ইজারা এবং ইজারাদারি ব্যবস্থা

ইজারা ইসলামী ফিকহের একটি পরিভাষা। যার আভিধানিক অর্থ কোন জিনিস ভাড়ায় প্রদান করা। ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় “ইজারা” পৃথক দুটি পদ্ধতির জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রথম পদ্ধতিতে ইজারা অর্থ কোন ব্যক্তি থেকে শ্রম গ্রহণ করা যার বিনিময়ে তাকে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। শ্ৰম গ্রহণকারীকে “মুছতাজির” (ইজারাদার) এবং শ্রমদাতাকে “আজীর” (শ্রমিক) বলা হয়। সুতরাং “ক” যদি “খ”কে তার অফিসে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে ম্যানেজার বা ক্লার্ক হিসেবে রাখে, তাহলে “ক”কে ইজারাদার এবং “খ”কে শ্রমিক বলা হবে। এমনিভাবে “ক” যদি কোন কুলি (পাের্টার) থেকে শ্রম গ্রহণ করে, যাতে করে সে তার মালামাল এয়ারপাের্ট পর্যন্ত পৌঁছেয়ে দেয়, তাহলে “ক” হবে ইজারাদার এবং কুলি হবে শ্রমিক। উভয় উদাহরণে পক্ষদ্বয়ের মাঝে সাব্যস্তকৃত লেনদেনকে “ইজারা” বলা হবে। এই প্রকারের ইজারায় ঐসব লেনদেন অন্তর্ভুক্ত যে লেনদেনে কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তি থেকে শ্রম বা সেবা (Service) গ্রহণ করে। যার থেকে শ্রম বা সেবা গ্রহণ করা হয় সে কোন ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক, মজদুর বা এমন কোন ব্যক্তি হতে পারে, যে এমন কোন সেবা প্রদান করতে সক্ষম যার কোন মূল্য ধার্য করা যেতে পারে। ইসলামী ফিকহের পরিভাষা অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককেই “শ্রমিক” বলা যাবে এবং যারা সেবা গ্রহণ করে তাদেরকে ইজারাদার বলা হবে। আর শ্রমিককে প্রদেয় বেতন-ভাতাকে “পারিশ্রমিক” বলা হবে।

“ইজারা”র দ্বিতীয় প্রকারের সম্পর্ক মানবীয় সেবার সাথে নয়, বরং আসবাবপত্র এবং সম্পদের সুবিধা ভােগের (ব্যবহারের অধিকারের) সাথে। এই দৃষ্টিতে “ইজারা” অর্থ “মালিকানাধীন কোন নির্দিষ্ট জিনিসের সুযােগ-সুবিধা (Usufructs) অপর কোন ব্যক্তির নিকট এমন কোন ভাড়ার বিনিময়ে হস্তান্তর করা যা তার থেকে দাবি করা যায়। এই পদ্ধতিতে “ইজারা” পরিভাষাটি ইংরেজী Leasing পরিভাষার সাদৃশ্য হয়ে যাবে। ইজারাদাতা বা ভাড়ায় প্রদানকারীকে (Lessor) “মুজির” (ইজারাদার) বলা হয় এবং ভাড়া গ্রহণকারীকে (Lessee) “মুছতাজির” আর মুজিরকে যে ভাড়া প্রদান করা হয় তাকে “উজরত” বলা হয়।

ঋণ

উভয় প্রকারের ইজারা সম্পর্কে ইসলামী ফিকহের গ্রন্থাবলীতে বিশদভাবে আলােচনা করা হয়েছে এবং এগুলাের প্রত্যেকটিরই স্বীয় নিয়ম-নীতি ও বিধি-বিধান রয়েছে। কিন্তু বক্ষমান গ্রন্থের উদ্দেশ্য দ্বিতীয় প্রকারের সাথে বেশি সম্পৃক্ত। কেননা, তাকে সাধারণত পুঁজি বিনিয়ােগ এবং অর্থায়নের পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

লিজিং-এর অর্থে ইজারার বিধি-বিধান ক্রয়-বিক্রয়ের বিধি-বিধানের সাথে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। কেননা, উভয় ক্ষেত্রে কোন জিনিস অপর ব্যক্তির নিকট মূল্যের বিনিময়ে হস্তান্তর করা হয়। ক্রয়-বিক্রয় এবং ইজারার মাঝে পার্থক্য শুধুমাত্র এই যে, ক্রয়-বিক্রয়ে সম্পদ স্বত্বাগতভাবে ক্রেতার মালিকানায় চলে যায় আর ইজারায় সম্পদ স্বয়ং ভাড়া প্রদানকারীর মালিকানায় থাকে। ইজারাদারের দিকে শুধুমাত্র তা ভােগ-ব্যবহার করার অধিকার হস্তান্তর হয়।

এ কারণে সহজেই মন্তব্য করা যায় যে, ইজারা প্রকৃতিগতভাবে কোন। অর্থায়ন পদ্ধতি নয়। বরং তা ক্রয়-বিক্রয়ের ন্যায় সাধারণ একটি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। এতদ্সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে বিশেষ করে তাতে ট্যাক্স থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার যে সুযােগ সুবিধা রয়েছে, সে সুযােগ সুবিধার ভিত্তিতে পাশ্চাত্য দেশসমূহে তাকে অর্থায়নের জন্যও ব্যবহার করা হয়। কোন কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্ভেজাল সুদি ঋণ প্রদানের পরিবর্তে কোন কোন পণ্য তাদের গ্রাহককে লীজের ভিত্তিতে দিচ্ছে। এসব পণ্যের ভাড়া নির্ধারণের সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঐ সামগ্রিক ব্যয়ের হিসাবও সংযােজন করে, যা উক্ত পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে তাদের বহন করতে হয়েছে এবং তাতে সেই নির্দিষ্ট সুদও সংযােজন করে দেয়া হয়, যা লীজের সময় কালে ব্যাংক উক্ত অর্থ দ্বারা গ্রহণ করতে পারত। এই পদ্ধতিতে হিসাবকৃত সামগ্রিক অর্থকে লীজ (ভাড়া) চলাকালীন মাসের উপর বণ্টন করা হয় এবং সে অনুপাতে মাসিক ভাড়া ধার্য করে নেয়া হয়।

লীজকে শরীয়তের দৃষ্টিতে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি না, এ প্রশ্ন লীজ চুক্তির শর্তের উপর নির্ভরশীল। যেরূপ পূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, লীজ একটি সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তি, অর্থায়ন পদ্ধতি নয়। এজন্য শরীয়ত ইজারার জন্য যেসব বিধি-বিধান বর্ণনা করেছে তা লীজের উপরও প্রযােজ্য হবে। সুতরাং ইসলামী ফিকহে লীজ সংক্রান্ত বর্ণিত বিধি-বিধানের উপর আমাদের আলােচনা করা উচিত।

এরপর আমরা বুঝতে পারব কোন্ শর্তসাপেক্ষে ইজারাকে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে।

যদিও “ইজারা”র উসূল এত বেশি যে, সেগুলাের জন্য পৃথক একটি ভলিয়মের প্রয়ােজন। আমরা এই অধ্যায়ে শুধুমাত্র ঐসব মৌলিক নীতিমালাকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করব, যা এই চুক্তির ধরন বুঝার জন্য জানা অপরিহার্য এবং যেগুলাের সাধারণত আধুনিক আর্থিক কর্মকাণ্ডে প্রয়ােজন অনুভব হয়। এই নীতিমালাসমূহ এখানে সংক্ষিপ্ত নােটের আকৃতিতে বর্ণনা করা হচ্ছে, যাতে পাঠকগণ সেগুলােকে সংক্ষিপ্ত সূত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

লীজিং (ইজারা)-এর মৌলিক বিধি-বিধান

(১) লজিং এমন একটি চুক্তি যে চুক্তির মাধ্যমে কোন সম্পদের মালিক নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে উক্ত সম্পদ ব্যবহারের অধিকার অপর ব্যক্তির নিকট অর্পণ করে।

(২) লীজের জন্য নির্বাচিত সম্পদ মূল্যবান ও ভােগ-ব্যবহারের উপযােগী হতে হবে, সুতরাং যে জিনিস ব্যবহার উপযােগী নয় তা লীজের ভিত্তিতে দেয়া যাবে না।

(৩) লীজ সঠিক হওয়ার জন্য অপরিহার্য হল, লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় সম্পদের মালিকানা ইজারাদাতারই (Lessor) থাকবে। ইজারাদারের (Lessee) দিকে শুধুমাত্র ব্যবহারের অধিকার অর্পণ হবে। সুতরাং প্রত্যেক এমন জিনিস যেগুলাে খরচ করা ব্যতীত (অর্থাৎ, হাতছাড়া করা ব্যতীত) ব্যবহার করা যায় না, সেগুলাের লীজও হবে না। একারণে নগদ অর্থ, খাওয়া-পান করার বস্তু, লাকড়ি এবং গােলা-বারুদ ইত্যাদির লীজ সম্ভব নয়। কেননা, এগুলােকে খরচ করা ব্যতীত এগুলাের ব্যবহার সম্ভব নয়। যদি এ ধরনের কোন জিনিস লীজের ভিত্তিতে প্রদান করা হয়, তাহলে তাকে একটি ঋণ মনে করা হবে এবং ঋণের সকল বিধি-বিধান তার উপর প্রযােজ্য হবে। এই অবৈধ লীজের উপর যে ভাড়া নেয়া হবে তা ঋণের উপর গৃহীত সুদ হবে।

(৪) লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় সম্পদ স্বত্বাগতভাবে যেহেতু ইজারাদাতার (Lessor) মালিকানায় থাকে, সেহেতু মালিকানার কারণে উদ্ভাবিত দায়িত্বসমূহও সে নিজেই বহন করবে, কিন্তু তা ব্যবহারের সাথে সম্পৃক্ত দায়িত্বসমূহ ইজারাদার (Lessee) বহন করবে। যেমন: “ক” তার বাড়ি “খ” এর নিকট ভাড়া হিসেবে প্রদান করেছে, এই বাড়ির উপর অর্পিত ট্যাক্স “ক”-এর দায়িত্বে থাকবে, পক্ষান্তরে পানি, বিদ্যুৎ বিল এবং বাড়ি ব্যবহারের কারণে অন্যান্য খরচাদি “খ” অর্থাৎ ইজারাদারের দায়িত্বে থাকবে।

(৫) লীজের মেয়াদ নির্ধারণ সুস্পষ্টভাবে হতে হবে।

(৬) লীজ চুক্তিতে যে উদ্দেশ্যে লীজ নেয়া হয়েছে ইজারাদার সেই সম্পদকে তাছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবে না। চুক্তিতে যদি কোন উদ্দেশ্য নির্ধারিত না হয়, তাহলে ইজারাদার তাকে ঐসব উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবে যে উদ্দেশ্যের জন্য সাধারণত তা ব্যবহার করা হয়। সে যদি তা অসাধারণ কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চায় (যার জন্য সাধারণত ঐ জিনিস ব্যবহৃত হয় না) তাহলে সে এমন কাজে ইজারাদাতার (মালিকের) সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতীত তা ব্যবহার করতে পারবে না।

(৭) ইজারাদারের পক্ষ হতে সেই জিনিসের অসৎ ব্যবহার কিংবা উদাসীনতা এবং অসতর্কতার কারণে যে ক্ষয়-ক্ষতি হবে, ইজারাদার তার ক্ষতিপূরণ প্রদানের দায়িত্ব বহন করবে।।

(৮) লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় সম্পদ লীজ চলাকালীন সময়ে ইজারাদাতার (Lessor) দায়ভারে (Risk) থাকবে। যার অর্থ হল, ইজারাদারের (Lessee) কোনরূপ অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ ব্যতীত যদি কোন ক্ষয়-ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে এই ক্ষয়-ক্ষতি ইজারাদাতা (মালিক) বহন করবে।

(৯) দুই বা ততােধিক ব্যক্তির যৌথ মালিকানা সম্পদও লীজের ভিত্তিতে দেয়া যাবে এবং ভাড়া মালিকদের মাঝে মালিকানায় তাদের অংশ অনুপাতে বণ্টন হবে।

(১০) যে ব্যাক্তি কোন সম্পদের মালিকানায় অংশীদার হবে, সে তার আনুপাতিক অংশ স্বীয় অপর অংশীদারকেই ভাড়া দিতে পারবে অন্য কোন ব্যক্তিকে প্রদান করতে পারবে না।

(১১) লীজ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য জরুরী হল, লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় সম্পদ উভয়পক্ষের জন্য পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত হতে হবে।

যেমন: “ক” “খ”কে বলল, আমি তােমার কাছে আমার দুটি দোকান থেকে একটি ভাড়া দিচ্ছি। “খ”ও যদি তার সাথে একমত পােষণ করে, তাহলে এই ইজারা বাতিল বলে গণ্য হবে, কিন্তু যদি দু’টি দোকানের যে কোন একটিকে নির্দিষ্ট এবং চিহ্নিত করে নেয়, (তাহলে শুদ্ধ হবে)।

ভাড়া নির্ধারণ

(১২) লীজের পূর্ণ মেয়াদের জন্য চুক্তির সময়ই ভাড়া নির্ধারিত হতে হবে।

লীজের মেয়াদের বিভিন্ন ধাপের জন্য ভাড়ার বিভিন্ন পরিমাণ ধার্য করাও জায়েয আছে। কিন্তু শর্ত হল প্রত্যেক ধাপের ভাড়ার পরিমাণ লীজের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হওয়ার সময়ই পরিপূর্ণভাবে নির্ধারিত হতে হবে। যদি পরবর্তীতে আগত কোন ধাপের ভাড়া ধার্য না করে তাকে ইজারাদাতার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে এই ইজারা সঠিক হবে।

যেমন: (১) “ক” তার বাড়ি পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য “খ”কে ভাড়া দিচ্ছে প্রথম বছরের ভাড়া মাসিক দু’হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছে এবং এ কথাও সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, প্রত্যেক সামনের বছরের ভাড়া পিছনের বছরের ভাড়ার তুলনায় দশ পার্সেন্ট বেশি হবে, তাহলে এই ইজারা (Lease) শুদ্ধ হবে।

যেমন: (২) উল্লেখিত উদাহরণে “ক” চুক্তিতে এ শর্তারােপ করেছে। যে, মাসিক ভাড়া দু’হাজার টাকা শুধুমাত্র এক বছরের জন্য ধার্য করা হয়েছে, সামনের বছরসমূহের ভাড়া পরবর্তীতে ইজারাদাতার ইচ্ছানুযায়ী ধার্য করা হবে, তাহলে এই ইজারার ভাড়া অনির্দিষ্ট হওয়ার কারণে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।

(১৩) ভাড়া সেই সামগ্রিক ব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে যা ইজারাদাতার এই জিনিস ক্রয়ে বহন করতে হয়েছে। যেরূপ সাধারণত ইজারার অর্থায়নে (Financial Lease) হয়ে থাকে। এটাও শরীয়তের নীতিমালার পরিপন্থি নয়। তবে শর্ত হল, বৈধ ইজারার অন্যান্য শয়ী শর্তের উপর পূর্ণভাবে আমল করতে হবে।

(১৪) ইজারাদাতা (Lessor) এককভাবে ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারবে না এবং এ ধরনের শর্তকৃত চুক্তিও সঠিক হবে না।

(১৫) ভাড়ায় প্রদানকৃত সম্পদ ইজারাদারকে (Lessee) হস্তান্তর করার পূর্বে পূর্ণ ভাড়া বা তার কিছু অংশ অগ্রিমও আদায় করা যাবে। কিন্তু ইজারাদাতা এভাবে যে অর্থ গ্রহণ করবে তা On Account এর ভিত্তিতে আদায় হবে এবং ভাড়া পরিশােধ হওয়ার পর তা তাতে সংযুক্ত করে নেয়া হবে।

(১৬) ইজারার মেয়াদ ঐ তারিখ থেকে শুরু হবে, যে তারিখে ইজারায় প্রদেয় সম্পদ ইজারাদারের নিকট হস্তান্তর করা হবে, চাই সে তা ব্যবহার করা শুরু করুক বা না করুক।

(১৭) ইজারায় প্রদেয় সম্পদ যে উদ্দেশ্যে ভাড়া দেয়া হয়েছে যদি তা নষ্ট হয়ে যায় এবং তা মেরামত করাও সম্ভব না হয়, তাহলে ইজারা ঐ তারিখ থেকে বাতিল হয়ে যাবে যে তারিখে এ ধরনের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। তদুপরি এই ক্ষয়-ক্ষতি যদি ইজারাদারের অসৎ ব্যবহার কিংবা উদাসীনতার কারণে হয়ে থাকে, তাহলে পণ্যের মূল্য যে পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে তা সে ইজারাদাতাকে পরিশােধের দায়িত্ব বহন করবে। অর্থাৎ, ক্ষয়-ক্ষতির সামান্য পূর্বে এর মূল্য কত ছিল এবং এখন ক্ষয়-ক্ষতির পর কত দাঁড়িয়েছে তা দেখা হবে ।

ইজারা পদ্ধতিতে অর্থায়ন (অর্থসংস্থানের নিমিত্তে ইজারা)

মুরাবাহার ন্যায় ইজারাও (Lease) প্রকৃতগতভাবে অর্থায়ন পদ্ধতি নয়, বরং এটা একটি সাধাসিধা চুক্তি, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন জিনিসের ব্যবহারের অধিকার এক ব্যক্তি থেকে অপর ব্যক্তির দিকে নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে হস্তান্তর করা। তদুপরি কোন কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুদভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদানের পরিবর্তে লীজকে অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা আরম্ভ করেছে। এ ধরনের লীজকে সাধারণত ইজারার অর্থায়ন (Financial Lease) বলা হয়, যা বাস্তবিক ইজারা (Operational Lease) থেকে ভিন্ন ধরনের এবং তাতে (অর্থাৎ ফিন্যান্সিয়াল লীজে) বাস্ত বিক ইজারার অনেক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করা হয় ।

আরো পড়তে পারেন:  মুরাবাহার চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক ত্রুটি বিচ্যুতি

সপ্রতিকালে যখন সুদবিহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন তারা অনুভব করল যে, লীজ সারা বিশ্বে সর্বস্বীকৃত একটি অর্থায়ন পদ্ধতি। অপরদিকে তারা এ হাক্বীকৃতও অনুভব করল যে, লীজ শরয়ীতের দৃষ্টিতে একটি বৈধ চুক্তি, তাকে সুদবিহীন অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। এ কারণে ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান লীজকে গ্রহণ করা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু অনেক কম প্রতিষ্ঠানই এদিকে লক্ষ্য রেখেছে যে, ইজারার অর্থায়নে এমন অনেক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় যা বাস্তবিক ইজারার পরিবর্তে একেবারে সুদের সাদৃশ্য হয়ে যায়। এ কারণেই তারা কোনরূপ পরিবর্তন করা ব্যতীত লীজ চুক্তির সেই মডেলকেই ব্যবহার করা শুরু করে দিয়েছে, যা আধুনিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত ছিল, অথচ তাদের অনেক কর্মকাণ্ড শরীয়তসম্মত নয়।

পূর্বে যেরূপ বর্ণনা করা হয়েছে যে, লীজ তার প্রকৃতিগতভাবে অর্থায়ন পদ্ধতি নয়, তদুপরি নির্দিষ্ট কতগুলাে শর্তসাপেক্ষে এই চুক্তিকে অর্থায়নের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এ উদ্দেশ্যের জন্য সুদের (Interest) পরিবর্তে ভাড়া (Rent) এবং বন্ধকের (Mortgage) পরিবর্তে লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় সম্পদের নাম ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়, বরং লীজিং এবং সুদি ঋণের মাঝে প্রয়ােগিক পার্থক্য হতে হবে। এ পার্থক্য তখনই সম্ভব যখন লীজ সংক্রান্ত ইসলামী সমুদয় নীতিমালার অনুসরণ করা হবে, যেসব নীতিমালার আংশিক এই অধ্যায়ের প্রারম্ভে বর্ণনা করা হয়েছে।

আরাে সুস্পষ্ট হওয়ার জন্য বর্তমানে প্রচলিত ইজারার অর্থায়ন পদ্ধতি (Financial Lease) এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কার্যকর লীজের মাঝে কয়েকটি মৌলিক পার্থক্য নিম্নে বর্ণনা করা হচ্ছে।

(১) ক্রয়-বিক্রয়ে চুক্তির বিপরীত ইজারা ভবিষ্যতের যে কোন তারিখ থেকেও কার্যকর হতে পারে। সুতরাং ফরওয়ার্ডসেল তাে শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয কিন্তু ভবিষ্যতের কোন তারিখের সাথে সম্পৃক্ত ইজারা জায়েয আছে, এ শর্তের সাথে যে, ভাড়া ঐ সময় পরিশােধ করা ওয়াজিব হবে যখন ইজারায় প্রদেয় সম্পদ ইজারাদারের (Lessee) নিকট হস্তান্তর করা হবে।

ফিন্যান্সিয়াল লীজের অনেক ক্ষেত্রে ইজারাদাতা অর্থাৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেই পণ্যকে স্বয়ং ইজারাদারের (Lessee) মাধ্যমে ক্রয় করে। ইজারাদার সে পণ্য ইজারাদাতার পক্ষ হতে ক্রয় করে এবং তার মূল্য সরবরাহকারীকে (Supplier) পরিশােধ করে। কখনাে কখনাে মূল্য ইজারাদাতা সরাসরি পরিশােধ করে আবার কখনাে কখনাে ইজারাদারের মাধ্যমে পরিশােধ করে। লীজের কোন কোন চুক্তিতে লীজ ঐদিন থেকেই শুরু হয়ে যায়, যেদিন ইজারাদাতা মূল্য পরিশােধ করে, এ দিকে লক্ষ্য করা হয় না যে, ইজারাদার মূল্য সরবরাহকারীকে পরিশােধ করে পণ্য কজা করছে কি না। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, ইজারাদারের ইজারার ভিত্তিতে গৃহীত পণ্য কজা করার পূর্বেই তার উপর ভাড়ার দায়িত্ব শুরু হয়ে যায়, আর এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয। কেননা, তা গ্রাহককে প্রদেয় অর্থের উপর ভাড়া গ্রহণ করার সাদৃশ্য হয়ে যায়, যা নির্ভেজাল এবং খাঁটি সুদ।

শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক পদ্ধতি হল, ভাড়া ঐ তারিখ হতে গ্রহণ করা হবে যেদিন থেকে ইজারাদার ইজারার সম্পদ কজা করবে। যে তারিখে মূল্য পরিশােধ করা হয়েছে সে তারিখ থেকে নয়। সরবরাহকারী যদি মূল্য গ্রহণ করার পর পণ্য সরবরাহে বিলম্ব করে, তাহলে ইজারাদার বিলম্বের সময়ের ভাড়া প্রদানের দায়িত্ব বহন করবে না।

উভয়পক্ষের মাঝে বিভিন্ন সম্পর্ক

(২) এ কথা পরিষ্কারভাবে বুঝে নিতে হবে যে, যখন ইজারায় প্রদেয়। সম্পদ ক্রয়ের দায়িত্ব স্বয়ং ইজারাদারকে দেয়া হবে, তখন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গ্রাহকের মাঝে পৃথক দুটি সম্পর্ক স্থাপন হবে, যা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে গ্রাহক ঐ পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উকিল হিসেবে নিযুক্ত হবে। এই ধাপে উভয়ের মাঝে উকিল এবং মুআক্কেলের চেয়ে অধিক কোন সম্পর্ক হয় না। ইজারাদাতা এবং ইজারাদার হিসেবে সম্পর্ক এখনাে কার্যকর হয়নি।

দ্বিতীয় ধাপ ঐ তারিখ থেকে শুরু হবে, যখন গ্রাহক সরবরাহকারী থেকে পণ্য কজা করে নিবে। এই ধাপে ইজারাদাতা এবং ইজারাদারের সম্পর্ক কার্যকর হবে।

উভয় পক্ষের এই পৃথক দুই দিককে পরস্পরে তালগােল পাকানাে যাবে না। প্রথম ধাপ চলাকালীন গ্রাহকের উপর ইজারাদারের দায়িত্ব অর্পিত হবে না। এই ধাপে সে শুধুমাত্র একজন উকিল হিসেবে দায়িত্বশীল হবে। তবে পণ্য যখন তার কজায় দিয়ে দেয়া হবে, তখন সে ইজারাদার হিসেবে তার দায়িত্বশীল হবে।

তদুপরি এখানে মুরাবাহা এবং লজিং-এর মাঝে একটি পার্থক্য রয়েছে, পূর্বে যেরূপ বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় তখনই সংঘটিত হয়, যখন গ্রাহক সরবরাহকারী থেকে পণ্য কজা করে নেয় এবং মুরাবাহার পূর্ব চুক্তি ক্রয়-বিক্রয় কার্যকর হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। সুতরাং উকিল হিসেবে পণ্যটি কজা করার পর গ্রাহক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই এ ব্যাপারে অবগত করবে এবং তা ক্রয়ের জন্য প্রস্তাবও (Offer) পেশ করবে। ক্রয়-বিক্রয় তখন সংঘটিত হবে যখন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই প্রস্ত বিকে গ্রহণ করবে।

লজিং-এ কর্মপদ্ধতি এর থেকে ভিন্ন এবং কিছুটা সংক্ষিপ্ত। ইজারা চুক্তির ব্যাপারে উভয়পক্ষের কজা করার প্রয়ােজন নেই, বরং আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি গ্রাহককে তার উকিল নিয়ােগের সময় কজার তারিখ থেকে ঐ সম্পদ ইজারার ভিত্তিতে প্রদান করার ব্যাপারে একমত পােষণ করে নেয়, তাহলে ইজারা ঐ তারিখ থেকে নিজে নিজেই শুরু হয়ে যাবে।

মুরাবাহা এবং ইজারার মাঝে এই পার্থক্যের কারণ দুটি

প্রথম কারণ হল, ক্রয়-বিক্রয় সঠিক হওয়ার জন্য শর্ত হল তা সাথে সাথে কার্যকর হতে হবে। সুতরাং ভবিষ্যতের কোন তারিখের সাথে সম্পৃক্ত ক্রয়-বিক্রয় শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক হবে না। কিন্তু ইজারা ভবিষ্যতের যে কোন তারিখের দিকেও সম্পৃক্ত হতে পারে। সুতরাং মুরাবাহার ক্ষেত্রে পূর্ব চুক্তি যথেষ্ট নয়, পক্ষান্তরে লজিং-এ তা একেবারে যথেষ্ট।

. দ্বিতীয় কারণ হল, শরীয়তের মৌলিক নীতিমালা হল কোন ব্যক্তি এমন জিনিসের মুনাফা কিংবা ফিস গ্রহণ করতে পারে না, যার দায়ভার (রিস্ক) সে বহন করেনি।

এ নীতিমালাকে মুরবাহার উপর প্রয়ােগ করলে বিক্রেতা এমন জিনিসের উপর মুনাফা গ্রহণ করতে পারে না, যা এক মুহূর্তের জন্যেও তার দায়ভারে (রিস্কে) আসেনি। কেননা, গ্রাহক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাঝে ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হওয়ার জন্য পূর্বচুক্তিকে যথেষ্ট বলা হলে এই পণ্য ঐ সময় গ্রাহকের দিকে হস্তান্তর হয়ে যাবে যখন সে তা কজা করবে। এবং উক্ত পণ্য এক মুহূর্তের জন্যেও বিক্রেতার দায়ভারে আসবে না। এ কারণেই মুরাবাহায় একই সময়ে হস্তান্তর সম্ভব নয়, যার কারণে তাতে কজা করার পর নতুন করে ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও প্রস্তাব গ্রহণ) হওয়া অপরিহার্য।

লজিং-এর ক্ষেত্রে লীজ চলাকালীন পূর্ণ সময়ের মাঝে সে সম্পদ ইজারাদারের (Lessor) মালিকানায় এবং তার দায়ভারে থাকে। কেননা, তাতে মালিকানা পরিবর্তন হয় না। সুতরাং লজিং-এর মেয়াদ যদি একেবারে সেই সময় থেকে শুরু হয়ে যায় গ্রাহক যখন পণ্য কজা করেছে, তাহলে তাতেও উপরােল্লেখিত নীতিমালার পরিপন্থি হবে না।

মালিকানার কারণে বহনকৃত ব্যয়

(৩) ইজারাদার যেহেতু ঐ পণ্যের মালিক এবং সে তার উকিলের মাধ্যমে তা ক্রয় করেছে, সেহেতু তার ক্রয় ও মালিকানা গ্রহণের ব্যাপারে যাবতীয় ব্যয়ভারের দায়িত্বও সে বহন করবে। সুতরাং কাস্টম ডিউটি এবং মালের ভাড়া ইত্যাদির ব্যয়ভারও সেই বহন করবে। সে এই ব্যয়সমূহকে খরচে সংযুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণের ব্যাপারে সেগুলাের দিকেও লক্ষ্য রাখতে পারবে, কিন্তু মূলত সে মালিক হওয়ার সুবাদে ঐসব ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব তার উপর। যে সব চুক্তি এর পরিপন্থি হবে যেমন আধুনিক ফিন্যান্সিয়াল লীজে হয়ে থাকে, তা শরীয়তসম্মত হবে না।

ক্ষয়-ক্ষতির সময় উভয়পক্ষের দায়-দায়িত্ব

(৪) লজিং-এর মৌলিক বিধি-বিধান প্রসংগে পূর্বে বিবৃত হয়েছে যে, ইজারাদারের (Lessee) অসৎ ব্যবহার কিংবা উদাসীনতার কারণে সম্পদে যে সব ক্ষয়-ক্ষতি হবে, ইজারাদার সে সব ক্ষয়-ক্ষতির ব্যাপারে দায়িত্ব বহন করবে। সাধারণ ব্যবহারের কারণে যে সব ক্ষয়-ক্ষতি হবে, ইজারাদারকে তার ব্যাপারেও দায়ি বানানাে যাবে কিন্তু তার ক্ষমতার বাইরের ক্ষয়-ক্ষতির ব্যাপারে তাকে দায়ি করা যাবে না। আধুনিক ফিন্যান্সিয়াল লীজে (Financial Lease) সাধারণত এই দু’প্রকারের ক্ষয়ক্ষতির মাঝে কোন পার্থক্য করে না। ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত লীজে উভয় প্রকারের মাঝে পার্থক্য করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদী লীজে পরিবর্তনীয় ভাড়া

(৫) দীর্ঘমেয়াদী লীজ চুক্তিতে লীজের পূর্ণ মেয়াদের জন্য ভাড়ার একটি হার নির্ধারণ করা সাধারণত ইজারাদাতার (Lessor) জন্য লাভজনক হয় না। কেননা মার্কেটের অবস্থা সময়ে সময়ে পরিবর্তন হতে থাকে, এমতাবস্থায় ইজারাদাতা দুটি পদ্ধতির যে কোন একটি গ্রহণ করতে পারে।

(ক) সে লীজ চুক্তি এ শর্তসাপেক্ষে করবে যে, নির্দিষ্ট সময়ের পর (যেমন এক বছর পর) ভাড়া বিশেষ অনুপাতে (যেমন পাঁচ পার্সেন্ট) বৃদ্ধি করে দেয়া হবে।

(খ) সে একটি স্বল্প মেয়াদের জন্য লীজ-চুক্তি সম্পাদন করবে। মেয়াদান্তে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সম্মতিতে নতুন শর্তে লীজ নবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে উভয়পক্ষের যে কেউ নতুন লীজ চুক্তি প্রত্যক্ষান করার ব্যাপারে স্বাধীন থাকবে। এমতাবস্থায় ইজারাদার (Lessee) ইজারাদাতাকে (Lessor) লীজের ভিত্তিতে গৃহীত জিনিস অবশ্যই খালি করে ফেরত দিয়ে দিবে।

এ দুটি পদ্ধতি পূর্ববর্তী ফিকহী বিধি-বিধানের ভিত্তিতে। সমকালীন কোন কোন আলিম দীর্ঘমেয়াদী লীজে এ কথারও অনুমতি প্রদান করেন যে, ভাড়ার পরিমাণকে এমন পরিবর্তনীয় মাপকাঠির (Benchmark) সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে যা ভালােভাবে পরিজ্ঞাত হবে। সে বিষয়কে উত্তমরূপে সুস্পষ্ট করে দেয়া হবে যাতে ঝগড়ার কোন সম্ভাবনা বিদ্যমান না থাকে। যেমন ঐসব আলিমের নিকট লীজ চুক্তিতে এ শর্তারােপ করা জায়েয আছে যে, যদি সরকারের পক্ষ হতে ইজারাদারের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে ভাড়ায়ও সে অনুপাতে বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। এমনিভাবে ঐসব আলিম এ অনুমতিও প্রদান করেন যে, ভাড়ায় বার্ষিক বৃদ্ধিকে মুদ্রার মূল্যমানের হারের সাথে সংযুক্ত করা যাবে। সুতরাং মুদ্রার মূল্যমানের হার যদি পাঁচ পার্সেন্ট হয়, তাহলে ভাড়ায়ও পাঁচ পার্সেন্ট বৃদ্ধি হয়ে যাবে।

এই নীতিমালার ভিত্তিতে কোন কোন ইসলামী ব্যাংক প্রচলিত সুদের হারকে ভাড়া নির্ধারণের জন্য মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করে। এই ব্যাংক লীজিং-এর মাধ্যমে সেই পরিমাণ মুনাফা অর্জন করতে চায়, যে পরিমাণ আধুনিক ব্যাংক সুদি ঋণ প্রদান করে অর্জন করে। এজন্য তারা ভাড়ার হারকে সুদের হারের সাথে সম্পৃক্ত করে নেয় এবং ভাড়ার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ধার্য করার পরিবর্তে তারা লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় সম্পদ ক্রয়ব্যয়ের হিসাব করে এবং তারা চায় যে, সম্পদের ভাড়ার দ্বারা ঐ পরিমাণ অর্থ উপার্জন করবে যা সুদের হারের সমান হবে কিংবা সুদের হারের চেয়ে কিছু বেশি হবে। যেহেতু সুদের হার পরিবর্তন হতে থাকে, সেহেতু লীজের পূর্ণ মেয়াদের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা যায় না। এ কারণে ঐসব চুক্তিতে কোন বিশেষ শহরের সুদের হারকে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেমন (LIBOR কে’)

এ ব্যবস্থাপনার উপর দু’টি মৌলিক আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে।

প্রথম এই আপত্ত্বি উত্থাপন করা হয়েছে যে, ভাড়া পরিশােধকে সুদের হারের সাথে সম্পৃক্ত করার দ্বারা এই লেনদেন সুদি অর্থায়নেরই সাদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। এই অভিযােগের জবাব এরূপ দেয়া যেতে পারে, যেমনিভাবে মুরাবাহায় বিস্তারিত আলােচনা দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে যে, সুদের হারকে তাে শুধুমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যে যাবৎ বৈধ ইজারার জন্য শরীয়তের কাংখিত শর্তসমূহ পূর্ণ করা হবে, সে যাবৎ চুক্তিতে ভাড়া নির্ধারণের জন্য যে কোন মাপকাঠিকে ব্যবহার করা যাবে। সুদি অর্থায়ন এবং বৈধ ইজারার (Lease) মাঝে পার্থক্য এই পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যা অর্থায়নকারী কিংবা ইজারাদাতাকে পরিশােধ করা হবে, বরং বুনিয়াদি পার্থক্য হল, লীজের ক্ষেত্রে লীজ প্রদানকারী লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় জিনিসের পূর্ণ ঝুঁকি (Risk) বহন করতে হবে। যদি লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় সম্পদ লীজ চলাকালীন সময়ে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে এই ক্ষয়-ক্ষতি ইজারাদাতা (Lessor) বহন করবে । এমনিভাবে যদি ইজারাদারের অসৎ ব্যবহার কিংবা তার উদাসীনতা ও অসতর্কতা ব্যতীত সেই সম্পদের সুযােগ-সুবিধা নষ্ট হয়ে যায় (অর্থাৎ, যে উদ্দেশ্যের জন্য তা ভাড়া নেয়া হয়েছিল সে উদ্দেশ্যের জন্য ব্যবহার উপযােগী না থাকে) তাহলে ইজারাদাতা (Lessor) ভাড়া দাবি করতে পারবে না। পক্ষান্তরে সুদি অর্থায়নে অর্থসংস্থানকারীকে (Financier) সর্বাবস্থায় সুদের হকদার মনে করা হয়, যদিও ঋণগ্রহীতা ঋণ হিসেবে গৃহীত অর্থ দ্বারা কোন লাভবান নাও হয়। যে যাবৎ এই মৌলিক পার্থক্যের দিকে লক্ষ্য রাখা হবে (অর্থাৎ ইজারাদাতা লীজের সম্পদের ঝুঁকি বহন করবে) সে যাবৎ এই চুক্তিকে সুদি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। যদিও ইজারাদার থেকে গৃহীত ভাড়ার টাকা সুদের হারের সমান হয়।

আরো পড়তে পারেন:  ব্যাংক একাউন্ট মেইনটেন্যান্স ফি বছরে কত

সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে, সুদের হারকে শুধুমাত্র মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করার দ্বারা এই লেনদেন সুদি ঋণের ন্যয় নাজায়েয হবে না। যদিও সুদের হারকে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাও উত্তম, যাতে একটি ইসলামী লেনদেন এবং অনৈসলামিক লেনদেনের মাঝে পরিপূর্ণভাবে বৈসাদৃশ্য হয়ে যায় এবং সুদের সাথে কোনরূপ সাদৃশ্যতা না থাকে।

এই ব্যবস্থাপনার উপর দ্বিতীয় অভিযোেগ হল, যেহেতু সুদের হারে পরিবর্তনীয় পরিমাণ সম্পর্কে পূর্ব থেকে জানা থাকে না, সেহেতু যে ভাড়া এর সাথে সম্পৃক্ত হবে তাতেও অস্পষ্টতা এবং ধােকা পাওয়া যাবে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই। শরীয়তের মৌলিক চাহিদা হল, কোন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির সময় উভয় পক্ষের বিনিময় সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। এই বিনিময় লীজ চুক্তিতে সেই ভাড়া যা ইজারাদার (Lessee) থেকে গ্রহণ করা হয়। সুতরাং এই ভাড়া লীজ চুক্তির একেবারে প্রারম্ভে উভয় পক্ষের জানা থাকতে হবে। আমরা যদি ভাড়াকে ভবিষ্যতের সুদের হারের সাথে সম্পৃক্ত করি যা বর্তমানে অজানা, তাহলে ভাড়াও অজানা হয়ে যাবে। এই অস্পষ্টতা এবং ধোকার কারণে চুক্তি বিশুদ্ধ থাকে না।

এই অভিযােগের জবাব দিতে গিয়ে কেউ এ কথা বলতে পারেন যে, অস্পষ্টতা দু’কারণে নিষিদ্ধ। প্রথম কারণ হল, অস্পষ্টতা উভয় পক্ষের মাঝে কলহ-কোন্দল সৃষ্টির কারণ হয়, আর তা এখানে পাওয়া যায় না। কেননা, এখানে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সম্মতিক্রমে এমন একটি সুস্পষ্ট মাপকাঠির উপর একমত পােষণ করেছে, যা ভাড়া নির্ধারণের জন্য মাপকাঠির কাজে আসবে এবং এর ভিত্তিতে যে কোন ভাড়াই নির্ধারণ করা হবে, তা উভয়পক্ষের জন্য গ্রহণযােগ্য হবে, এ কারণে উভয়পক্ষের মাঝে কলহ-কোন্দলের কোন প্রশ্নই সৃষ্টি হয় না।

অস্পষ্টতার (ভাড়া জানা না থাকার) দ্বিতীয় কারণ হল, অস্পষ্টতার কারণে উভয়পক্ষের অপ্রত্যাশিত লােকসান দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা থাকবে। কেননা, বিশেষ কোন সময়ে সুদের হার অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এমতাবস্থায় ইজারাদারের লােকসান হবে। এমনিভাবে বিশেষ কোন সময়ে সুদের হার অপ্রত্যাশিত সীমা পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় ইজারাদারের লােকসান হবে। এই সম্ভাব্য লােকসানের আশংকা থেকে বাঁচার জন্য সমকালীন কোন কোন আলিম এই প্রস্তাব পেশ করেছেন যে, ভাড়া এবং সুদের হারের সংযােগ এবং সম্পর্ককে বিশেষ সীমা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দেয়া হবে । উদাহরণস্বরূপ চুক্তিতে এ ধারা রাখা যেতে পারে যে, বিশেষ মেয়াদের পর সুদের হারের পরিবর্তন অনুপাতে ভাড়ার পরিমাণে পরিবর্তন হয়ে যাবে। কিন্তু এই সংযােজন কোন অবস্থাতেই পনের পার্সেন্ট থেকে অধিক এবং পাঁচ পার্সেন্ট থেকে কম হবে না। এর অর্থ হল, যদি সুদের হারে সংযােজন পনের পার্সেন্ট থেকে অধিক হয়, তাহলে ভাড়া পনের পার্সেন্ট পর্যন্তই বৃদ্ধি পাবে। অপরদিকে সুদের হারের হ্রাস যদি পাঁচ পার্সেন্ট থেকে অধিক কমে যায়, তাহলে ভাড়ায় পাচ পার্সেন্টের অধিক কমানাে হবে না।

আমাদের দৃষ্টিতে এটি একটি মধ্যমপন্থা যে পন্থায় সকল দিকের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

ভাড়া পরিশােধে বিলম্বের কারণে জরিমানা

ফিন্যান্সিয়াল লীজের কোন কোন চুক্তিতে ভাড়া পরিশােধে বিলম্বের ক্ষেত্রে ইজারাদারের উপর জরিমানা আরােপ করা হয়। এই জরিমানা যদি ইজারাদাতার আয়-উপার্জনে সংযােজন হয়, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই। কেননা, ভাড়া যখন পরিশােধ করা ওয়াজিব হয়ে যায়, তখন তা ইজারাদারের উপর একটি ঋণ হয়ে যায় এবং এর উপর ঋণের (Debt) সকল নীতিমালা ও আহকাম প্রযােজ্য হবে। ঋণ পরিশােধে বিলম্বের কারণে ঋণগ্রহীতা থেকে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ সুদ, আল্লাহ পাক কুরআনে কারীম নিষিদ্ধ ঘােষণা করেছেন। সুতরাং ইজারাদার যদি ভাড়া পরিশােধে বিলম্বও করে, তাহলেও ইজারাদাতা তার থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে পারবে না।

এই নিষিদ্ধতা দ্বারা অসৎ স্বার্থ উদ্ধারের কারণে যে লােকসান হয় তার থেকে বাঁচার জন্য আরেকটি বিকল্প পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। তাহল- ইজারাদারকে এই অঙ্গীকারের কথা বলা হবে যে, সে যদি নির্ধারিত সময়ে ভাড়া পরিশােধে অক্ষম হয়, তাহলে সে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কল্যাণমূলক কাজের জন্য দান করবে। এই উদ্দেশ্যের জন্য অর্থায়নকারী/ইজারাদাতা একটি কল্যাণ ফান্ড গঠন করবে, যে ফান্ডে এ ধরনের অর্থ জমা করা হবে এবং সেগুলােকে কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে। যার মধ্যে অভাবী এবং দুস্থ ব্যক্তিদেরকে সুদবিহীন ঋণ প্রদান করাও অন্তর্ভুক্ত। কল্যাণমূলক কাজের জন্য প্রদেয় অর্থ বিলম্বের মেয়াদের হিসেব থেকে ভিন্নও হতে পারে এবং এর হিসাব বার্ষিক পার্সেন্টিসের ভিত্তিতেও করা যেতে পারে। এই উদ্দেশ্যের জন্য লীজ চুক্তিনামায় নিম্ন বর্ণিত ধারাও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

“ইজারাদার (Lessee) এ মর্মে অঙ্গীকার করছে যে, সে যদি নির্ধারিত তারিখে ভাড়া পরিশােধে অক্ষম হয়, তাহলে সে ….. পার্সেন্ট অর্থ বার্ষিক হিসেবে এমন একটি কল্যাণ ফান্ডে প্রদান করবে, যা ইজারাদাতার (Lessor) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এবং যে অর্থ শুধুমাত্র ইজারাদাতাই শরীয়তসম্মত কল্যাণমূলক কাজের জন্য ব্যবহার করবে। এই ফান্ড কোন অবস্থাতেই ইজারাদাতার আয়ের অংশ হবে না।”

খরচ

এই ব্যবস্থাপনা দ্বারা ইজারাদাতা যদিও প্রত্যাশিত মুনাফার (Opportunity Cost) বিনিময় পাবে না, কিন্তু তা ইজারাদারের জন্য যথাসময়ে পরিশােধে (বিলম্ব করা থেকে) অবশ্যই একটি কার্যকর প্রতিবন্ধকতার কাজে আসবে।

ইজারাদারের পক্ষ থেকে এ ধরনের দায়িত্ব গ্রহণের বৈধতা এবং ইজারাদাতার জন্য স্বীয় মুনাফার স্বার্থে কোন ধরনের বিনিময় কিংবা জরিমানার অবৈধতার ব্যাপারে মুরাবাহার অধ্যায়ে বিস্তারিত আলােচনা করা হয়েছে।

লীজ সমাপ্ত করা

(৬) ইজারাদার যদি কোন শর্তের বিরােধিতা করে, তাহলে ইজারাদাতার এককভাবে লীজকে সমাপ্ত করে দেয়ার অধিকার আছে। তবে ইজারাদারের পক্ষ হতে যদি কোন শর্তের বিরােধিতা না পাওয়া যায়, তাহলে লীজকে পারস্পরিক সম্মতি ব্যতীত সমাপ্ত করতে পারবে না । ফিন্যান্সিয়াল লীজের কোন কোন চুক্তিতে পরিলক্ষিত হয়েছে যে, ইজারাদাতাকে তার ইচ্ছানুযায়ী একক সম্মতি এবং সিদ্ধান্তে লীজ সমাপ্ত করার অসীম স্বাধীনতা দেয়া হয়, তা শরীয়তের মূলনীতির পরিপন্থি।

(৭) ফিন্যান্সিয়াল লীজের কোন কোন চুক্তিতে একথাও অন্তর্ভুক্ত থাকে যে, লীজ সমাপ্তির ক্ষেত্রে লীজের অবশিষ্ট মেয়াদের ভাড়াও ইজারাদারকে অবশ্যই পরিশােধ করতে হবে, যদিও লীজ ইজারাদাতার সম্মতিতে সমাপ্ত হয়।

এই শর্তটি প্রকাশ্যভাবে শরীয়ত এবং ইনসাফ ও ন্যায়ের পরিপন্থি। এই শর্তকে অন্তর্ভুক্ত করার মৌলিক কারণ হল, লীজ চুক্তির পিছনে মৌলিক চিন্তা-চেতনা সুদি ঋণই থাকে, যা বাহ্যিকভাবে লীজের আকৃতিতে প্রদান করা হয়ে থাকে। এ কারণেই লীজ চুক্তির পরিণতি থেকে বাঁচার জন্য সম্ভাব্য সকল চেষ্টা করা হয়।

এটা স্বাভাবিক কথা যে, এধরনের শর্ত শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযােগ্য হতে পারে না। লীজ সমাপ্তির পরিণতি এমন হওয়া উচিত যে, ইজারাদাতা তার জিনিস ফেরত নিয়ে নিবে এবং ইজারাদার থেকে এ দাবি করতে পারবে যে, লীজ সমাপ্তির সর্বশেষ তারিখ পর্যন্ত ভাড়া পরিশােধ করতে হবে। যদি লীজ সমাপ্তি ইজারাদারের অসৎ ব্যবহার কিংবা কোন ধরনের অসতর্কতার কারণে হয়ে থাকে, তাহলে তার অসৎ ব্যবহর কিংবা অসতর্কতার কারণে যে লােকসান হবে ইজারাদার তার বিনিময়েরও দাবি করতে পারবে। কিন্তু তাকে অবশিষ্ট মেয়াদের ভাড়া পরিশােধের জন্য চাপ প্রয়ােগ করা যাবে না।

পণ্যের বীমা

(৮) যদি লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় পণ্যের ইসলামী তাকাফুল পদ্ধতি অনুযায়ী বীমা করাতে হয়, তাহলে তা ইজারাদাতার খরচে হতে হবে, ইজারাদারের খরচে নয়।

পণ্যের অবশিষ্ট মূল্য

(৯) আধুনিক ইজারা অর্থায়ন পদ্ধতির (অর্থায়নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত ইজারা) [Financial Lease] আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, এতে লীজের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর লীজের ভিত্তিতে প্রদেয় পণ্যের মালিকানা ইজারাদারের দিকে অর্পণ হয়ে যায়। ইজারাদাতা (Lessor) যেহেতু তার ব্যয় মুনাফা সহ উসূল করে নেয় এবং এই মুনাফা সাধারণত ঐ সুদের সমপরিমাণ হয়ে থাকে যা লীজ চলাকালীন সময়ে এ অর্থের বিনিময়ে গ্রহণ করা যেত। এ কারণে তার (ইজারাদাতার) লীজের পণ্যে অতিরিক্ত চিত্তাকর্ষণ থাকে না। অপরদিকে ইজারাদার লীজের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর সেই পণ্য তার নিকট রাখতে চায়।

এসব কারণের ভিত্তিতে লীজের পণ্য লীজের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর সাধারণত ইজারাদারকে দিয়ে দেয়া হয়। কখনাে বিনিময় ছাড়া আবার কখনাে নামমাত্র মূল্যে। পণ্যটি ইজারাদারকে দেয়া হবে একথা নিশ্চিতকল্পে এ শর্তটি লীজ চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। আবার কখনাে কখনাে এ শর্তটি সুস্পষ্টভাবে তাে উল্লেখ করা হয় না, কিন্তু একথা উভয়পক্ষের মাঝে প্রতিশ্রুত এবং সিদ্ধান্তকৃত মনে করা হয় যে, লীজের মেয়াদ সমাপ্তির পর সেই পণ্যের মালিকানা ইজারাদারের হয়ে যাবে।

এই শর্তটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকুক কিংবা বাহ্যিকভাবে সিদ্ধান্তকৃত মনে করা হােক, উভয় অবস্থায় শরীয়তের মূলনীতি বিরােধী। ইসলামী ফিকহের প্রসিদ্ধ উসূল হল, একটি চুক্তিকে অপর চুক্তির সাথে এমনভাবে সম্পৃক্ত করা যাবে না যে, একটি অপরটির জন্য পূর্বশর্তস্বরূপ হয়ে যায় । এখানে পণ্যের মালিকানা ইজারাদারের দিকে অর্পণ হওয়াকে লীজ চুক্তির জন্য আবশ্যকীয় পূর্ব শর্ত হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই।

শরীয়তে আসল পজিশন হল, এই পণ্য শুধুমাত্র ইজারাদাতার (Lessor) মালিকানায় থাকবে। লীজের মেয়াদ শেষ হবার পর তার এই স্বাধীনতা থাকবে যে, হয়ত এই পণ্য ফেরত নিয়ে নিবে কিংবা লীজ নবায়ন করবে অথবা তৃতীয় কোন ব্যাক্তিকে লীজ প্রদান করবে কিংবা এই পণ্য ইজারাদার বা অন্য কোন ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে দিবে। ইজারাদার ইজারাদাতাকে পণ্যটি নামমাত্র মূল্যে তার নিকট বিক্রি করার ব্যাপারে বাধ্য করতে পারবে না এবং এ ধরনের শর্তও লীজ চুক্তিতে আরােপ করা যাবে না। তবে লীজের মেয়াদ সমাপ্ত হবার পর ইজারাদাতা যদি সেই পণ্য ইজারাদারকে উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করতে চায় কিংবা তার নিকট বিক্রি করতে চায়, তাহলে সে তার স্বীয় সম্মতিতে তা করতে পারবে।

এতদসত্ত্বেও সমকালীন কোন কোন বিজ্ঞপন্ডিত ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়ােজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে একটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেছেন। তারা বলেন, যদিও ইজারা চুক্তিকে মেয়াদ শেষ হবার পর পণ্য বিক্রি বা উপঢৌকন হিসেবে প্রদানের সাথে শর্তারােপ করা যাবে না, তবে ইজারাদাতা এককভাবে অঙ্গীকার করতে পারে যে, লীজের মেয়াদ শেষ হবার পর উক্ত পণ্যটি সে ইজারাদারের নিকট বিক্রি করে দিবে। এই অঙ্গীকার শুধুমাত্র ইজারাদাতার উপর অপরিহার্য হবে। তারা বলেন, উসূল হল ভবিষ্যতে কোন চুক্তি করার এককভাবে অঙ্গীকার ঐ সময় জায়েয যখন অঙ্গীকারকারী অঙ্গীকার পূরণের ব্যাপারে তাে পাবন্দ হবে কিন্তু যার সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছে সে ঐ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে পাবন্দ নয়। যার অর্থ হল তার (ইজারাদারের) পণ্যটি ক্রয় করার অধিকার আছে, যে অধিকার সে ব্যবহার করতেও পারে আবার নাও করতে পারে। কিন্তু সে যদি ক্রয়ের অধিকার ব্যবহার করতে চায়, তাহলে অঙ্গীকারকারী এব্যাপারে অস্বীকার করতে পারবে না। কেননা, সে তার অঙ্গীকারের ব্যাপারে পাবন্দ। এ কারণে এ সকল বিজ্ঞজন প্রস্তাব করেন, লীজ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির পর ইজারাদাতা একটি পৃথক এককভাবে অঙ্গীকারের উপর স্বাক্ষর করবে, যে স্বাক্ষর দ্বারা সে এ মর্মে অঙ্গীকার করবে যে, ইজারাদার যদি ভাড়া পরিপূর্ণভাবে আদায় করে এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত মূল্যে সে পণ্যটি ক্রয় করতে ইচ্ছুক, তাহলে ইজারাদাতা সেই মূল্যে পণ্য তার নিকট বিক্রি করে দিবে।

আরো পড়তে পারেন:  অনলাইনে সোনালী ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম

ইজারাদাতা যখন একবার অঙ্গীকারের উপর স্বাক্ষর করে ফেলবে, তাহলে সে অঙ্গীকার পূরণের ব্যাপারে পাবন্দ হবে। ইজারাদার যদি তার ক্রয়ের অধিকার ব্যবহার করতে চায়, তাহলে সে তার অধিকারকে ঐ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে, যে ক্ষেত্রে লীজের সিদ্ধান্তকৃত চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিপূর্ণরূপে আদায় করবে।

এমনিভাবে এ সকল বিজ্ঞজন এ কথারও অনুমতি প্রদান করেন যে, ইজারাদাতা বিক্রির পরিবর্তে মেয়াদান্তে পণ্য ইজারাদারকে উপঢৌকন হিসেবে প্রদানের অঙ্গীকারও করতে পারে, তবে শর্ত হল ইজারাদার ভাড়া পরিপূর্ণরূপে আদায় করতে হবে।

সমকালীন অনেক আলিম এই পদ্ধতি অবলম্বনের অনুমতি প্রদান করেছেন। ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে এর উপর বিস্তৃত আকারে ব্যাপকভাবে আমল হচ্ছে। এই পদ্ধতিটি দু’টি মৌলিক শর্তসাপেক্ষে জায়েয।

প্রথম শর্ত হল, ইজারা (Lease) চুক্তি স্বত্বাগতভাবে বিক্রির অঙ্গীকার কিংবা উপঢৌকনের অঙ্গীকারের উপর স্বাক্ষর করার সাথে শর্তযুক্ত না হতে হবে। বরং এই অঙ্গীকার পৃথক ডকুমেন্টের মাধ্যমে হতে হবে।

দ্বিতীয় শর্ত হল, অঙ্গীকার একতরফা হতে হবে এবং তা শুধুমাত্র অঙ্গীকারকারীর উপর অপরিহার্য হতে হবে। দ’তরফা চক্তি না হতে হবে যা উভয়পক্ষের উপর অপরিহার্য হয়। কেননা, এ ক্ষেত্রে তা একটি পরিপূর্ণ চুক্তি হবে যা ভবিষ্যতের কোন একটি তারিখ থেকে কার্যকর হবে। এমনটি করা বিক্রি এবং উপঢৌকনের ক্ষেত্রে জায়েয নেই।

সাব-লীজ (Sub-Lease)

(১০) লীজের দ্রব্যটি যদি এমন হয়, যাকে এক একজন এক এক পদ্ধতিতে ব্যবহার করে, (অর্থাৎ- ব্যবহারকারীর ভিন্নতার কারণে ঐ জিনিসে বিভিন্ন প্রভাব পড়ে) তাহলে ইজারাদার (Lessee) ইজারাদাতার (Lessor) সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতীত তৃতীয় অন্য কোন ব্যক্তির নিকট তা ভাড়ায় প্রদান করতে পারবে না। যদি ইজারাদাতা তৃতীয় অন্য কোন ব্যক্তির নিকট ভাড়ায় প্রদানের অনুমতি প্রদান করে তাহলে সে তা করতে পারবে। যদি এই দ্বিতীয় সাব-লীজ (Sub-Lease) থেকে অর্জিত ভাড়া সেই ভাড়ার সমপরিমাণ বা তার চেয়ে কম হয় যা মালিককে (আসল। ইজারাদাতাকে) পরিশােধ করা হয়, তাহলে সকল প্রসিদ্ধ ফিকহবিদ এর বৈধতার ব্যাপারে একমত পােষণ করেছেন। কিন্তু যদি সাব-লীজ (Sub-Lease) থেকে অর্জিত ভাড়া মালিককে প্রদানকৃত ভাড়া অপেক্ষা বেশি হয়, তাহলে এ ব্যাপারে ফিকহবিদদের বিভিন্ন রকমের দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এবং আরাে অন্যান্য আলিমদের নিকট তা জায়েয আছে এবং দ্বিতীয় লীজ (Sub-Lease) থেকে অর্জিত অতিরিক্ত ভাড়া ব্যবহার করাও জায়েয আছে। হাম্বলী ফিকহবিদগণও এই দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অপরদিকে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর দৃষ্টিভঙ্গী হল, সাবলীজ থেকে অর্জিত অতিরিক্ত ভাড়া তার নিকট রাখা জায়েয নেই বরং এই অতিরিক্ত অর্থ সদকা করে দেওয়া জরুরী। কিন্তু যদি দ্বিতীয় ইজারাদাতা (Sub-Lessor) সেই পণ্যে কোন কিছু সংযােজন করে তাতে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে কিংবা তাকে এমন মুদ্রার ভিত্তিতে ভাড়ায় প্রদান করে যা মালিককে প্রদানকৃত ভাড়ার মুদ্রা থেকে ভিন্ন। তাহলে এই সাব-লীজ (Sub-Lease) থেকে অর্জিত অতিরিক্ত ভাড়া গ্রহণ করতে পারবে এবং স্বীয় কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারবে।

যদিও ইমাম আবুহানীফা (রহ.)-এর দৃষ্টিভঙ্গী অধিক সতর্কতাপূর্ণ এবং যথাসম্ভব এর উপরই আমল করা উচিত, কিন্তু প্রয়ােজনের সময় ফিকহ শাফেয়ী এবং ফিক্হ হাম্বলীর উপরও আমল করা যাবে। কেননা, ঐ অতিরিক্ত অর্থের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে সুস্পষ্ট কোন নিষিদ্ধতা বিদ্যমান নেই। আল্লামা ইবন কুদামা (রহ.) এই অতিরিক্ত পরিমাণের বৈধতার ব্যাপারে শক্তিশালী প্রমাণ উল্লেখ করেছেন।

লীজ হস্তান্তর

(১১) ইজারাদাতা লীজের সম্পদ তৃতীয় কোন ব্যক্তির নিকটও বিক্রি করতে পারবে। যার ফলে ইজারাদাতা এবং ইজারাদারের মাঝে গঠিত সম্পর্ক নতুন মালিক এবং ইজারাদারের সাথে স্থাপন হয়ে যাবে। কিন্তু লীজের পণ্যের মালিকানা হস্তান্তর করা ব্যতীত স্বয়ং লীজকে কোন সম্পদের বিনিময়ের মাধ্যমে হস্তান্তর করা জায়েয নেই।

উভয় পদ্ধতির মাঝে পার্থক্য হল, দ্বিতীয় পদ্ধতিতে পণ্যের মালিকানা দ্বিতীয় ব্যক্তির দিকে হস্তান্তর হয় না, বরং তার শুধুমাত্র দ্রব্যের ভাড়া উসূল করার অধিকার অর্জন হয়। এ ধরনের সমর্পণ শরীয়তের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র ঐ ক্ষেত্রে জায়েয যখন ঐ ব্যক্তি থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ না করা হবে যার দিকে এই অধিকার সমর্পণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ইজারাদাতা ইজারাদার থেকে ভাড়া উসূল করার অধিকার তার ছেলে কিংবা তার কোন বন্ধুর দিকে হাদিয়া হিসেবে সমর্পণ করতে পারে। এ বে ইজারাদাতা তার ঋণদাতার দিকেও এই অধিকার সমর্পণ করপােরে। যাতে ভাড়ার মাধ্যমে তার ঋণ পরিশােধ হয়ে যায়। কিন্তু ইজারাদাতা যদি এই অধিকার কোন ব্যক্তির নিকট নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করতে চায়, তাহলে তা জায়েয নেই। কেননা, এ ক্ষেত্রে মুদ্রার (ভাড়ার অর্থের) বিক্রি মুদ্রার বিনিময়ে সংঘটিত হয়, যার বৈধতা সমান সমান হওয়ার সাথে শর্তযুক্ত। অন্যথায় তা সুদে পরিণত হয়ে যাবে যা নিষিদ্ধ এবং নাজায়েয।

ইজারার সার্টিফিকেট চালু করা

ইজারা ব্যবস্থাপনায় সার্টিফিকেট তৈরির অত্যন্ত সুযােগ-সুবিধা রয়েছে, যে সুযােগ-সুবিধার মাধ্যমে ইজারার ভিত্তিতে অর্থায়নকারীদের জন্য স্টক মার্কেট অস্তিত্ব লাভে সহায়ক হতে পারে। যেহেতু ইজারায় ইজারাদাতা পণ্যের মালিক, সেহেতু সে সমুদয় কিংবা আংশিক পণ্য তৃতীয় কোন ব্যক্তির নিকট বিক্রি করতে পারবে। যার মাধ্যমে ক্রেতা ক্রয়কৃত অংশ অনুপাতে ইজারাদাতার দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে বিক্রেতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে যাবে।

সুতরাং ইজারাদাতা যদি ইজারা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির পর সে পণ্য ক্রয়ে যে পরিমাণ ব্যয় বহন করতে হয়েছে তা মুনাফাসহ উসূল করতে চায়, তাহলে সে এই পণ্যের সমুদয় কিংবা আংশিক এক বা একাধিক ব্যক্তির নিকট বিক্রি করতে পারবে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে (কয়েক ব্যক্তির নিকট বিক্রির ক্ষেত্রে) প্রত্যেক ব্যক্তি পণ্যের যতটুকু অংশ ক্রয় করেছে, তার প্রামাণ্য হিসেবে একটি সার্টিফিকেট চালু করতে পারে। যাকে “ইজারা সার্টিফিকেট” বলা হয়। এই সার্টিফিকেট বহনকারীর জন্য লীজের সম্পদে আনুপাতিক হারে মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করবে এবং বহনকারী ততটুকু পরিমাণ মালিক ইজারাদাতার দায়-দায়িত্ব বহন করবে। পণ্য যেহেতু প্রথম ইজারাদারকে ইজারার ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে, সেহেতু এই ইজারা নতুন মালিকদের সাথে চালু থাকবে। সার্টিফিকেট হােল্ডারদের থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির পণ্যের মালিকানায় তার আনুপাতিক অংশ অনুযায়ী ভাড়ার দাবি করতে পারবে। এমনিভাবে সেই মালিকানা অনুপাতে তার উপর ইজারাদাতার দায়-দায়িত্বও বর্তাবে। এটা যেহেতু একটি জড় সম্পদে মালিকানার প্রামাণ, সেহেতু মার্কেটে তার ব্যবসা এবং আদান-প্রদান স্বাধীনভাবে করা যাবে। এই সার্টিফিকেট এমন ডকুমেন্টের কাজে আসবে যেগুলােকে সহজেই নগদ অর্থে রূপান্তরিত করা যায়। সুতরাং এর দ্বারা ইসলামী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের তারল্যের (Liquidity) সংকট সমাধানেও সহায়ক হবে।

একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, সার্টিফিকেট সম্পদে বিস্তৃত (অবণ্টনকৃত) অংশের মালিকানার তার সকল দায়-দায়িত্বসহ অপরিহার্যভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। এই মৌলিক পদ্ধতিকে সঠিকভাবে না বুঝার কারণে কোন কোন লােকের পক্ষ থেকে এমন সার্টিফিকেট চালু করার চেষ্টা করা হয়েছে, যেগুলােতে পণ্যে কোন ধরনের মালিকানা সােপর্দ করা ব্যতীত বহনকারীর শুধুমাত্র ভাড়ার শুধু বিশেষ অর্থ গ্রহণ করার অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে। যার অর্থ হল, এই সার্টিফিকেট বহনকারীর লীজের সম্পদের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তার অধিকার শুধুমাত্র এতটুকু যে, সে ইজারাদার থেকে অর্জিত ভাড়ায় অংশীদার হবে। ডকুমেন্ট চালু করার এই পদ্ধতি শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই। যেমনিভাবে এ অধ্যায়ের প্রারম্ভে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ভাড়া পরিশােধ করা ওয়াজিব হওয়ার পর তা একটি ঋণ (Debt) হয়ে যায়, যা ইজারাদার পরিশােধ করবে। ঋণ কিংবা ঋণের প্রতিনিধিত্বকারী ডকুমেন্ট শরীয়তের দৃষ্টিতে আদান-প্রদানযােগ্য ডকুমেন্ট নয়। কেননা, এধরনের ডকুমেন্টের ক্রয়বিক্রয় মুদ্রা কিংবা আর্থিক দায়-দায়িত্বের ক্রয়-বিক্রয়ের সাদৃশ্য, যা সমপরিমাণের উসূলের প্রতি লক্ষ্য রাখা ব্যতীত শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই। আর যদি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় মূল্যে সমপরিমাণের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়, তাহলে ডকুমেন্ট চালু করার মৌলিক উদ্দেশ্য শেষ হয়ে যাবে। এ জন্য এ ধরনের “ইজারা সার্টিফিকেট” স্টক মার্কেট অস্তিত্ব লাভের উদ্দেশ্য পূরণ করবে না।

সুতরাং ইজারা সার্টিফিকেটকে এমনভাবে ডিজাইন করা জরুরী, যাতে লীজের সম্পদে শুধুমাত্র ভাড়া গ্রহণ করার অধিকারের প্রতিনিধিত্ব না করে প্রকৃত মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে।

হেড লীজ (Head-Lease)

লীজিং-এর আধুনিক কায়-কারবারে আরেকটি পদ্ধতি অস্তিত্ব লাভ করেছে। তাহল- “হেড লীজের পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ইজারাদার দ্রব্যটি অপর কয়েকজন ইজারাদারকে ইজারা হিসেবে প্রদান করে, অতঃপর সে অন্যান্য লােকদেরকে তার কারবারে শরীক হওয়ার জন্য আহবান করে। তা এভাবে যে, ইজারাদারগণ থেকে অর্জিত ভাড়ায় সে তাদেরকে অংশীদার বানিয়ে নেয় এবং এর ভিত্তিতে সে ঐ অংশীদারগণ থেকে নির্দিষ্ট অর্থ গ্রহণ করে, এই ব্যবস্থাপনা শরীয়তের নীতিমালার পরিপন্থি। তার কারণ সুস্পষ্ট যে, ইজারাদার তাে সেই সম্পদের মালিক নয়। সে তাে শুধুমাত্র তার ভােগ ব্যবহারের (Usufruct) হকদার। এই ভােগ ব্যবহারের অধিকারকে সে সাব-লীজ (Sub-Lease) করে ঐসব ইজারাদারদের (Lessees) দিকে হস্তান্তর করেছে। এ পর্যায়ে তারা কোন জিনিসের মালিক নয়, স্বয়ং সম্পদেরও নয় এবং ভােগ ব্যবহারেরও নয়। তারা শুধুমাত্র ভাড়া উসূল করার অধিকার রাখে। এজন্য তারা তাদের এই অধিকারের কিছু অংশ অন্যান্যদের দিকে সােপর্দ করছে। আর এব্যাপারে পূর্বে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে যে, এই অধিকারের ব্যবসা করা যায়। কেননা, তা উসূলযােগ্য ঋণকে স্বল্প মূল্যে বিক্রির সাদৃশ্য হয়ে যায়, যা সুদের একটি আকৃতি, যার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে।

এগুলাে ইজারা অর্থায়ন পদ্ধতির (Financial Lease) এমন কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য যা শরীয়তের বিধানের পরিপন্থি। লীজকে ইসলামী অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করার সময় এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।

লীজ চুক্তিতে সংঘটিত সম্ভাব্য ত্রুটি-বিচ্যুতির তালিকা উপরে বর্ণিত এই কয়েকটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই অধ্যায়ে শুধুমাত্র সেসব মৌলিক ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ করা হয়েছে যা লীজের চুক্তিতে পরিলক্ষিত হয়। ইসলামী লীজের মৌলিক নীতিমালা উপরে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামী লীজের চুক্তিতে এসব নীতিমালার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

One thought on “ইজারা এবং ইজারাদারি ব্যবস্থা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *