বাই সালাম কী বিস্তারিত আলোচনা

শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন ক্রয়-বিক্রয় বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য মৌলিক শর্তসমূহ থেকে একটি শর্ত হল, যে জিনিস বিক্রির ইচ্ছা করা হবে তা বিক্রেতার প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ কব্জায় থাকতে হবে। এ শর্তে তিনটি বিষয় পাওয়া যায়।

(১) সে জিনিস বিদ্যমান হতে হবে। সুতরাং এমন জিনিস যা এখনাে অস্তিত্বে আসেনি তা বিক্রি করতে পারবে না।

(২) বিক্রির জিনিসে বিক্রেতার মালিকানা প্রতিষ্ঠা হতে হবে। সুতরাং যে জিনিস বিদ্যমান কিন্তু বিক্রেতা তার মালিক নয়, তাহলে সে তা বিক্রি করতে পারবে না।

(৩) শুধুমাত্র মালিকানাই যথেষ্ট নয়, বরং তা বিক্রেতার প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষ কব্জায়  থাকতে হবে। সুতরাং বিক্রেতা যদি সেই জিনিসের মালিক হয়, কিন্তু তা স্বয়ং কিংবা স্বীয় উকিলের মাধ্যমে কজা করেনি, তাহলে সে তা বিক্রি করতে পারবে না। শরীয়তের এই ব্যাপক নীতিমালা থেকে শুধুমাত্র দু’টি পদ্ধতি ব্যতিক্রম। প্রথমটি হল, সালাম। দ্বিতীয়টি হল ইসতিসনা। উভয়টি বিশেষ প্রকারের ক্রয়-বিক্রয়। এই অধ্যায়ে এগুলাের পদ্ধতি এবং ব্যবহারের পরিধি সম্পর্কে আলােচনা করা হবে।

বাই সালামের কাকে বলে

“বাই সালাম” এমন একটি ক্রয়-বিক্রি যার মাধ্যমে বিক্রেতা এই দায়িত্ব গ্রহণ করে যে, সে ভবিষ্যতের কোন একটি তারিখে নির্দিষ্ট জিনিস ক্রেতাকে সরবরাহ করবে এবং তার বিনিময়ে পূর্ণমূল্য বিক্রির সময়ই অগ্রিম নিয়ে নেয়।

এখানে মূল্য নগদ কিন্তু পণ্য (বিক্রিতব্য জিনিস) পরিশােধে বিলম্বিত হয়। ক্রেতাকে “রাব্দুস সলম”, বিক্রেতাকে “মুসলাম ইলাইহি” এবং ক্রয়কৃত জিনিসকে “মুসলাম ফীহ” বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ কতগুলাে শর্তসাপেক্ষে বাই সালাম চুক্তির অনুমতি দিয়েছেন। এই ক্রয়-বিক্রয়ের মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রয়ােজন পূরণ করা। যাদের ফসল উৎপাদন এবং ফসল কাটা পর্যন্ত তাদের বিবি-বাচ্চাদের ভরণ-পােষণের জন্য অর্থের প্রয়ােজন হয়। সুদের নিষিদ্ধতার পর তারা সুদি ঋণ গ্রহণ করতে পারছিল। এজন্য তাদেরকে তাদের কৃষিজাত পণ্য অগ্রিম মূল্যে বিক্রির অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

ব্যাংক একাউন্ট

এমনিভাবে আরব ব্যবসায়ীগণ অন্য শহরে বিভিন্ন মালামাল রপ্তানি করত এবং সেখান থেকে নিজের শহরে বিভিন্ন মালামাল আমদানি করত। এ উদ্দেশ্যের জন্য তাদের অর্থের প্রয়ােজন হত, সুদের নিষিদ্ধতার পর তারা সুদি ঋণ গ্রহণ করতে পারত না। এজন্য তাদের অগ্রিম মূল্যে পণ্য বিক্রির অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। নগদ মূল্য গ্রহণ করে তারা তাদের উল্লেখিত কারবার সহজেই চালু রাখতে পারত।

বাই সালাম দ্বারা বিক্রেতারও উপকার হয়। কেননা, সে মূল্য অগ্রিম পেয়ে যায়। এবং ক্রেতারও উপকার হয়। কেননা, সালামে মূল্য সাধারণত নগদ মূল্য অপেক্ষা কম হয়।

বাই সালামের অনুমতি সেই সাধারণ নিয়ম-নীতি থেকে একটি ব্যতিক্রম ক্রয়-বিক্রয়, যে নিয়ম-নীতি অনুযায়ী ভবিষ্যতের দিকে সম্পৃক্ত ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি জায়েয নেই। বাই সালামের অনুমতি কয়েকটি কঠিন শর্তের সাথে শর্তযুক্ত। সেসব শর্তসমূহ নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

সালামের শর্ত

(১) বাই সালাম জায়েয হওয়ার জন্য জরুরী হল, ক্রেতা চুক্তির সময় পরিপূর্ণ মূল্য পরিশােধ করে দিতে হবে। কেননা, চুক্তির সময় ক্রেতা যদি পরিপূর্ণ মূল্য পরিশােধ না করে, তাহলে তা ঋণের বিনিময়ে ঋণ বিক্রির সাদৃশ্য হয়ে যাবে। যা করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। এছাড়া সালামের বৈধতার মৌলিক রহস্য হল বিক্রেতার তাৎক্ষণিক প্রয়ােজন পূরণ করা। যদি অগ্রিম মূল্য তাকে পরিপূর্ণভাবে পরিশােধ করা না হয়, তাহলে চুক্তির মৌলিক উদ্দেশ্যই শেষ হয়ে যাবে।

এজন্য সকল ফিকহবিদ এব্যাপারে একমত যে, সালামে মূল্য পরিপূর্ণরূপে (অগ্রিম পরিশােধ করতে হবে। তবে ইমাম মালিক (রহ.)এর মাযহাব হল, বিক্রেতা ক্রেতাকে দু’বা তিন দিনের সুযােগ দিতে পারবে, কিন্তু এই সুযােগ চুক্তির নিয়মতান্ত্রিক অংশ হতে পারবে না।

(২) বাই সালাম শুধুমাত্র সেই সব পণ্যে হতে পারে যে সব পণ্যের কোয়ালিটি-(গুণগত মান) এবং পরিমাণ পূর্বেই পরিপূর্ণরূপে নির্ধারণ করা যায়। সুতরাং এমন জিনিস যেগুলাের কোয়ালিটি এবং পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না, সেগুলাে “সালামের মাধ্যমে বিক্রি করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ মূল্যবান পাথর সালামের ভিত্তিতে বিক্রি করা যাবে না। কেননা, সেগুলাের প্রতিটি টুকরা সাধারণত অন্যটির তুলনায় গুণগতমান, সাইজ এবং ওজনের দিক থেকে ভিন্নরূপ হয় এবং সাধারণত তা বর্ণনার মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব হয় না।

(৩) কোন নির্দিষ্ট জিনিস কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেত কিংবা ফার্মের উৎপাদনে বাই সালাম হবে না। যেমন- বিক্রেতা এই দায়িত্ব গ্রহণ করল যে, সে নির্দিষ্ট ক্ষেতের গম কিংবা নির্দিষ্ট গাছের ফল সরবরাহ করবে, তাহলে এই বাই সালাম সঠিক হবে না। কেননা, পরিশােধের পূর্বেই সেই ক্ষেতের ফসল কিংবা সেই গাছের ফল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনার কারণে বিক্রিত দ্রব্য পরিশােধ অনিশ্চিত হয়ে যাবে। এই বিধান প্রত্যেক ঐ দ্রব্যের ব্যাপারে প্রযােজ্য হবে যার সরবরাহ অনিশ্চিত হবে।

আরো পড়তে পারেন:  ঘরে বসে অনলাইনে ব্যাংক একাউন্ট খোলা

(৪) যে দ্রব্যে সলাম করার ইচ্ছা করবে, তার ধরন এবং গুণগত মান সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে নেয়াও অপিরহার্য। যাতে সেই দ্রব্যে এমন কোন অস্পষ্টতা বিদ্যমান না থাকে যা পরবর্তীতে কলহ-কোন্দলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসংগে সম্ভাব্য সকল বিষয় বিশদভাবে উল্লেখ থাকা উচিত।

(৫) কোন রকম অস্পষ্টতা ব্যতীত বিক্রিতব্য দ্রব্যের পরিমাণও নির্দিষ্ট করে নেয়া অপরিহার্য। দ্রব্যের পরিমাণ যদি ব্যবসায়ীদের ওরফে ওজনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয় (অর্থাৎ সে জিনিস পাল্লা দিয়ে মেপে বিক্রি করা হয়) তাহলে তার ওজন নির্দিষ্ট হওয়া অপরিহার্য। আর যদি তার পরিমাণ টুকরি দিয়ে মেপে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তার নির্দিষ্ট পরিমাণ টুকরি জানা থাকতে হবে। যে জিনিস সাধারণত পাল্লা দিয়ে মাপা হয়, তার পরিমাণ টুকরি দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না (সালামের ক্ষেত্রে)। এমনিভাবে টুকরি দিয়ে মাপার দ্রব্যের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে নির্ধারণ না হতে হবে।

(৬) বিক্রিত জিনিসের পরিশােধের তারিখ এবং স্থানও চুক্তিতে নির্ধারণ হতে হবে।

(৭) বাইয়ে সালাম এমন দ্রব্যে করা যাবে না, যেগুলাে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশােধ করা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ যদি রূপার বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করা হয়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে উভয়টি একই সময়ই পরিশােধ করা অপরিহার্য। এখানে বাইয়ে সালাম কার্যকরী হবে। এমনিভাবে যদি যবের বিনিময়ে গম বিক্রি করা হয়, তাহলে বিক্রি সঠিক হওয়ার জন্য উভয়টির কজা একই সময় হওয়া অপরিহার্য। এ কারণে এক্ষেত্রে সালাম-চুক্তি জায়েয নেই।

সকল ফিক্হবিদ এ ব্যাপারে একমত যে, বাই সালাম ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এই শর্তসমূহ পরিপূর্ণভাবে পূরণ না করা হবে। কেননা, এই শর্তসমূহের ভিত্তি একটি সুস্পষ্ট হাদীসের উপর। এ প্রসংগে একটি প্রসিদ্ধ হাদীস হল :

“যে ব্যক্তি বাই সালাম করতে চায় সে যেন নির্দিষ্ট পরিমাপ যন্ত্র এবং ওজনে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বাই সালাম করে।”

তবে উল্লেখিত শর্ত ছাড়াও আরাে কিছু শর্ত রয়েছে, যেগুলাের ব্যাপারে বিভিন্ন ফকীহদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে। নিম্নে সেসব শর্তের ব্যাপারে আলােচনা করা হচ্ছে।

(১) ফিক্হ হানাফী অনুযায়ী যে জিনিসে বাইয়ে সালাম হচ্ছে, সে জিনিস চুক্তির তারিখ হতে পরিশােধের তারিখ পর্যন্ত মার্কেটে পাওয়া যাওয়া অপরিহার্য। সুতরাং বাই সালাম চুক্তির সময় যদি ঐ জিনিস মার্কেটে না পাওয়া যায়, তাহলে তার বাইয়ে সালাম করা যাবে না। যদিও আশা করা যায় যে, পরিশােধের সময় তা মার্কেটে পাওয়া যাবে।

কিন্তু ফিকহ শাফেয়ী, মালেকী এবং হাম্বলীর দৃষ্টিভঙ্গী হল, বাই সালাম সঠিক হওয়ার জন্য চুক্তির সময় সেই জিনিস পাওয়া যাওয়া শর্ত নয় । তাদের নিকট অপরিহার্য হল, সেই জিনিস পরিশােধের সময় পাওয়া যেতে হবে। বর্তমান যুগে এই দৃষ্টিভঙ্গীর উপর আমল করা যেতে পারে।

(২) ফিক্হ হানাফী এবং ফিক্হ হাম্বলীর দৃষ্টিতে কজার মেয়াদ চুক্তির সময় থেকে কমপক্ষে এক মাস হওয়া অপরিহার্য। যদি কজার সময় এক মাসের কম ধার্য করা হয়, তাহলে বাই সালাম সঠিক হবে না। তাদের প্রমাণ হল, সালামের অনুমতি ক্ষুদ্র কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের প্রয়ােজন পূরণের জন্য দেয়া হয়েছে, সুতরাং দ্রব্য প্রস্তুত করার জন্য তাদের উপযুক্ত সময় পেতে হবে। এক মাস সময়ের পূর্বে সেই দ্রব্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না, এছাড়া সালামে নগদ সওদা অপেক্ষা মূল্য কম হয়, মূল্যে এই সুযােগ তখনই ন্যায়সঙ্গত হবে যখন এই দ্রব্য এতদিন পরে পরিশােধ করা হবে, যত দিন পর পরিশােধ করলে মূল্যে যুক্তিসঙ্গত প্রভাব পড়তে পারে। এক মাসের কম সময়ে সাধারণত মূল্যে তেমন কোন প্রভাব পড়ে না। সুতরাং দ্রব্য পরিশােধের সময় কমপক্ষে এক মাসের কম না হওয়া উচিত ।

ইমাম মালেক (রহ.) এতটুকুর ব্যাপারে একমত পােষণ করেন যে, বাই সালাম চুক্তির জন্য কমপক্ষে একটি সময় হওয়া উচিত। কিন্তু তার মতে এই সময় পনের দিনের কম না হতে হবে। কেননা, বাজারদর দু’সপ্তাহ পর পর পরিবর্তন হতে পারে।

আরো পড়তে পারেন:  মুদারাবা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে (কমপক্ষে একটি সময় শরীয়তের দৃষ্টিতে নির্ধারিত) অন্যান্য ফকীহগণ যেমন ইমাম শাফেয়ী এবং কোন কোন হানাফী ফকীহ একমত পােষণ করেননি। তাঁরা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাই সালাম সঠিক হওয়ার জন্য কমপক্ষে একটি সময় নির্দিষ্ট করেননি। হাদীস অনুযায়ী শর্ত শুধু এতটুকু যে, কজার সময় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে হবে। সুতরাং শূনতম কোন সময় বর্ণনা করা যাবে না। উভয়পক্ষ পারস্পরিক সম্মতিতে কার যে কোন তারিখ নির্দিষ্ট করতে পারবে।

বর্তমান যুগে এই দৃষ্টিভঙ্গী প্রাধান্য পাওয়ার উপযুক্ত মনে হয়। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যূনতম কোন সময় নির্দিষ্ট করেননি। ফকীহগণ বিভিন্ন সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যা একদিন থেকে এক মাস পর্যন্ত রয়েছে। একথা সুস্পষ্ট যে, ফকীহগণ এই সময় গরীব বিক্রেতার সুযােগ-সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রয়ােজন অনুযায়ী ধার্য করেছেন। কিন্তু এই প্রয়ােজন সময় এবং স্থানের পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। কখনাে কখনাে একেবারে নিকটবর্তী তারিখ ধার্য করার দ্বারা বিক্রেতার বেশি সুবিধা হতে পারে। বিক্রেতাই তার সুযােগসুবিধার ব্যাপারে উত্তম সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বিক্রেতা যদি তার স্বাধীন সন্তুষ্টির দ্বারা এক মাসের পূর্বের কোন তারিখ কজা করানাের জন্য ধার্য করে, তাহলে তাকে এব্যাপারে বাধা দেয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। সমকালীন কোন কোন ফকীহ এই দৃষ্টিভঙ্গীকে গ্রহণ করেছেন। কেননা, এ দৃষ্টিভঙ্গী আধুনিক চুক্তির জন্য অধিক প্রযােজ্য।

বাই সালাম পদ্ধতিতে অর্থায়ন

উল্লেখিত আলােচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়েছে যে, শরীয়ত কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের প্রয়ােজন পূরণের জন্য সালামের অনুমতি দিয়েছে। এ কারণে এটা মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং কৃষকদের জন্য একটি অর্থায়ন পদ্ধতি। এই অর্থায়ন পদ্ধতি আধুনিক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহেও ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্যের অর্থায়নের জন্য বাই সালাম পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। একথা পূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, সালামে পরিশােধ্য পণ্য অপেক্ষা মূল্য কম হয়। এভাবে উভয় মূল্যের মাঝে যে ব্যবধান হবে, তা ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বৈধ মুনাফা হবে। কাংক্ষিত পণ্য যথাসময়ে সরবরাহ করা নিশ্চিতকল্পে ক্রেতাবিক্রেতা থেকে জামানত কিংবা বন্ধকির আকৃতিতে সিকিউরিটিরও দাবি করতে পারবে। অনাদায়ের ক্ষেত্রে জামিনদার থেকে ঐ জিনিসই সরবরাহের দাবি করা যাবে। আর বন্ধকির ক্ষেত্রে ক্রেতা/অর্থায়নকারী বন্ধকির দ্রব্য বিক্রি করে তার মূল্য দ্বারা কাংক্ষিত জিনিস বাজার থেকে ক্রয় করতে পারবে কিংবা অগ্রিম প্রদেয় মূল্য উসূল করতে পারবে।

বাই সালাম পদ্ধতিতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে আধুনিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামী ব্যাংকসমূহ একটি জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে। তাহল তারা তাদের গ্রাহকদের থেকে নগদ অর্থের পরিবর্তে পণ্য গ্রহণ করবে, যেহেতু এই ব্যাংকসমূহ শুধুমাত্র অর্থের লেনদেনে অভিজ্ঞ হয়, এই জন্য বিভিন্ন গ্রাহক থেকে বিভিন্ন পণ্য উসূল করে সেগুলাে বাজারে বিক্রি করা বাহ্যিকভাবে তাদের কাছে ঝামেলা মনে হবে। এছাড়া তারা সেই পণ্যগুলাে কার্যত কজা না করেও বিক্রি করতে পারবে না, কেননা তা শরীয়তে নিষিদ্ধ।

কিন্তু আমরা যখন ইসলামী অর্থায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলােচনা করি তখন একটি মৌলিক সূক্ষ্ম বিষয় ভুলে না যাওয়া উচিত, তাহল যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র মুদ্রার (Money) লেনদেন করে তাদের পদ্ধতি ইসলামী শরীয়তের জন্য একটি নতুন বিষয়। এসব প্রতিষ্ঠান যদি হালাল মুনাফা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাদের কোন না কোনভাবে পণ্যের লেনদেন করতে হবে। কেননা, শরীয়তের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র ঋণ প্রদান করে মুনাফা অর্জন করা যায় না। এ কারণে ইসলামী অর্থ-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গী এবং পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান পণ্যের লেনদেনের জন্য বিশেষ সেল গঠন করতে পারে। যদি এমন সেল গঠন করা হয়, তাহলে সালামের মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করা এবং সেগুলাে নগদে বাজারে বিক্রি করা জটিল হবে না।

এছাড়া বাই সালাম চুক্তি দ্বারা উপকৃত হওয়ার আরাে দুটি পদ্ধতি রয়েছে।

প্রথম পদ্ধতি হল, কোন জিনিস সালামের ভিত্তিতে ক্রয় করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাকে একটি প্যারালাল সালাম (Parallel Salam) চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি করতে পারবে। যার পরিশােধের তারিখও প্রথম সালামের তারিখেই হবে। দ্বিতীয় (প্যারালাল) সালামে সময় যেহেতু স্বল্প হবে, সে জন্য মূল্য প্রথম চুক্তির তুলনায় কিছুটা বেশি হবে। এই উভয় মূল্যের মাঝে যে পার্থক্য হবে তা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্জিত মুনাফা হবে। দ্বিতীয় সালামের সময় যত স্বল্প হবে মূল্য ততই বেশি হবে এবং মুনাফাও সে অনুপাতে বেশি হবে। এই পদ্ধতি দ্বারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার স্বীয় সংক্ষিপ্ত সময়ের অর্থায়ন বিভাগ পরিচালনা করতে পারে।

আরো পড়তে পারেন:  চেক সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর

সঞ্চয়

দ্বিতীয় পদ্ধতি হল, যদি কোন কারণবশত প্যারালাল সালাম চুক্তি কার্যকর না হয়, তাহলে এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৃতীয় কোন পার্টি থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার গ্রহণ করতে পারবে। এই অঙ্গীকার সম্ভাব্য ক্রেতার পক্ষ হতে একতরফা হতে হবে। এটা যেহেতু শুধুমাত্র একটি অঙ্গীকার কার্যত ক্রয়-বিক্রয় নয়, সেজন্য ক্রেতা মূল্য অগ্রিম পরিশােধের ব্যাপারে পাবন্দ নয়। ফলে তাতে বেশি মূল্য ধার্য করা যাবে। আর সংশ্লিষ্ট জিনিস যেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠান অধিকৃত হবে সেহেতু অঙ্গীকার অনুযায়ী তৃতীয় পার্টির নিকট পূর্ব সিদ্ধান্তকৃত মূল্যে বিক্রি করে দিবে।

কখনও কখনও তৃতীয় আরেকটি পদ্ধতিও অবলম্বন করা হয়। তাহলকজার তারিখে সেই পণ্য বিক্রেতার নিকটই অধিক মূল্যে বিক্রি করে দেয়া হয়, এই পদ্ধতি শরয়ী বিধানের পরিপন্থি। কেননা, ক্রেতা পণ্য কজা করার পূর্বে সে জিনিস বিক্রেতার নিকট বিক্রি করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই। আর যদি এই চুক্তি বেশি মূল্যে হয়, তাহলে তা সুদের সাদৃশ্য হয়ে যাবে। যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি এই দ্বিতীয় বিক্রি ক্রেতার কজার পরও হয়, তাহলেও আসল ক্রয়-বিক্রয় থাকাকালীন সময় উক্ত দ্বিতীয় বিক্রির ব্যবস্থা করা যাবে না, সুতরাং এই পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হবে।

প্যারালাল সালামের কিছু নিয়ম-নীতি

আধুনিক ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেহেতু প্যারালাল সালামের পদ্ধতি ব্যবহার করছে, সেজন্য এই পদ্ধতি সঠিক হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত মনে রাখা অপরিহার্য। (১) প্যারালাল সালামে ব্যাংক ভিন্ন দুটি চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ হয়। এক চুক্তি অনুযায়ী ব্যাংক ক্রেতা হয় এবং আরেকটি চুক্তি অনুযায়ী বিক্রেতা হয়। এই দু’চুক্তির প্রত্যেকটি অপরটি হতে পৃথক এবং স্বতন্ত্র হওয়া উচিত। চুক্তিদ্বয়কে এই হিসেবে পরস্পরে মিলানাে যাবে না যে, সেগুলাের একটির দায়-দায়িত্ব এবং জিম্মাদারী দ্বিতীয় চুক্তির দায়-দায়িত্ব এবং জিম্মাদারীর উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক চুক্তি স্বতন্ত্র হতে হবে এবং অপর চুক্তির উপর নির্ভরশীল এবং সীমাবদ্ধ না থাকতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, “ক” “খ” থেকে একশ’ বস্তা গম সালাম হিসেবে ক্রয় করছে, যার পরিশােধের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ধার্য করা হয়েছে। “ক” “গ”র সাথে প্যারালাল সালাম চুক্তি করতে পারবে যে, সে তাকে ৩১ ডিসেম্বর একশ’ বস্তা গম সরবরাহ করবে, কিন্তু “গ”র সাথে প্যারালাল সালাম চুক্তি করার সময় তাকে গম সরবরাহ “খ” থেকে গম গ্রহণের সাথে শর্তযুক্ত করতে পারবে না। “খ” যদি ৩১ ডিসেম্বর গম সরবরাহ না করে, তাহলেও “ক” একশ’ বস্তা গম “গ”কে সরবরাহ করতে হবে। সে “খ”র বিরুদ্ধে যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে, কিন্তু “গ”কে গম সরবরাহের দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃত পাবে না।

এমনিভাবে “খ” যদি “ক”কে খারাপ জিনিস সরবরাহ করে, যা পূর্বনির্ধারিত গুণগত মানের নয়, তদুপরি “ক”র দায়িত্ব হল “গ”র সাথে চুক্তি অনুযায়ী গুণগত মানের গম সরবরাহ করা। (২) প্যারালাল সালাম (Parallel Salam) শুধুমাত্র তৃতীয় পার্টির সাথে করা জায়েয । প্রথম চুক্তিতে যে ব্যক্তি বিক্রেতা হবে, তাকে দ্বিতীয় প্যারালাল চুক্তিতে ক্রেতা বানানাে যাবে না। কেননা, তা বাই ব্যাক (Buy Back) চুক্তি হয়ে যাবে, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। এমনকি দ্বিতীয় চুক্তিতে ক্রেতা যদি তার স্বীয় স্বাতন্ত্রিক আইনগত বিধান রাখে, কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে ঐ ব্যক্তির মালিকানায় থাকে যে প্রথম চুক্তিতে বিক্রেতা ছিল, তাহলেও এই (দ্বিতীয় চুক্তি) বৈধ হবে না। কেননা, কার্যত তা বাই ব্যাকের সাদৃশ্য হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ক’ ‘খ’ থেকে এক হাজার বস্তা গম সালাম হিসেবে ক্রয় করেছে। খ’ একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানী, ‘খ’র অধীনে একটি কোম্পানী ‘গ’ রয়েছে। যার নিজস্ব একটি পৃথক আইনগত বিধান রয়েছে, কিন্তু মালিকানা সম্পূর্ণভাবে ‘খ’-এর। তাহলে এক্ষেত্রে ‘ক’ ‘গ’র সাথে প্যারালাল সালাম চুক্তি করতে পারবে না। তবে ‘গ’ যদি পরিপূর্ণভাবে ‘খ’র মালিকানায় না থাকে, তাহলে ‘ক’ ‘গ’র সাথে এই চুক্তি করতে পারবে। যদিও কোন কোন শেয়ারহােল্ডার উভয় ব্যবসায় শরীক থাকে।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

One thought on “বাই সালাম কী বিস্তারিত আলোচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *