। এদিকে লক্ষ্য করা হবে না যে, তাদের অর্থ বিশেষ ব্যবসায় বিনিয়ােগ হয়েছে কি না। এ যুক্তিটি বিশেষভাবে ফিকহে হানাফীর উপর প্রযােজ্য হয়। ফিকহে হানাফী অনুযায়ী মুশারাকা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য অংশীদারদের অর্থের আকৃতিতে বিনিয়ােগকৃত পুঁজি পরস্পরে মিশ্রণ করে নেওয়া জরুরী নয়। তার অর্থ এটা দাঁড়াল যে, ক’ যদি ‘খ’ এর সাথে একটি মুশারাকা চুক্তিতে অন্তভুক্ত হয়, কিন্তু ‘ক’ এখনাে যৌথ একাউন্টে তার অর্থ জমা করেনি, তারপরও ‘খ’ এর অর্থ দ্বারা মুশারাকায় যে মুনাফা অর্জন হবে, তাতে ‘ক’ও তার অংশের পাওনাদার হবে। যদিও মুনাফায় তার অংশ পাওয়ার অধিকার লাভ হওয়াটা ঐ অর্থ পরিশােধের সাথে সম্পকৃত, যতটুকুর দায়িত্ব সে নিয়েছিল। তদুপরি এই বাস্তবতা বিদ্যমান যে, এই বিশেষ চুক্তির মুনাফা তার অর্থ থেকে অর্জিত হয়নি। কেননা, পরবর্তীতে ‘ক’ যখন তার অর্থ পরিশােধ করবে তাতাে অন্য কোন লেনদেনে ব্যবহৃত হবে। যেমন- ‘ক’ এবং ‘খ’ এক লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসা করার জন্য একটি মুশারাকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তারা উভয়ে এ সিদ্ধান্ত করল যে, প্রত্যেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা বিনিয়ােগ করবে এবং মুনাফা সমহারে বণ্টিত হবে । ‘ক’ এখনও তার পঞ্চাশ হাজার টাকা যৌথ একাউন্টে জমা করেনি, ইতিমধ্যে ‘খ’ একটি লাভজনক ব্যবসা দেখে নিজের পক্ষ থেকে বিনিয়ােগকৃত পঞ্চাশ হাজার টাকা দ্বারা মুশারাকার জন্য দু’টি এয়ার কন্ডিশনার ক্রয় করে ষাট হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। যাতে দশ হাজার টাকা মুনাফা অর্জন হয়েছে। ক’ তার অংশ পঞ্চাশ হাজার টাকা এই ব্যবসার পর যৌথ একাউন্টে জমা করেছে, তার পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে দু’টি রিফ্রিজারেটর ক্রয় করে আটচল্লিশ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে বিক্রি করা যাচ্ছে না, অর্থাৎ- এতে দু’হাজার টাকা লােকসান হয়েছে। যদিও ‘ক’-এর অর্থ দ্বারা কৃত ব্যবসায় দু’হাজার টাকা লােকসান হয়েছে, অথচ এয়ার কন্ডিশনারে মুনাফায় শুধুমাত্র ‘খ’-এর টাকা ব্যবহৃত হয়েছে, যাতে ক’-এর কোন অংশ ছিল না, তদুপরি ‘ক’ প্রথম (এয়ার কন্ডিশনারে) ব্যবসার মুনাফায় তার অংশের পাওনাদার হবে। দ্বিতীয় (রিফ্রিজারেটর) ব্যবসায় যে দু’হাজার টাকা লােকসান হয়েছে, তা প্রথম ব্যবসার মুনাফা থেকে বিয়ােগ করা হবে। ফলে মােট মুনাফা হবে আট হাজার টাকা। এই আট হাজার টাকা উভয়ের মাঝে সমহারে বণ্টিত হবে। অর্থাৎ ‘ক’ চার হাজার টাকা পাবে, যদিও তার অর্থ দ্বারা কৃত ব্যবসায় লােকসান হয়েছিল।

কারণ, যখন উভয়পক্ষ মুশারাকা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তখন মুশারাকার জন্য যে কোন চুক্তি হবে তা এই যৌথ একাউন্টের সাথে সম্বন্ধযুক্ত হবে। এদিকে দৃষ্টিপাত করা হবে না যে, এই ব্যবসায় কার অর্থ এককভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই মুশারাকা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে প্রত্যেকেই প্রত্যেক ব্যবসায় অংশীদার হবে।

উপরােল্লেখিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের উপর একটি সম্ভাব্য প্রশ্ন হতে পারে যে, উল্লেখিত উদাহরণে ‘ক’ পঞ্চাশ হাজার টাকা দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল, আর ব্যবসা শুরু করার পূর্বেই জানা ছিল যে, সে এত টাকা মুশারাকায় বিনিয়োেগ করবে। কিন্তু প্রচলিত মুশারাকার চলতি একাউন্ট যেখানে নতুন অংশীদার প্রতিদিন অন্তর্ভূক্ত হয় পুরাতন কেউ কেউ চলে যায়। এতে কোন অংশীদার নির্দিষ্ট পরিমাণ কোন অর্থ বিনিয়ােগ করার দায়িত্ব নিজের উপর নেয় না। সুতরাং মুশারাকায় অন্তর্ভুক্তির সময় প্রত্যেক পক্ষ থেকে বিনিয়ােগকৃত পুঁজি অনির্দিষ্ট থাকে। যার ফলে মুশারাকা সঠিক না হওয়া উচিত।

এ প্রশ্নের উত্তর হলাে, মুশারাকা সঠিক হওয়ার জন্য সমুদয় মূলধনের পরিমাণ সম্পর্কে অংশীদারদের পূর্ব থেকেই জানা থাকা জরুরী কি না, এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী ফিকহবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন ধরনের। হানাফী ফিকহবিদগণ এ ব্যাপারে একমত যে, মুশারাকা সঠিক হওয়ার জন্য তা শর্ত নয়। প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ আল্লামা কাসানী লিখেন-

‘আমাদের (হানাফীদের) নিকট শিরকাতুল আমওয়াল বৈধ হওয়ার জন্য এটা জরুরী নয় যে, চুক্তির সময় মূলধনের পরিমাণ জানা থাকতে হবে। তবে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর নিকট তা শর্ত,-। আমাদের প্রমাণ হল- অজ্ঞতা সত্তাগতভাবে চুক্তির বৈধতার জন্য প্রতিবন্ধক নয়। বরং এ কারণে প্রতিবন্ধক যে, এর দ্বারা ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টি হওয়ার কারণ হতে পারে। আর চুক্তির সময় মূলধন জানা না থাকা ঝগড়ার কারণ হয় না। কেননা, মূলধনের পরিমাণ সাধারণত মুশারাকার জন্য কোন দ্রব্য ক্রয় করার সময় পরিজ্ঞাত হয়ে যায়। সুতরাং বণ্টনের সময় মুনাফার পরিমাণে অজ্ঞতা সৃষ্টি হবে না।”

এ কথা সত্য যে, চলতি যৌথ একাউন্টের পদ্ধতি, যে একাউন্টে অংশীদারগণ যে কোন সময় যে কোন পরিমাণ টাকা উত্তোলন করতে পারে এবং যে কোন পরিমাণ টাকা জমা করতে পারে আর মুনাফা দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে বণ্টন হয়, এ পদ্ধতি ইসলামী ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায় না। তবে এ না পাওয়া যাওয়া কোন পদ্ধতিকে শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ সাব্যস্ত করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মুশারাকার বুনিয়াদী মূলনীতির পরিপন্থি না হবে। প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে সকল অংশীদারদের সাথে একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। প্রত্যেক অংশীদারদের মুনাফার হিসাব ঐ মেয়াদের ভিত্তিতে করা হয়, যতদিন তার অর্থ যৌথ একাউন্টে ছিল। নিঃসন্দেহে যৌথ একাউন্টে সামগ্রিকভাবে অর্জিত মুনাফা ঐ অর্থ যৌথভাবে ব্যবহার করার কারণে অর্জিত হয়েছে, যা অংশীদারগণ বিভিন্ন সময় জমা করেছিল। যদি সকল অংশীদার পারস্পরিক সন্তুষ্টিতে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নেয় যে, মুনাফা দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে বণ্টন হবে, তাহলে এমন কোন শরয়ী নিষেধাজ্ঞা নেই যা তাকে অবৈধ সাব্যস্ত করবে। বরং উল্টা এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐ মৌলিক হেদায়াতের সমর্থনই পাওয়া যায় যা পূর্বে কয়েকবার উল্লেখিত প্রসিদ্ধ হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে-

আরো পড়তে পারেন:  একাউন্ট থেকে আবগারি শুল্ক বছরে কত কাটা হয়

“মুসলমানদের পারস্পরিক চুক্তিসমূহ পালনীয়, যতক্ষণ পর্যন্ত এ চুক্তি হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল না করবে।” (আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৫৫)।

যদি দৈনিক উৎপাদনের ভিত্তিতে মুনাফা বণ্টন পদ্ধতিকে গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এর অর্থ হবে, কোন অংশীদার যৌথ একাউন্ট থেকে অর্থ উত্তোলনও করতে পারবে না এবং নতুন কোন গ্রাহক অর্থ জমাও করতে পারবে না। এমনিভাবে কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন করে কোন পুঁজি বিনিয়ােগ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন কোন নির্দিষ্ট তারিখ না আসবে। ব্যাংকের যে আমানতকারীগনের পক্ষ থেকে (Deposits Side) দৈনিক কয়েকবার অর্থ জমা দেয়া এবং উত্তোলন করা হয়, তাদের জন্য এ প্রক্রিয়া একেবারে অকার্যকর হয়ে যাবে। দৈনিক উৎপাদনের পদ্ধতিকে অস্বীকার করার দ্বারা এসব আমনতকারীগণ তাদের প্রয়ােজনাতিরিক্ত অর্থ কোন লাভজনক একাউন্টে জমা করার পূর্বে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়ে যাবে। এর দ্বারা শিল্প এবং ব্যবসার উন্নয়নের জন্য প্রয়ােজনাতিরিক্ত অর্থ ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদের জন্য অর্থায়ন বিভাগের কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। এ সমস্যার সমাধান দৈনিক উৎপাদনের পদ্ধতি অবলম্বন করা ব্যতীত সম্ভব নয়। যেহেতু এটা শরীয়তের কোন বিধানের পরিপন্থি নয়, সেহেতু এ পদ্ধতি অবলম্বন না করার কোন যৌক্তিকতা নেই।

যৌথ অর্থায়নের উপর কয়েকটি অভিযােগ 

এ পর্যায়ে আমরা ঐ সকল অভিযােগের নিরীক্ষা করব যা মুশারাকাকে অর্থায়নের পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করার বিরুদ্ধে বাস্তব দৃষ্টিতে উত্থাপন করা হয়।

(১) লােকসানের ঝুঁকি

একটি অভিযোেগ এই যে, মুশারাকা পদ্ধতি অবলম্বন করার ক্ষেত্রে ব্যবসার লােকসান অর্থায়নকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ধাবিত হওয়ার অধিক সম্ভাবনা রয়েছে। অতঃপর এই লােকসান সাধারণ আমানতকারীগণদের দিকে ধাবিত হবে। আমানতকারীগণকে যেহেতু স্থায়ীভাবে লােকসানের আশংকায় ফেলা হচ্ছে, সেহেতু তারা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাদের অর্থ জমা রাখতে অনুৎসাহী হয়ে যাবে। যার ফলে এ প্রয়ােজনাতিরিক্ত অর্থ হয়ত নিষ্ক্রিয় ও শ্লথ হয়ে যাবে, অথবা ব্যাংকিং পদ্ধতি ভিন্ন অন্য কোন পন্থায় ব্যবহৃত হবে। এভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ অর্থসমূহের কোন ভূমিকাই থাকবে না। কিন্তু এ অভিযােগের ভিত্তি ভুল বুঝাবুঝির উপর। মুশারাকার ভিত্তিতে অর্থায়ন করার পূর্বে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঐ প্রস্তাবিত ব্যবসার সম্ভাব্যতা (Feasibility) যাচাই করে নিবে, যার জন্য ফান্ড প্রয়ােজন। এমনকি বর্তমান সুদি ব্যাংকিং পদ্ধতিতেও ব্যাংক প্রত্যেক আবেদনকারীর ঋণ মঞ্জুর করে না। বরং তারা ব্যবসার সম্ভাব্যতা যাচাই করে নেয়। যদি তাদের আশংকা হয় যে, এই ব্যবসা লাভজনক নয়, তাহলে তারা ঋণ প্রদান করতে অস্বীকার করে। মুশারাকার ক্ষেত্রে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সম্ভাব্যতা অত্যন্ত গভীরভাবে এবং সতর্কতার সাথে যাচাই করে নিবে।

অধিকন্তু কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেকে শুধুমাত্র একটি মুশারাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে পারে না। বরং তাদের বিভিন্ন রকমের মুশারাকা থাকবে। যদি কোন ব্যাংক তার গ্রাহকদের (Clients) থেকে একশ’ গ্রাহকের সাথে মুশারাকার ভিত্তিতে অর্থায়ন করে এবং এ অর্থায়নও ব্যাংক তাদের প্রত্যেকের প্রস্তাবিত ব্যবসার সম্ভাব্যতা যাচাই করে করে তাহলে এ ধারণা করা অত্যন্ত দুষ্কর যে, তাদের প্রত্যেকেই বা অধিকাংশ গ্রাহক লােকসানে পতিত হবে। প্রয়ােজনীয় পদক্ষেপ এবং পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বনের পর বেশির চেয়ে বেশি এতটুকু হতে পারে যে, তাদের কারাে কারাে ব্যবসায় লােকসান হয়ে যাবে। কিন্তু অপরদিকে লাভজনক মুশারাকা ব্যবসায় সুদি ঋণের তুলনায় অধিক মুনাফার আশা করা যায়। কেননা প্রকৃত মুনাফা ব্যাংক এবং গ্রাহকের (Client) মাঝে বণ্টন হবে। এ কারণে মুশারাকার সকল সেক্টরে লােকসানের আশংকা করা যায় না। আর । সামগ্রিকভাবে লােকসানের সম্ভাবনা শুধুমাত্র কাল্পনিক বিষয়, যা আমানতকারীগণকে অনুৎসাহী করবে না। কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের কাল্পনিক সম্ভাব্যতা কোন জয়েন্ট স্টক কোম্পানীতে লােকসানের সম্ভাব্যতা থেকে অনেক কম, যার ব্যবসা একটি সীমিত সেক্টরে সীমাবদ্ধ থাকে। এতদসত্ত্বেও মানুষ তার শেয়ার ক্রয় করে এবং লােকসানের এ সম্ভাব্যতা তাদেরকে ঐ শেয়ারে পুঁজি বিনিয়ােগ করা থেকে বিরত রাখে। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ব্যবস্থাপনা জয়েন্ট স্টক কোম্পানীর তুলনায় যথেষ্ট সুদৃঢ় ও সুসংগঠিত। কেননা তাদের মুশারাকা ব্যবসা বিভিন্ন প্রকার হবে যে, প্রত্যেক মুশারাকায় সম্ভাব্য লােকসানের ক্ষতিপূরণ অন্যান্য মুশারাকা ব্যবসায় অর্জিত মুনাফা দ্বারা হয়ে যাবে।

এ ছাড়া ইসলামী অর্থনীতির ক্ষেত্রে এমন মন-মানসিকতা সৃষ্টি করা। উচিত যার দ্বারা এ বিশ্বাস করা যায় যে, বিনিয়ােগকৃত অর্থ দ্বারা অর্জিত যে কোন মুনাফা ব্যবসার ঝুঁকি গ্রহণ করার প্রতিদান। অভিজ্ঞতা এবং ব্যবসার। সকল সেক্টরের পরিধি বিস্তৃত করে এ ঝুঁকি এত কমানাে যায় যে, তা একেবারে কাল্পনিক হিসেবে থেকে যাবে। তবে এ ঝুঁকি একেবারে দূর করার কোন পন্থা বা উপায় নেই। যে কেউ মুনাফা অর্জন করতে চায়, তাকে এ ধরনের সাধারণ ঝুঁকি অবশ্যই বহন করতে হবে। সাধারণ জয়েন্ট। স্টক কোম্পানীতেও এ ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, অথচ কখনাে কেউ এ ধরনের অভিযােগ করেনি যে, শেয়ার হােল্ডারের অর্থ লােকসানে ফেলে দিয়েছে। এ সমস্যা প্রচলিত ব্যাংকিং ও অর্থায়ন পদ্ধতির সৃষ্টি, যা ব্যাংকিং এবং অর্থায়নের কর্মতৎপরতাকে সাধারণ ব্যবসায়িক কর্মতৎপরতা থেকে আলাদা করে দিয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতি মানুষদেরকে এ কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র মুদ্রা এবং মুদ্রার দলীল দস্তাবেজের ব্যবসা করতে পারে, তাদের শিল্প এবং ব্যবসাবাণিজ্যের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। যার কারণে তারা সর্বাবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা পাওয়ার দাবী করে। অর্থায়ন খাত (SECTOR) এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের মাঝে এই ভিন্নতা সামষ্টিক অর্থনীতিতে (MACRO ECONOMICS) মারাত্মক ক্ষতি সাধন করেছে। একথা সুস্পষ্ট যে, ইসলামী ব্যাংকিং-এর আলােচনা দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য অবশ্যই এটা নয় যে, ইসলামী ব্যাংক প্রত্যেক ক্ষেত্রে আধুনিক ব্যাংকের অনুসরণ করবে। ইসলামের নিজস্ব রূপ ও নীতিমালা রয়েছে যা অর্থায়নকে শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে ভিন্ন মনে করে না। যখন এই ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা বুঝে আসবে, তখন লােকসানের কাল্পনিক আশংকা থাকা সত্ত্বেও মানুষ লাভজনক কোম্পানীতে যে আগ্রহ ও উৎসাহের সাথে পুঁজি বিনিয়ােগ করে, এর চেয়ে অধিক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ইসলামী অর্থায়ন সেক্টরে (Financing Sector) পুঁজি বিনিয়ােগ করবে।

(২) দীনদারী না থাকা

মুশারাকা অর্থায়নের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযােগ এই উত্থাপন করা হয় যে, বদদীন গ্রাহক মুশারাকার এই পদ্ধতিকে অবৈধভাবে ব্যবহার করবে এবং অর্থায়নকারীকে কোন মুনাফা প্রদান করবে না। সে সর্বদা। এটাই দেখাবে যে, ব্যবসায় কোন মুনাফা অর্জিত হয়নি। বরং হাক্বীকৃত হল সে এই দাবীও করতে পারে যে, ব্যবসায় লােকসান হয়েছে। যার ফলে লাভতাে দূরের কথা আসল পুঁজি ফিরে পাওয়াও আশংকাজনক হয়ে পড়বে। নিঃসন্দেহে এটি একটি যথার্থ আশংকা। বিশেষ করে যে সমাজে চুরি ডাকাতি নিত্য-নৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে এ সমস্যার সমাধান এত জটিলও নয় যা সাধারণত প্রচার করা হয় কিংবা বাড়িয়ে বর্ণনা করা হয়।

যদি কোন দেশের সকল তফসিলী ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাষ্ট্রের পূর্ণ সহায়তায় ইসলামী পদ্ধতি অনুযায়ী চালানাে যায়, তাহলে বদদীনীর সমস্যার সমাধান জটিল হবে না। সর্বপ্রথম কথা এই যে, গ্রাহকদের হিসাব-নিকাশ রাখার জন্য উত্তম পদ্ধতিতে ডিজাইনকৃত অডিট সিস্টেম চালু করতে হবে এবং তা যথাযথভাবে কনট্রোল করতে হবে। এব্যাপারে ইতিপূর্বে আলােচনা করা হয়েছে যে, মুনাফার নির্ধারণ শুধুমাত্র গ্রোস প্রফিটের ভিত্তিতে করা হবে। এর দ্বারা দ্বন্দ্ব-কলহ এবং ঘুষের প্রবণতা হ্রাস পাবে। এরপরও গ্রাহকের পক্ষ থেকে যদি কোনরূপ বদদীনী, অনিয়ম বা উদাসীনতা পাওয়া যায়, তাহলে তাকে সতর্কতামূলক শাস্তির সম্মুখীন করা হবে এবং তাকে দেশের যে কোন ব্যাংক থেকে যে কোন ধরণের সুযােগসুবিধা গ্রহণ করার ব্যাপারে কমপক্ষে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বঞ্চিতও করা যেতে পারে। এই পদক্ষেপ প্রকৃত মুনাফা গােপন বা অন্য যে কোন বদদীনী পন্থা অবলম্বনের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধক হিসেবে প্রমানিত হবে। অধিকন্তু ব্যাংকের গ্রাহকগণ স্বাধীনভাবে লােকসান দেখানােরও সাহস পাবে না। কেননা, লােকসান দেখানাের বিভিন্নভাবে তাদের স্বার্থের পরিপন্থি হবে। একথা সত্য যে, উপরােল্লিখিত কৌশল অবলম্বন করা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে, যে পরিস্থিতিতে কোন কোন গ্রাহক তার অসৎ উদ্দেশ্যে সফল হয়ে যেতে পারে। তবে শাস্তির পদক্ষেপ এবং ব্যবসার সাধারণ পরিবেশ এ ধরণের সুযােগ হ্রাস করে দিবে। (স্বয়ং সুদি অর্থনীতিতেও ঋণ খেলাফী ব্যক্তি ঋনকে উসূলের অযােগ্য করে (Bad Debts) জটিলতা সৃষ্টি করতে থাকে) কোন কোন গ্রাহকের অসৎ উদ্দেশ্য সফল হওয়া মুশারাকার পূর্ণ সিষ্টেমকে অস্বীকার করার যুক্তি সঙ্গত কারণ বা ওজর হতে পারে না।

নিঃসন্দেহে বদদীনীর এই আশংকা ঐ সব ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক বেশি রয়েছে যারা আধুনিক ব্যাংকের সাধারণ কার্যক্রম থেকে পৃথক হয়ে কাজ পরিচালনা করে। তাদের প্রতি দেশীয় প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তেমন কোন সহযােগিতা থাকে না। ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান তারা তাদের সিস্টেমও পরিবর্তন করতে পারে না এবং বিধি-বিধানও অমান্য করতে পারে না। কিন্তু তাদের একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, তারা শুধুমাত্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান-ই নয়, বরং তারা এমন একটি সিস্টেমকে পরিচিত করানাের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যার নিজস্ব একটি দর্শন রয়েছে। তাদের দায়িত্ব হল, এই পদ্ধতিকে অগ্রসর করানাে যদিও এর কারণে কোন এক পর্যায়ে তাদের মুনাফার হার স্বল্প হওয়ার আশংকা থাকে। এ জন্য তাদের কমপক্ষে কয়েকটি নির্বাচিত নীতিমালার উপর ভিত্তি করে মুশারাকার ব্যবহার শুরু করা উচিত। প্রত্যেক ব্যাংকের অবশ্যই এমন কিছু গ্রাহক থাকে যাদের ঈমানদারী সন্দেহ-সংশয়ের ঊর্ধ্বে থাকে। ইসলামী ব্যাংকসমূহের কমপক্ষে ঐ সকল গ্রাহকদের সাথে অর্থায়ন সহীহ মুশারাকার ভিত্তিতে করা উচিত। এর দ্বারা সমাজে উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপনে সহায়ক হবে এবং অন্যরা তাদের অনুসরণের ব্যাপারে উৎসাহী হবে। অধিকন্তু এমন কিছু সেক্টরও রয়েছে, যেখানে মুশারাকার ভিত্তিতে অর্থায়ন অতীব সহজতার সাথে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এক্সপাের্ট ফিন্যান্সিং (রপ্তানির অর্থায়ন)-এ মুশারাকাকে ব্যবহার করা হলে বদদীনীর তেমন কোন সুযােগ থাকে না। কেননা, রপ্তানিকারকের নিকট বিদেশের গ্রাহকের একটি নির্দিষ্ট অর্ডার বিদ্যমান থাকে। মূল্য নির্ধারিত থাকে। ব্যয়ের আন্দাজ করাতেও কোন জটিলতা নেই। মূল্য পরিশােধে সাধারণত এলসির কারণে অনিয়ম হয় না। মূল্য পরিশােধ স্বয়ং ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়। এমতাবস্থায় মুশারাকা পদ্ধতি অবলম্বন করাতে কোন অসুবিধা নেই। অনুরূপভাবে কিছু সতর্কতার সাথে ইমপাের্ট ফিন্যান্সিং (আমদানীর অর্থায়ন)ও মুশারাকার ভিত্তিতে হতে পারে। যা এ অনুচ্ছেদের প্রারম্ভে বর্ণনা করা হয়েছে।

(৩) ব্যবসার গােপনীয়তা

মুশারাকার উপর আরেকটি অভিযােগ এটা করা হয় যে, অর্থায়নকারী (Financier) কে গ্রাহকের ব্যবসায় অংশীদার বানানাের দ্বারা ব্যবসার গােপনীয়তা তার (অর্থায়নকারীর) নিকট এবং তার মাধ্যমে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের নিকট ফাঁস হয়ে যাবে।

কিন্তু এর সমাধান অত্যন্ত সহজ। মুশারাকায় অন্তর্ভুক্তির সময় গ্রাহক (Client) এ শর্তারােপ করতে পারে যে, অর্থসংস্থানকারী (Financier) ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না এবং সে ব্যবসার কোন ধরনের তথ্য কোন ব্যক্তিকে গ্রাহকের অনুমতি ব্যতীত পরিবেশন করবে না। গােপনীয়তা ঠিক রাখার এ ধরনের চুক্তিকে মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান সম্মান করে। বিশেষত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাদের সমুদয় ব্যবসা-ই গােপনীয়তার ভিত্তিতে হয়ে থাকে।

(৪) গ্রাহকের মুনাফায় অংশীদারিত্বের ব্যাপারে উৎসাহী না হওয়া

কখনাে কখনাে এ কথা বলা হয় যে, গ্রাহক ব্যাংকসমূহের সাথে প্রকৃত মুনাফায় অংশীদার হতে চায় না, এই নিরুৎসাহিতার ভিত্তি দুটি জিনিসের উপর।

(১) গ্রাহক মনে করে প্রকৃত মুনাফা, যা প্রচুর পরিমাণেও হতে পারে, তাতে ব্যাংক অংশীদারিত্বের কোন অধিকার রাখে না। কেননা, ব্যবসার

ব্যবস্থাপনা এবং তা পরিচালনায় ব্যাংকের কোন ভূমিকা থাকে না। তাহলে গ্রাহক তার পরিশ্রমের উপার্জিত মুনাফায় ব্যাংকসমূহকে কেন অংশীদার করবে যারা শুধুমাত্র ফান্ড সরবরাহ করে। গ্রাহক এই যুক্তিও প্রদান করে যে, আধুনিক ব্যাংক কিঞ্চিৎ সুদের হারে ঋণ প্রদান করতে রাজি হয়ে যায়, ইসলামী ব্যাংকসমূহেরও এরূপ করা উচিত।

(২) এ ছাড়া গ্রাহক এ ব্যাপারেও ভীতিপ্রদ থাকে যে, তার প্রকৃত মুনাফার পরিমাণ সম্পর্কে ব্যাংকের অবগতি হয়ে যাবে এবং তাদের মাধ্যমে এ তথ্য ইনকাম ট্যাক্সের কর্মকর্তাদের নিকট পৌছে যাবে, যার ফলে গ্রাহকের ইনকাম ট্যাক্সের হার বেড়ে যাবে।

প্রথম সমস্যার সমাধান যদিও সহজ নয়, তবে খুব জটিল এবং অসম্ভবও নয়। এ ধরনের গ্রাহকদেরকে এ কথা বুঝানাের চেষ্টা করা উচিত যে, কোনরূপ বাধ্য-বাধকতা ব্যতীত সুদি ঋণ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুনাহ ও পাপের কাজ। শুধুমাত্র ব্যবসাকে বৃহদায়তন ও প্রশস্ত করা কোন ক্রমেই মারাত্মক প্রয়ােজনের অন্তর্ভুক্ত নয়। মুশারাকার মাধ্যমে স্বীয় ব্যবসার জন্য বৈধ ফান্ডের সরবরাহের ব্যবস্থা করে সে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিই অর্জন করবে না বরং নিজের জন্য এবং ইসলামী ব্যাংক-এর জন্য মুনাফাকেও হালাল করবে।

দ্বিতীয় সমস্যার ব্যাপারে এ কথা বলা যেতে পারে যে, কোন কোন মুসলিম দেশে ইনকাম ট্যাক্সের হার অবৈধ এবং ন্যায়সঙ্গত নয়। ইসলামী ব্যাংকসমূহ এবং তাদের সকল গ্রাহকদের উচিত প্রশাসনকে বুঝানাের চেষ্টা করা এবং ঐসব নীতিমালা পরিবর্তনের ব্যাপারে মেহনত-প্রচেষ্টা করা যা ইসলামী ব্যাংকের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। প্রশাসনেরও এ বিষয়টি বুঝা উচিত যে, ইনকাম ট্যাক্সের হার যদি যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত হয়, তাহলে রাজস্ব আয় কমবে না বরং বৃদ্ধি হবে এবং ট্যাক্স উসূলকারীদেরও বুঝাতে হবে যে, সততার সাথে ট্যাক্স আদায়ে তাদেরও লাভ রয়েছে।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *